24.1.15

প্রেস বিজ্ঞপ্তি: হিযবুত তাহরীর, অনতিবিলম্বে যালিম হাসিনা ও বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের সংগঠিত করার কাজে সক্রিয়ভাবে সহযোগীতার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানাচ্ছে

শুক্রবার, ০৩ রবিউস সানি, ১৪৩৬ হিজরী                                                                   ২৩.০১.২০১৫ ইং

::প্রেস বিজ্ঞপ্তি::

হিযবুত তাহরী, অনতিবিলম্বে যালিম হাসিনা ও বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের সংগঠিত করার কাজে সক্রিয়ভাবে সহযোগীতার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানাচ্ছে

আওয়ামী-বিএনপির ক্ষমতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির কারণে গোটা বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগ উপহার দিয়েছে গুম-খুন ও আতংকের ফেরাউনি শাসন, আর অন্যদিকে বিএনপি পেট্রোল বোমা এবং নিরীহ মানুষদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই উপহার দিতে পারেনি। মানুষের রক্ত নিয়ে ছিনিমিনি খেলার রাজনীতি থেকে দেশবাসীকে পরিত্রাণ দিতে টকশো, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিধ্বনি হচ্ছে সংলাপ ও সুষ্ঠু অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনের দাবি। প্রকৃতপক্ষে, এসবই হচ্ছে মূল সমস্যাকে অনুধাবন করার চেষ্টা না করে উপসর্গ নিয়ে আলোচনা। মুলতঃ বাংলাদেশ গণতন্ত্র নামক বিষাক্ত এক মরনব্যাধিতে আক্রান্ত। এই মরনব্যাধিকে জিইয়ে রেখে নির্বাচন বা সংলাপের মাধ্যমে দেশবাসীকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।

ইতিহাস সাক্ষী যে, গণতন্ত্র কখনো কোথাও সুশাসন ও শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি কারণ এই ব্যবস্থা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিবর্তে সমাজের গুটিকয়েক প্রভাবশালী মানুষকে দেয় আইন প্রণয়নের অসীম ক্ষমতা। স্বাভাবিকভাবেই তাই ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় আরোহন ও টিকে থাকা হয়ে ওঠে মূল উদ্দেশ্য এবং এই ক্ষমতার রাজনীতির শিকার হয় দেশের সাধারণ জনগণ। এটি শুধু বাংলাদেশের রাজনীতি বলে কথা না, ইউরোপ-আমেরিকার বেলায়ও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। বুশ সরকারের সাবেক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি টম রিজ তার আত্মস্বীকারোক্তি মূলক “The Test of Our Times: America Under Siege...And How We Can Be Safe Again” বইয়ে উল্লেখ করেছে যে, ২০০৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে তাকে দিয়ে জোর করে সন্ত্রাসী হামলার সতর্কতা ঘোষণা করানো হয় যাতে আতংক সৃষ্টি করে বুশ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে পারে। তাই এই পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের একটি রূপই আমরা দেখতে পাই, আর তা হলো মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের আখের গোছানোর রাজনীতি।

হে সচেতন, নিষ্ঠাবান বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়!

হিযবুত তাহরী, আপনাদের আহবান করতে চায় আওয়ামী-বিএনপির ধ্বংসের রাজনীতির বিপরীতে অবাস্তব ও কাল্পনিক প্রকৃত গণতন্ত্রপ্রতিষ্ঠার কথা বলে দেশবাসীকে আর বিভ্রান্ত করবেন না। বিশ্বের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত প্রকৃত গণতন্ত্র”-এর কোন আদর্শ মডেল আমরা দেখতে পাইনি যেখানে ইসলামের খিলাফত শাসনব্যবস্থা ১৩০০ বছর যাবৎ বিশ্বকে শাসন করে এসেছিল। তাই আপনারা যদি প্রকৃত অর্থেই দেশের কল্যাণ কামনা করে থাকেন, তাহলে আলোচনার টেবিলে সমাধান হিসেবে খিলাফত শাসনব্যবস্থাকে নিয়ে আসুন এবং এর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে আমাদের সহায়তা করুন। হিযবুত তাহরী-এর আত্মবিশ্বাসী ও সুশিক্ষিত নেতা-কর্মীগণ খিলাফত শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আপনাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করতে প্রস্তুত।

হে মুসলিমগণ!

পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট আওয়ামী-বিএনপির শাসন ও রাজনীতি দ্বারা আর কতো প্রতারিত হবেন? যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম, সেখানে প্রতিবার আপনাদেরই ভোটের মাধ্যমে কেন তাদেরকে নির্বাচিত করেন যারা ইসলামকে ত্যাগ করে নিজস্ব আইন দ্বারা সমাজ পরিচালনা করছে? গণতন্ত্র নামক কুফরি শাসনব্যবস্থাকে অক্ষত রেখে শুধু সরকার পরিবর্তনে বর্তমান জুলুমের শাসনের অবসান হবে না। তাই আপনাদের প্রতি আমাদের আহবান, ক্ষমতার মুল চাবিকাঠি যাদের হাতে, সেই নিষ্ঠাবান সেনাঅফিসারদের কাছে খিলাফতের দাবী তুলুন

§  আপনাদের পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে যারাই সামরিক বাহিনীর অফিসার, তাদেরকে খিলাফতের ফরজ হুকুমের ব্যাপারে সচেতন করুন এবং আহবান করুন যাতে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় অতি সত্বর তারা হিযবুত তাহরী-কে নুসরাহ (সমর্থন) প্রদান করেন।
§  এবং অনতিবিলম্বে যালিম হাসিনা ও বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের সংগঠিত করার কাজে হিযবুত তাহরী-কে সহযোগীতা করুন এবং এই কাজে সক্রিয়ভাবে জড়িত হউন। 

মনে রাখবেন, এ কাজে অবহেলা দুনিয়ার বুকে নিপীড়িত হওয়ার পাশাপাশি শেষ বিচারের দিনে আমাদের জন্য খুব ভয়ংকর পরিণতির কারণ হতে পারে।

وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى

এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করবো।” [সুরা ত্বা-হাঃ ১২৪]



হিযবুত তাহরী-এর মিডিয়া কার্যালয়, উলাইয়াহ বাংলাদেশ

Mobile: +8801798367640                    Skype: htmedia.bd
New official Website: www.ht-bangladesh.info
হিযবুত তাহরীর-এর আমীর শেখ আতাইবনে খলিল আবু-রাশতা-এর ফেসবুক লিংকঃ www.facebook.com/Ata.AbualRashtah
fb page: PeoplesDemandBd
Hizbut Tahrir official website: www.hizb-ut-tahrir.org
Hizbut Tahrir Media Website: www.hizb-ut-tahrir.info

23.1.15

উসুলি কা'ইদাহ "সকল বস্তুর 'আসল' হল ইবাহা" প্রয়োগ করে কি করে গনতন্ত্রকে জায়েয এবং খিলাফতকে ধ্বংস করা হয়েছিল

উসুলি কা'ইদাহ "সকল বস্তুর 'আসল' হল ইবাহা" প্রয়োগ করে কি করে গনতন্ত্রকে জায়েয এবং খিলাফতকে ধ্বংস করা হয়েছিল

যারাই বলে থাকেন ইসলামে ইবাদতের 'তউকিফি' (অর্থাৎ ওহী দ্বারা সুনির্দিষ্ট) ইস্যুগুলো ছাড়া বাকি সব *একশন (কাজ)* বাই ডিফল্ট মুবাহ বা হালাল, তারা ইসলামী আইনবিজ্ঞানের (উসুল আল ফিকহ) বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে খুব ভয়ংকরভাবেই উম্মাহকে ভুল পথে চালিত করছেন। পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় আমাদের অনেকের মনে এটা গেঁথে গেছে (কিছু ভ্রান্ত প্রচারনার দ্বারা) কোন বিষয় যদি ইসলামের সাথে কনফ্লিক্ট না করে এবং ঐ ব্যাপারে কোন শারী’আহ-র নুসুস (দলীল) যদি না থাকে, তাহলেই তা মুবাহ বা হালাল। এই ভয়ংকর চিন্তার কারনেই মুসলিম উম্মাহকে ইসলামিক গণতন্ত্র”, “ইসলামিক সমাজতন্ত্র”, “সোশ্যাল জাস্টিসইত্যাদি কুফরি চিন্তা গলধঃকরণ করানো হয়েছিল। খিলাফত ধ্বংসের বিস্তারিত ইতিহাস নিয়ে যারা অবহিত নন, তারা এই বিষয়টিও হয়তো জানেন না যে, কাফেররা মুসলিম ভূমিগুলোকে বাইরে থেকে আক্রমণ পরে করেছিল। প্রথমে ভেতর থেকে ধ্বংস করা হয়েছিল কিছু ভ্রান্ত উসুলি কাইদাহ (নীতি) প্রয়োগ করে যার ভেতর ছিল এইটিও – “সকল কিছুই বাই ডিফল্ট মুবাহএই নীতির দ্বারা ঐ পশ্চিমা চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত মুসলিম পণ্ডিতরা বলা শুরু করেছিল যে রাজনীতি তউকিফি” (আল্লাহ দ্বারা নির্ধারিত) না এবং সব কাজই বাই ডিফল্ট হালাল এবং তা বলেই ফ্রেঞ্চ পেনাল কোড ও রোমান আইন এবং গণতন্ত্র মুসলিম খিলাফতে ঢোকানো হয়েছিল বিখ্যাত পণ্ডিতদের দ্বারা।

এক্ষেত্রে দেখা যায় যেসব ফকিহ বা উসুলিয়্যুন এই চিন্তার প্রচার-প্রসার ঘটান, তারা নীচের কাইদাহ (নীতি) টি সর্বদাই উল্লেখ করে থাকেনঃ

সব বস্তুর আসলবা অরিজিন হল ইবাহা (বা হালাল)” [আল আসলু ফিল-আশইয়া আল ইবাহা]

এখানে উল্লেখ্য ফিকাহ শাস্ত্রবিদরা শুধু বস্তু/জিনিস (আশইয়া) এর ক্ষেত্রে এই কাইদাটি ব্যবহার করতেন (আফ'আল বা কাজের ক্ষেত্রে না)।  আল্লাহ (সুব.) কুর’আনে বলেছেনঃ

وَخَلَقَ لَكُمْ مَا في الأَرْضِ جَمِيعاً

এবং তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর বুকে যা আছে সবই সৃষ্টি করেছেন

আয়াতটিতে আল্লাহ বস্তুকে আম’ ভাবে উল্লেখ করেছেন তাই সকল বস্তু বাই ডিফল্ট হালাল এবং যেগুলো হারাম সেগুলো উল্লখে করা আছে।

কিন্তু সমস্যা হয় যখন বস্তুর (আশইয়া) সাথে একশন বা কাজ (আফআল)-কে মিশিয়ে ফেলে এই কাইদাহটি দ্বারা জাস্টিফাই করানো হয়। এটি একটি কমনসেন্স যে বস্তু আর একশন কখনই এক বিষয় হয় না। আমরা বলতে পারি না 'ছুরি' (বস্তু) আর ছুরি মারা’ (একশন) এক বিষয়। তাই অতীতে স্কলাররা প্রয়োজন বোধই করেননি এই নীতির ক্ষেত্রে বস্তুকে একশন থেকে আলাদা করে বোঝানোর। 

তাই আফআল (একশন) এর ক্ষেত্রে আসল’ (অরিজিন) হল

হুকুম আশ-শারঈর মাঝে নিজেদের কাজকে সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে শারী’আহ-র সাথে লেগে থাকা

তাই যদি আল্লাহ কোন কাজের জন্য ইবাহা (অনুমতি) দেয় তাহলে তা হবে মুবাহ আর যদি আমরা অনুমতি না দেখতে পাই তাহলে আদিল্লাহ আশ-শারিয়্যাহ” (শারী’আহর দলীল) থেকে হুকুম বের করে আনতে হবে। এটা বলার কোন সুযোগ নেই যেহেতু শারী’আহ এক্ষেত্রে এপারেন্টলি নীরব, তাই আমরা সেই একশন সমূহ পালন করতে পারবো।

যারা এই বস্তুর সাথে একশনকে মিলিয়ে দেখেন তারা আবার মুবাহ” (যা করলে কোন সাওয়াব বা গুনাহ নেই)-কে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। তারা মনে করেন যেসব বিষয়ে শারী’আহ কোন তিরস্কার (হারাজ) করে না বা শারী’আহ নিশ্চুপ, সেগুলোই হল মুবাহ। তাই তিরস্কারের অনুপস্থিতিই হল অনুমতি” (ইবাহা)। তারা রাসুলের (সাঃ) কথাটি উল্লেখ করেনঃ

وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْو

এবং যে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছে সেসব বিষয়ে মাফ করে দেয়া হয়েছে

এভাবেই নিকট অতীতের স্কলাররা গনতন্ত্রকে জায়েয করেছিল এই যুক্তিতে যে গণতন্ত্রও শুরা” (পরামর্শ) ও সামাজিক ন্যায় দ্বারা পরিচালিত এবং সকল বস্তুই যেহেতু বাই ডিফল্ট হালাল, তাই গণতন্ত্রও এডোপ্ট করা যাবে এবং বর্তমানেও অতীতের সেই বিষাক্ত চিন্তা অনেক স্কলাররাই বহন করছে।

তাই এটা জেনে নেয়া ভাল উসুল আল ফিকহের ক্লাসিক্যাল বইগুলোতে কোথাও বলা নেই কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে হারাজ (তিরস্কার) এর অনুপস্থিতিই হল অনুমতি” (ইবাহা), কারন কোন কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে হারাজ এর অনুপস্থিতি ইঙ্গিত বহন করে না যে ঐ কাজ বা বস্তুটি মুবাহ। আবার ব্যাপারটি এমনও না যে ঐ হারাজটিকে তুলে নেয়ার অর্থই হল অনুমতি তাই, কোন বিষয় মুবাহ হওয়ার অর্থ হল উক্ত বিষয়ে হুকুমদাতা (আল্লাহ) মানুষকে কোন কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে বাছাই করার অপশন দিয়েছেন এবং এই বাছাইয়ের অপশনটিও শারী’আহর দলীল দ্বারা সমর্থিত হতে হবে

যারা উপরে বর্ণিত হাদিসটির (এবং যে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছে সেসব বিষয়ে মাফ করে দেয়া হয়েছে”) এভাবে ব্যাখ্যা দেন যে শারী’আহ কিছু বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছে তাই ওসব বিষয় মুবাহ, তারা হাদিসটির ভুল ব্যাখ্যা দেন। বিষয়টি এমন না যে শারী’আহ কোন ব্যাপার ব্যাখ্যা করে নাই এবং এই চিন্তা করাও পাপ কারন আল্লাহ বলেছেনঃ

“আজকে আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম... [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৩]

আরো বলেছেনঃ

আমরা এই কিতাব নাযিল করেছি সবকিছুর ব্যাখ্যা দিয়েই [সূরা আন-নাহলঃ ৮৯]

তাই ওপরের হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বোঝাতে চেয়েছেন সেসব টেক্সট গ্রহন করো যা তোমাদের দেয়া হয়েছে। আর যে বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করা হয়নি তা নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করো না কারন হয়তো তা আবার হারামও হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেনঃ

ذَرُونِي مَا تَرَكْتُمْ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ . فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوهُ . وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرِ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ

আমাকে চাপ দিও না সেসবের বাইরে কিছু বলতে যা আমি তোমাদের ইতিমধ্যেই বলেছি। তোমাদের আগে যারা এসেছিল তারা অতিরিক্ত প্রশ্ন করা এবং তাদের নবীদের সাথে বিতর্ক করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি যদি তোমাদের কিছু করতে নিষেধ করি তাহলে তা থেকে দূরে থাক এবং যদি কিছু করার আদেশ দেই তাহলে তোমাদের সাধ্যমতো করার চেষ্টা করো [মুসলিম]

তাই মুল কথা হল ইসলামে এমন কিছু নাই যা শারী’আহ এক্সপ্লেইন করেনি। তাই কোন কিছু মুবাহ বলতে নিলেও আমাদের আগে দলীল ঘাটতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে শারী’আহ উক্ত বিষয়টিকে মুবাহ ঘোষণা দিয়েছে।  

আবার অনেকেই যুক্তি দিয়ে থাকেন নিউক্লিয়ার বোমা, উড়োজাহাজ তৈরি ইত্যাদি একশনগুলোর ক্ষেত্রে তো কোন শারী’আহ বিধান নেই। তাই এই কাজগুলো যদি আমরা ইবাহা ধরে করতে পারি, তাহলে কেন সকল কাজের আসল” (অরিজিন) এর ক্ষেত্রে আমরা একই কথা বলতে পারি না?  এই বিষয়ে ফুকাহাদের মত হল কিছু চিন্তা থাকে আকিদাহ এবং আহকাম সংক্রান্ত এবং কিছু থাকে উলুম (বিজ্ঞান), মাদানিয়্যাহ (প্রযুক্তি), উদ্ভাবন/উৎপাদন, দক্ষতা ইত্যাদি সংক্রান্ত। তাই দ্বিতীয় বিষয়ের (যেগুলো আকিদাহ বা আহকাম সংক্রান্ত নয়) ক্ষেত্রে যদি শারী’আহ দ্বারা নিষেধকারী কোন দলীল না থাকে, তাহলে তা গ্রহন করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একবার কিছু কৃষক এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাদের বললেনঃ 

أَنْتُمْ أَدْرَى بِأُمورِ دُنْيَاكُمْ

তোমরা দুনিয়ার বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক সচেতন

বদরের যুদ্ধের সময় সাহাবা আল-হুব্বাব বিন আল-মুনযির (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে যুদ্ধ-কৌশল সংক্রান্ত এক প্রশ্ন করেছিল। রাসুলের পরিকল্পনাটি কি ওহী ছিল নাকি রাসুলের নিজস্ব মতামত ছিল তা ঐ সাহাবা জানতে চেয়েছিল, উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেনঃ

بَلْ هُوَ الرَّأْيُ وَالحَرْبُ وَالمَكِيدَة

অবশ্যই এটা আমার মতামত, যুদ্ধবিগ্রহ ও ধূর্ত (বিষয়ের ক্ষেত্রে)

ঐ সাহাবার পরামর্শে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করেছিলেন। কারন তা ওহী ছিল না। তাই নন-আহকাম/আকিদার বিষয়ের আসলএর ক্ষেত্রে ইবাহা (অনুমতি) আছে যদি কোন বিপরীত টেক্সট আমরা না পাই শারী’আহতে। কিন্তু গণতন্ত্র সরাসরি আকিদাহ বিরোধী।  

মোদ্দা কথাঃ সকল বস্তু বাই ডিফল্ট হালাল এবং সকল একশন এর ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের শারী’আহ দ্বারা সীমাবদ্ধ রাখতে হবেকোনভাবেই বস্তুর সাথে একশনকে এক করে দেখলে হবে না। কারন একশনের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেছেনঃ

وَمَا آَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

“এবং আল্লাহর রাসুল যা কিছু তোমাদের জন্য এনেছেন তা গ্রহন করো এবং যেসব থেকে দূরে থাকতে বলেছেন তা পরিত্যাগ করো” [সূরা আল-হাশরঃ ৭]

তাই ওপরের আয়াতের 'তালাব' (আবেদন) টিতে যে 'মাআ' (যা কিছু) শব্দটি এসেছে তা 'আম' আকারে এসেছে এবং এই তালাব হোক সেটা "তালাব উত তারক" (কোন কাজ পরিত্যাগ করার আবেদন) বা তালাব উল ফি' (কোন কিছু করার আবেদন) হল তালাব জাযিম (সুনির্দিষ্ট আবেদন) যা মেনে চলা ফরয। তাই সকল একশনের ক্ষেত্রে খুজতে হবে শারী’আহর নুসুস (দলীল) কি বলছে। এটাই হল আফ'আল এর ক্ষেত্রে 'আসল'


***লেখকঃ ইমতিয়াজ সেলিম

22.1.15

ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং

ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং

যে কোন বিষয় সম্বন্ধে সম্যক ধারনা পাওয়া যায় যখন সেই বিষয়টি সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর অধীনে বিবেচনা করা হয়। ইসলামী ব্যাংকিং এর বিষয়টিও তেমনই। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ব্যাঙ্কিং এর একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। এই বিশেষ ভূমিকার কারনে ‘ব্যাঙ্কিং ব্যবসা’ অন্যান্য ‘ব্যবসা/বাণিজ্য’ থেকে পৃথক। তার আইনি কাঠামোও পৃথক। ব্যাঙ্কিং ব্যবসা ছাড়া অন্য কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের নামের সঙ্গে ‘ব্যাঙ্কিং’ শব্দটি যুক্ত করতে পারে না (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন-১৯৯১, ধারা-৮)। ব্যাঙ্ক-কোম্পানি বলতে বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনাকারী কোন কোম্পানিকে বুঝায় (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন-১৯৯১, ধারা-৭(ণ))। এই ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে সকল কোম্পানি পণ্য উৎপাদন বা বাণিজ্য পরিচালনা করে এবং শুধুমাত্র এই উৎপাদন বা বানিজ্যের অর্থ সংস্থানের জন্য জনগণের নিকট থেকে টাকার আমানত গ্রহণ করে সেই সকল কোম্পানি ব্যাংক ব্যবসা করছে বলে গণ্য হবে না। ব্যাংক ব্যবসা বলতে অর্থ কর্জ প্রদান বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে জনসাধারণের নিকট থেকে এইরূপ আমানত গ্রহণ করা, যা চাহিবামাত্র বা অন্য কোনভাবে পরিশোধযোগ্য এবং চেক, ড্রাফ্‌ট, আদেশ বা অন্য কোন পদ্ধতিতে প্রত্যাহারযোগ্য (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন-১৯৯১, ধারা-৫(ত))। অর্থাৎ কোন ব্যাংক পণ্য উৎপাদন বা প্রকৃত বানিজ্য পরিচালনা করতে পারে না। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, ইসলামী ব্যাঙ্কিংসহ সব ধরনের ব্যাঙ্কিং এই ব্যাঙ্কিং সংজ্ঞার পরিধির ভিতর পরিচালিত হয়, যা সাধারণ ব্যবসা/বানিজ্য থেকে পৃথক। ইসলামী ব্যাঙ্কিং পরিচালনার বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার (Guidelines) প্রথম সেকশনে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হচ্ছেঃ “This guideline has been prepared mainly on the basis of Banking Companies Act 1991, Companies Act 1994 and Prudential Regulations of Bangladesh Bank. However, this guideline should be treated as supplementary, not substitute, to the existing banking laws, rules and regulations. In case of any point not covered under this guideline as also in case of any contradiction, the instruction issued under the Banking Companies Act and Companies Act will prevail.”

সরকারের রাজস্বনীতি (Fiscal Policy) বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) প্রয়োজনীয় মুদ্রানীতি (Monetary Policy) গ্রহন করে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রানীতি মূলত ব্যাংক-কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে থাকে। অর্থাৎ ব্যাংক হচ্ছে এই সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার নির্ধারণ ও বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ব্যাঙ্কগুলোর প্রধান কাজ হচ্ছে আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদান। অর্থাৎ, সংগ্রহীত আমানতের একটি অংশ গচ্ছিত রেখে বাকি অর্থ ঋণ প্রদান করা। কিন্তু এই প্রদানকৃত ঋণ আমানতদাতার (Depositor) আমানতকে হ্রাস করে না। বরং আমানতদাতা যেকোন সময় তার আমানত উত্তোলন করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটিকে ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় Fractional Reserve Banking বলা হয়। এই ক্রমাগত নতুন ঋণ সৃষ্টির (Credit Creation) মাধ্যমে ব্যাঙ্কগুলো নতুন অর্থ সৃষ্টি ও তার প্রবাহ বৃদ্ধি করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকসহ সকল ব্যাংকের কার্যক্রমকে সরকারের এই মৌল উদ্দেশ্য সাধনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হয়। ঋণ সৃষ্টির এই মৌলিক চরিত্র রক্ষার জন্যই ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সীমিত করা হয়। অর্থাৎ, ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকেও এই ঋণ সৃষ্টির আলোকে যাচাই করতে হবে।

কিন্তু ইসলামী ব্যাংক সরকারের এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাহ্যত একমত প্রকাশ করেনা। আদর্শগত কারনে ইসলামী ব্যাংক দাবী করে যে, তারা সুদ ভিত্তিক ঋণ প্রদান করেনা, বরং তারা মুলত বাণিজ্য (Trading) বা উৎপাদনে মূলধনী বিনিয়োগ (Equity Investment) করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকের এই ব্যবসায়িক দাবী আইনসংগত ‘ব্যাঙ্কিং ব্যবসার’ পরিপন্থী, যা আগেই উল্লেখ করেছি। বিপরীতমুখী দুটি ধারনার সমন্বয়ের এই অসম্ভব প্রচেষ্টার কারনে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম ও তাদের দালিলিক উপস্থাপনার ভিতর বিস্তর পার্থক্য, অসংগতি এবং জটিলতা দেখা যায়।

উপরন্তু, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আমাদের সমাজের ধারনার মাঝেও সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। ব্যাংকের ঋণপ্রদানকারী চরিত্রই আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের ধারনায় উপস্থিত। ইসলামী ব্যাংক এখানে কোন ব্যতিক্রম নয়। ইসলামী ব্যাংকের সহযোগিতায় যদি আপনি একটি গাড়ি কিনেন তবে আপনি সাধারণভাবে মনে করেন না যে গাড়িটি আপনি ইসলামী ব্যাংক থেকে কিনেছেন। বরং মনে করেন আপনি ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে (অর্থাৎ ঋণ নিয়ে) গাড়িটি কিনেছেন। আমরা সাধারণভাবে বলি না যে, ইসলামী ব্যাংক ভাল গাড়ি বিক্রি করে। যদিও এখানে দালিলিকভাবে ইসলামী ব্যাংক গাড়ি বিক্রেতা এবং আপনি গাড়ি ক্রেতা। অনুরূপভাবে কোন শিল্পপতি ইসলামী ব্যাংকের সহায়তায় কাঁচামাল ক্রয় করলে সাধারণভাবে তিনি মনে করেন না যে, ইসলামী ব্যাংক তার ব্যবসায়ের অংশীদার। বরং মনে করেন কাঁচামাল তিনি ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে কিনেছেন। সুতরাং, দেখা যায় ইসলামী ব্যাঙ্কিং এর ক্ষেত্রে সেবা গ্রহীতা ও সেবা প্রদানকারীর মাঝে ধারণাগত ঐক্য নেই, যা তাদের চুক্তিকে বাতিল বা অকার্যকর করে দেয়। আলোচনাটি এখানেই শেষ করে দেয়া যায়। তবু অধিকতর অনুধাবনের স্বার্থে প্রধান অসংগতিগুলোকে আরও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

লেনদেন ও পরিচালনার প্রকৃতিঃ

যেহেতু ব্যাংকিং লেনদেন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ সুদের হার নিয়ত্রন ও ঋণ সৃষ্টির জন্য, পরিচালিত হয়, সেহেতু তার লেনদেনের প্রকৃতিকে সীমাবদ্ধ করতে হয়। আইন ব্যাংকগুলোকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন পণ্যের ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবসা করতে অনুমোদন দেয় না (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন-১৯৯১, ধারা-৯)। অবশ্য এখানে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ধারাটি শিথিল করা হয়েছে। এখানে অনুধাবনের বিষয় হচ্ছে তাদের অনুসৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি অবশ্যই প্রকৃত বানিজ্যের অনুরূপ নয়। প্রকৃত বানিজ্যিক লেনদেন (Real Commercial Transaction) অর্থনীতিতে ঋণ সৃষ্টিতে কোন ভূমিকা রাখেনা। তাই এই ধরনের প্রকৃত বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যাঙ্কিং কোম্পানির আওতা বহির্ভূত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও নিয়ন্ত্রন ও তত্ত্বাবধানের সীমার বাইরে। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক তাদের এই ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতিতে এমন বৈশিষ্ট্য আরোপ করে যাতে তা চূড়ান্ত বিচারে ঋণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে ব্যহত না করে। এ কারনেই প্রচলিত (Conventional) ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন পদ্ধতির মাঝে প্রচুর সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। যেমনঃ

১. আমানতদাতাকে প্রদেয় এবং বিনিয়োগ থেকে অর্জিত লাভের হার (Mark-up) প্রচলিত ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে মিল রেখে নির্ধারণ করা হয়। কারন লাভ বা সুদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। অপরপক্ষে, প্রকৃত বাণিজ্যের লাভ বাজার চাহিদা ও ব্যবসায়িক ঝুকির উপর নির্ভরশীল, কোন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয় নয়।

২. ইসলামী ব্যাংক এবং প্রচলিত ব্যাংক প্রায় একই ধরনের পুঁজির পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy), Statutory Reserve, সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা (Asset-Liability Management), ঝুকি বিশ্লেষণ (Risk Analysis), বিনিয়োগকৃত সম্পদের শ্রেণীকরণ ইত্যাদির নীতি মেনে চলে। স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো অনুসরণের কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই।

৩. মূলধন বিনিয়োগের (Equity Investment) ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়, বর্তমানে যা হচ্ছে মোট মূলধন (Total Equity) এর সর্বোচ্চ ২৫%। এই সীমা কোন ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের (Debt and Equity) সামান্য অংশ। বিনিয়োগের এই সীমা ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক এই সীমার অতিরিক্ত মূলধনী বিনিয়োগের (Equity Investment) যে সকল উপায় (Instruments) অবলম্বন করে থাকে তা মূলধনের চরিত্র ধারন করেনা, বরং চূড়ান্ত বিচারে তা হয় ঋণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন (Quasi Debt)। যেমনঃ

ক. বিনিয়োগের উপর লাভের হার নির্ধারণ এবং অর্জিত লাভ বিতরণে (আমানতদাতাদের মাঝে) ‘অতিক্রান্ত সময়কে বিবেচনায় আনা

খ. বিনিয়োগের উপর ইসলামী ব্যাংকের দাবী (Claim) ঐ ব্যবসায় প্রকৃত মূলধনদাতাদের দাবীর উপরে স্থাপন করা বা অন্যান্য ঋণ সরবরাহকারী ব্যাংকের দাবীর সমপর্যায়ে রাখা

গ. বিনিয়োগ/ঋণ পুনঃতফসিল (Loan Rescheduling) এর বিধি অনুসরণ করা ইত্যাদি।

ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিনিয়োগগুলোকে তাদের নীতির অধীনেই গ্রহণ করে থাকে, অর্থাৎ ধরে নেয়া হয় ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগের এই সীমা অতিক্রম করেনি।

বিনিয়োগ প্রবাহে জটিলতাঃ

ইসলামী ব্যাংক আমানতদাতার কাছ থেকে ব্যবসার ব্যবস্থাপক (মুদারিব) হিসেবে আমানত গ্রহণ করে থাকে এবং আমানতদাতা হয় পুঁজি বিনিয়োগকারী (সাহিব আল-মাল)। অপরপক্ষে ইসলামী ব্যাংক পুঁজি বিনিয়োগকারী হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায় অর্থলগ্নি করে থাকে, যেখানে লগ্নিকৃত ব্যবসার প্রতিষ্ঠান/মালিক হয় ব্যবসার ব্যবস্থাপক। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক এখানে দ্বৈত চরিত্র ধারন করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ইসলামী ব্যাংক প্রকৃত অর্থে ব্যবসা ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করে না। কারন অর্থ লগ্নি করা আর ব্যবসা পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। তাই আমানতদাতার সঙ্গে তার চুক্তিটি অকার্যকর।

অর্থ প্রবাহের এই ধারা এবং দলিলাদি বিশ্লেষণ করে ইসলামী ব্যাংককে বড়জোর একটি বিশেষায়িত আর্থিক মাধ্যম (Special Purpose Vehicle) বলা যায়, যা Pass-Through পদ্ধতিতে অর্থ সঞ্চারন করছে, কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হবার শর্তগুলো পূরণ করেনা।

আমানত ব্যবস্থাপনায় জটিলতাঃ

যেকোন ধরনের বিনিয়োগ বিনিয়োগকারীর তহবিলকে সমপরিমাণে হ্রাস করে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ইসলামী ব্যাংক যখন আমানত বিনিয়োগ করে তখন আমানতদাতার আমানত শুধু অক্ষুন্নই থাকে না, আমানতদাতা যেকোনো সময় তা উত্তোলনও করতে পারে। ইসলামী ব্যাংককে এটি করতে হয় ঋণ সৃষ্টির (Credit Creation) উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। আমানতের এই বৈশিষ্ট্যটি কোন স্বাভাবিক ব্যবসায় পরিলক্ষিত হয় না। দ্বিতীয়ত, আমানতদাতাদের যেকোনো সময় আমানত ফেরতের এই অঙ্গিকার কোন ব্যাংকেরই সামর্থ্যের অধীন নয়, অর্থাৎ ব্যাংক সকল আমানতদাতাদের আমানত এক সঙ্গে ফেরত দিতে পারেনা। সুতরাং, তাদের এই অঙ্গিকার ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর।

হিসাব এবং কর কাঠামোঃ

প্রচলিত ব্যাংকের মতই ইসলামী ব্যাংকের হিসাব ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইনের অধীনে রক্ষা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত Guidelines on the Specimen Reports and Financial Statements for Banks under Islamic Shariah’-তে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাই দেখা যায় মুদারাবা এবং আল-ওয়াদিয়া হিসাবের (প্রচলিত ব্যাংকের সঞ্চয়ী এবং চলতি হিসাবের অনুরূপ হিসাব) অধীনে সংগৃহীত আমানত মূলধনী দায় (Equity Liability) না হয়ে সাধারণ দেনা (Debt Liability) হিসেবে দেখানো হয়। অর্থাৎ Accounting Standard ইসলামী ব্যাংকের আমানতকে সাধারণ ঋণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বিবেচনা করে সাধারণ দেনার শ্রেণীভুক্ত করে।

ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান সুদের মতই তার প্রদেয় লাভের উপর কর সুবিধা (Tax Benefit) পেয়ে থাকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ ক্ষেত্রে লাভকে সুদের বৈশিষ্ট্যেই বিবেচনা করে এবং প্রদেয় লাভকে সুদের মতই আর্থিক খরচ (Financial Expense) হিসেবে গণ্য করে। লাভকে আর্থিক খরচ হিসেবে গণ্য করার কারনে ইসলামী ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রাখতে পারে। ব্যাংকিং কোম্পানির আয়কর অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়কর থেকে ৩০% থেকে ৫০% অধিক হয়ে থাকে যাতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে Return on Capital এবং Return on Labor এর মাঝে ভারসাম্য বজায় থাকে। এ ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংককে পৃথক করা হয় না। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকের আয়কে তার বিনিয়োগকৃত তহবিলের বিপরীতে অর্জিত হয়েছে বলে ধরা হয়, তার ব্যবসায়িক শ্রমের (Labor) বিপরীতে নয়। সংক্ষেপে, হিসাব এবং কর কর্তৃপক্ষ ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকে মূলত ঋণ সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করে, কোন প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম হিসেবে নয়।

মুরাবাহা বিনিয়োগঃ

ইসলামী ব্যাংকের ৫০% এর অধিক লেনদেন হয় মুরাবাহা পদ্ধতিতে। তাই এই প্রকারের লেনদেনের দুটো সমস্যা আলাদাভাবে উল্লেখ করছি। প্রথমত, ব্যাংক এখানে যে পণ্যটি ক্রেতার কাছে বিক্রি করে তা বিক্রয়ের সময় তার মালিকানায় থাকেনা। দ্বিতীয়ত, ক্রেতা কোন কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এই উভয় রীতিকেই ইসলাম নিষিদ্ধ করে।

উপরের আলোচনা থেকে এটা বলা যায় যে, ইসলামের অর্থব্যবস্থা (Economy) এই কুফর ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কারন দুটি ব্যবস্থা দুটি বিপরীতমুখী মতাদর্শের (Ideology) ভিত্তিতে গঠিত। এই দুই মতাদর্শের মাঝে সমন্বয়ের চেষ্টা মানুষকে প্রতারিত করে মাত্র এবং এই প্রতারনা যুলুমের গণতান্ত্রিক-ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। তাই আজ ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হওয়াই হবে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। খিলাফাহ রাষ্ট্রই ইসলামের ন্যায় ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃত বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং সুষম বণ্টনের ক্ষেত্র তৈরি করবে। তখনই কেবল মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হবে।

***লেখকঃ মাহমুদ সাদিক