6.1.15

যায়িদ ইবন হারিসা (রা.)

যায়িদ ইবন হারিসা (রা.)

আবু উসামা যায়িদ নাম। হিব্বু রাসূলিল্লাহ (রাসূলুল্লাহ এর প্রীতিভাজন) তাঁর উপাধি, পিতা হারিসা এবং মাতা সু’দা বিনত সা’লাবা।

সু’দা বিনত সা’লাবা তাঁর শিশু পুত্র যায়িদকে সংগে করে পিতৃ গোত্র বনী মা’নের নিকট যাওয়ার জন্য যাত্রা করলেন। পিতৃ-গোত্রে পৌঁছার পূর্বেই একদিন রাতে বনী কায়নের লুটেরা দল তাঁদের তাঁবু আক্রমণ করে ধন সম্পদ, উট ইত্যাদি লুণ্ঠন এবং শিশুদের বন্দী করে নিয়ে যায়। এই বন্দী শিশুদের মধ্যে তাঁর পুত্র যায়িদ ইবন হারিসাও ছিলেন।

যায়িদের বয়স তখন আট বছর। লুটেরা দল তাঁকে বিক্রির উদ্দেশ্যে ‘উকাজ’ মেলায় নিয়ে যায়, হাকীম ইবন হিযাম ইবন খুয়াইলিদ নামে এক কুরাইশ নেতা চারশো’ দিরহামে তাঁকে খরীদ করেন। তাঁর সাথে আরো কিছু দাস খরীদ করে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন।

হাকীম ইবন হিযামের প্রত্যাবর্তনের খবর শুনে তাঁর ফুফু খাদীজা বিনত খুয়াইলিদ দেখা করতে আসেন। ফুফুকে তিনি বলেনঃ ফুফু উকাজ থেকে আমি বেশ কিছু দাস খরীদ করে এনেছি। এদের মধ্যে যেটা আপনার পসন্দ হয় বেছে নিন। আপনাকে হাদিয়া হিসাবে দান করলাম।’

হযরত খাদীজা দাসগুলির চেহারা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করার পর যায়িদ ইবন হারিসাকে চয়ন করলেন। কারণ, তিনি যায়িদের চেহারায় তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধির ছাপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি তাঁকে সংগে করে বাড়ীতে নিয়ে এলেন।

এ ঘটনার কিছুদিন পর মুহাম্মাদ (সাঃ) র সাথে খাদীজা পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি স্বামীকে কিছু উপহার দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। প্রিয় ক্রীতদাস যায়িদ ইবন হারিসা অপেক্ষা অধিকতর সুন্দর কোন জিনিস তিনি খুঁজে পেলেন না। এ ক্রীতদাসটিকেই তিনি স্বামীর হাতে তুলে দিলেন।

এ সৌভাগ্যবান বালক ক্রীতদাস মুহাম্মাদ (সাঃ) র তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। তাঁর মহান সাহচর্য লাভ করে উত্তম চারিত্রিক সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেলেন। এদিকে তাঁর স্নেহময়ী জননী পুত্র শোকে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর চোখের পানি কখনও শুকাতো না। রাতের ঘুম তাঁর হারাম হয়ে গিয়েছিল। তাঁর বড় দুঃখ ছিল, তাঁর ছেলেটি বেঁচে আছে, না ডাকাতদের হাতে মারা পড়েছে, এ কথাটি তিনি জানতেন না। তাই তিনি খুব হতাশ হয়ে পড়তেন। তাঁর পিতা হারিসা সম্ভাব্য সবস্থানে হারানো ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। পরিচিত-অপরিচিত, প্রতিটি মানুষের কাছে ছেলের সন্ধান জানতে চাইতেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন বিশিষ্ট কবি। এ সময় রচিত বহু কবিতায় তাঁর পুত্র হারানোর বেদনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। এমনি একটি কবিতায় তিনি বলেনঃ

‘‘যায়িদের জন্য আমি কাঁদছি, জানিনে তার কি হয়েছে,
সে কি জীবিত?
তবে তো ফেরার আশা আছে, নাকি মারা গেছে
আল্লাহর কসম! আমি জানিনে, অথচ জিজ্ঞেস করে চলেছি।
তোমাকে অপহরণ করেছে সমতল ভূমির লোকেরা, না পার্বত্য ভূমির?
উদয়ের সময় সূর্য স্মরণ করিয়ে দেয় তার কথা, আর যখন
অস্ত যায়, নতুন করে মনে করে দেয়।
আমি দেশ থেকে দেশান্তরে তোমার সন্ধানে
উট হাঁকিয়ে ফিরবো, কখনও আমি ক্লান্ত হবো না,
আমার বাহন উটও না। আমার জীবন থাকুক বা মৃত্যু আসুক।
প্রতিটি মানুষই তো মরণশীল- যত আশার পেছনেই দৌড়াক না কেন।’’

হজ্জ মৌসুমে যায়িদের গোত্রের কতিপয় লোক হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় এলো। কা’বার চতুর্দিকে তাওয়াফ করার সময় তারা যায়িদের মুখোমুখি হলো। তারা পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পেরে কুশল বিনিময় করলো। লোকগুলি হজ্জ আদায়ের পর গৃহে প্রত্যাবর্তন করে যায়িদের পিতা হারিসাকে তার হারানো ছেলের সন্ধান দিল।

ছেলের সন্ধান পেয়ে হারিসা সফরের প্রস্তুতি নিলেন। কলিজার টুকরা, চোখের পুত্তলি যায়িদের মুক্তিপণের অর্থও বাহনে উঠালেন। সফরসংগী হলেন হারিসার ভাই কা’ব। তাঁরা মক্কার পথে বিরামহীন চলার পর মুহাম্মাদ (সাঃ) র কাছে পৌঁছলেন এবং বললেনঃ

‘ওহে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! আপনারা আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী। অসহায়ের সাহায্যকারী, ক্ষুধার্তকে অন্নদানকারী ও আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দানকারী। আপনার কাছে আমাদের যে ছেলেটি আছে তার ব্যাপারে আমরা এসেছি। তার মুক্তিপণও সংগে নিয়ে এসেছি। আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন এবং আপনার ইচ্ছামত তার মুক্তিপণ নির্ধারণ করুন।’

মুহাম্মাদ (সাঃ) বললেনঃ ‘আপনারা কোন ছেলের কথা বলছেন?
- আপনার দাস যায়িদ ইবন হারিসা।
- মুক্তিপণের চেয়ে উত্তম কিছু আপনাদের জন্য নির্ধারণ করি, তা-কি আপনারা চান?
- কী তা?
- আমি তাকে আপনাদের সামনে ডাকছি। স্বেচ্ছায় সে নির্ধারণ করুক, আমার সাথে থাকবে, না আপনাদের সাথে যাবে, যদি আপনাদের সাথে যেতে চায়, মুক্তিপণ ছাড়া তাকে নিয়ে যাবেন। আর আমার সাথে থাকতে চাইলে আমার করার কিছুই নেই।
তারা সায় দিয়ে বললোঃ আপনি অত্যন্ত ন্যায় বিচারের কথা বলেছেন।’
মুহাম্মাদ (সাঃ) যায়িদকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু’ব্যক্তি কারা?
বললঃ ইনি আমার পিতা হারিসা ইবন শুরাহবীল। আর উনি আমার চাচা কা’ব।’
বললেনঃ ‘তুমি ইচ্ছা করলে তাঁদের সাথে যেতে পার, আর ইচ্ছা করলে আমার সাথেও থেকে যেতে পার।’
কোন রকম ইতস্ততঃ না করে সংগে সংগে তিনি বলে উঠলেনঃ ‘আমি আপনার সাথেই থাকবো।’
তাঁর পিতা বললেনঃ ‘যায়িদ, তোমার সর্বনাশ হোক! পিতা-মাতাকে ছেড়ে তুমি দাসত্ব বেছে নিলে?’
তিনি বললেনঃ ‘এ ব্যক্তির মাঝে আমি এমন কিছু দেখেছি, যাতে আমি কখনও তাকে ছেড়ে যেতে পারিনে।’

যায়িদের এ সিদ্ধান্তের পর মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর হাত ধরে কা’বার কাছে নিয়ে আসেন এবং হাজরে আসওয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে উপস্থিত কুরাইশদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করেনঃ ‘ওহে কুরাইশ জনমণ্ডলী! তোমরা সাক্ষী থাক, আজ থেকে যায়িদ আমার ছেলে। সে হবে আমার এবং আমি হবো তার উত্তরাধিকারী।’

এ ঘোষণায় যায়িদের বাবা-চাচা খুব খুশী হলেন। তারা তাকে মুহাম্মাদ (সাঃ) র নিকট রেখে প্রশান্ত চিত্তে দেশে ফিরে গেলেন। সেই দিন থেকে যায়িদ ইবন হারিসা হলেন যায়িদ ইবন মুহাম্মাদ। সবাই তাঁকে মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ছেলে হিসেবেই সম্বোধন করতো। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা সূরা আহযাবের- ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাক’- এ আয়াত নাযিল করে ধর্মপুত্র গ্রহণের প্রথা বাতিল করেন। অতঃপর আবার তিনি যায়িদ ইবন হারিসা নামে পরিচিতি লাভ করেন।

যায়িদ নিজের পিতা-মাতাকে ছেড়ে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে যখন বেছে নিয়েছিলেন, তখন জানতেন না কি জিতই না তিনি জিতেছেন। স্বীয় পরিবার-পরিজন ও গোত্রকে ছেড়ে যে মনিবকে তিনি চয়ন করলেন, তিনিই যে, সাইয়্যেদুল আওয়ালীন ওয়াল আখিরীন এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর রাসূল, এর কোন কিছুই তিনি জানতেন না। তার মনে তখন একটি বারের জন্যও এ চিন্তা উদয় হয়নি যে, এ বিশ্বে এমন একটি রাষ্ট্র কায়েম হবে যা পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র কল্যাণ ও ন্যায়বিচারে পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তিনিই হবেন সেই কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। না, এর কোন কিছুই তখন যায়িদের চিন্তা ও কল্পনায় আসেনি। সবই আল্লাহর অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তিনি অঢেল দান করেন।

এ ঘটনার মাত্র কয়েক বছর পর মুহাম্মাদ (সাঃ) নবুওয়্যাত লাভ করেন। যায়িদ হলেন পুরুষ দাসদের মধ্যে প্রথম বিশ্বাসী। পরবর্তীকালে তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বিশ্বাসভাজন আমীন, তাঁর সেনাবাহিনীর কমাণ্ডার এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে মদীনার অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক।

যায়িদ যেমন পিতা-মাতাকে ছেড়ে রাসূল (সাঃ)-কে বেছে নেন, তেমনি রাসূল (সাঃ)-ও তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসলেন এবং তাঁকে আপন সন্তান ও পরিবারবর্গের মধ্যে শামিল করে নেন। যায়িদ দূরে গেলে তিনি উৎকণ্ঠিত হতেন, ফিরে এলে উৎফুল্ল হতেন এবং এত আনন্দের সাথে তাঁকে গ্রহণ করতেন যে অন্য কারো সাক্ষাতের সময় তেমন দেখা যেত না। কোন এক অভিযান শেষে হযরত যায়িদ মদীনায় ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে যেভাবে গ্রহণ করেছিলেন, তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন হযরত আয়িশা (রা.)তিনি বলেনঃ

‘যায়িদ ইবন হারিসা মদীনায় ফিরে এলো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তখন আমার ঘরে। সে দরজার কড়া নাড়লো। রাসূল (সাঃ) প্রায় খালি গায়ে উঠে দাঁড়ালেন। তখন তাঁর দেহে নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত একপ্রস্থ কাপড় ছাড়া কিছু ছিল না। এ অবস্থায় কাপড় টানতে টানতে দরজার দিকে দৌড়ে গেলেন। তাঁর সাথে গলাগলি করলেন ও চুমু খেলেন। আল্লাহর কসম, এর আগে বা পরে আর কখনও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে এমন খালি গায়ে আমি দেখিনি।’

যায়িদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর গভীর ভালোবাসার কথা মুসলিম জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে লোকে তাকে ‘যায়িদ আল হুব্ব’ বলে সম্বোধন করতো এবং তাঁর উপাধি হয় ‘হিব্বু রাসূলিল্লাহ’ বা রাসূলুল্লাহর প্রীতিভাজন।

হযরত হামযা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূল (সাঃ) তাঁর সাথে যায়িদের ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। তাঁদের দু’জনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এমন কি হামযা কখনও সফরে গেলে তাঁর দ্বীনি ভাই যায়িদকে অসী বানিয়ে যেতেন।

‘উম্মু আয়মন’ নামে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এক দাসী ছিলেন। একদিন তিনি সাহাবীদের বললেনঃ কেউ যদি কোন জান্নাতী মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, সে উম্মু আয়মনকে বিয়ে করুক।’ হযরত যায়িদ আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-কে খুশী করার জন্য তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁরই গর্ভে প্রখ্যাত সেনানায়ক হযরত উসামা ইবন যায়িদ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের পর তিনি হযরত কুলসুম ইবন হিদামের মেহমান হন। হযরত উসাইদ ইবন হুদাইরের (রা.) সাথে তাঁর ভ্রাতৃ-সম্পর্ক কায়েম হয়। এতদিন তিনি নবী পরিবারের একজন সদস্য হিসাবে একসংগে থাকতেন। এখানে আসার পর তাঁকে পৃথক বাড়ী করে দেওয়া হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আপন ফুফাতো বোন জয়নব বিনত জাহাশের সাথে তার বিয়ে হয়। কিন্তু যয়নবের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তিনি তালাক দেন। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যয়নবকে বিয়ে করেন।

হযরত যায়িদ ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীরন্দায। বদর থেকে মূতা পর্যন্ত সকল অভিযানেই অংশগ্রহণ করেছিলেন। একমাত্র ‘মাররে ইয়াসী’ অভিযানে যোগদান করতে পারেননি। এ যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান।

হিজরী অষ্টম সনে একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেল। এ বছর রাসূল (সাঃ) ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একটি পত্রসহ হারিস ইবন উমাইর আল-আযদীকে বসরার শাসকের নিকট পাঠান। হারিস জর্দানের পূর্ব সীমান্তের ‘মূতা’ নামক স্থানে পৌঁছলে গাসসানী সম্রাটের একজন শাসক শুরাহবীল ইবন আমর পথ রোধ করে তাঁকে বন্দী করে। তারপর তাঁকে হত্যা করে। রাসূল (সাঃ) ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। কারণ, এর আগে আর কোন দূত এভাবে নিহত হয়নি। রাসূল (সাঃ) মূতায় অভিযান পরিচালনার জন্য তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করলেন এবং পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন হযরত যায়িদ ইবন হারিসার হাতে। রওয়ানার পূর্ব মুহূর্তে রাসূল (সাঃ) উপদেশ দিলেনঃ ‘যদি যায়িদ শহীদ হয়, দলটির পরবর্তী পরিচালক হবে জা’ফর ইবন আবী তালিব। জা’ফর শহীদ হলে পরিচালক হবে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। সেও যদি শহীদ হয় তাহলে তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে পরিচালক নির্বাচন করে নেবে।’

যায়িদের নেতৃত্বে বাহিনীকে মদীনা থেকে যাত্রা করে জর্দানের পূর্ব সীমান্তের ‘মায়ান’ নামক স্থানে পৌঁছলো। রোম সম্রাট হিরাকল গাসসানীদের পক্ষে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এক লাখ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলো। তার সাথে যোগ দিল পৌত্তলিক আরবদের আরও এক লাখ সৈন্য। এ সম্মিলিত বাহিনী মুসলিম বাহিনীর অনতিদূরে অবস্থান গ্রহণ করলো। ‘মায়ানে’ মুসলিম বাহিনী দু’রাত অবস্থান করে করণীয় বিষয় সম্পর্কে পরামর্শ করলেন। কেউ বললেন, পত্র মারফত শত্রু বাহিনীর সংখ্যা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে অবহিত করে পরবর্তী নির্দেশের প্রতীক্ষায় থাকা উচিত। কেউ বললেন, আমরা সংখ্যা, শক্তি বা আধিক্যের দ্বারা লড়াই করিনা। আমরা লড়াই করি এ দ্বীনের দ্বারা। যে উদ্দেশ্যে তোমরা বের হয়েছো, সেজন্য এগিয়ে চলো। হয় কামিয়াবী না হয় শাহাদাত- এর যে কোন একটি সাফল্য তোমরা লাভ করবে।

অতঃপর এই দুই অসম বাহিনী মুখোমুখি সংঘর্ষে অবতীর্ণ হলো। দু’লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার সৈন্যের বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখে রোমান বাহিনী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তাদের অন্তরে ভীতিরও সঞ্চার হলো।

যায়িদ ইবন হারিসা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য যে বীরত্ব সহকারে লড়াই করেন তার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। তীর ও বর্শার অসংখ্য আঘাতে তাঁর দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। অবশেষে, তিনি রণক্ষেত্রে ঢলে পড়েন। তারপর একে একে জাফর ইবন আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা তুলে নেন এবং বীরত্বের সাথে শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনীর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে খালিদ ইবন ওয়ালিদ কমাণ্ডার নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন নও মুসলিম। তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী অনিবার্য পরাজয় ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবে নবম হিজরীতে ৫৪ অথবা ৫৫ বছরে বয়সে হযরত যায়িদ শাহাদাত বরণ করেন।

মূতার দুঃখজনক সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট পৌঁছলে তিনি এতই শোকাতুর হয়ে পড়েন যে, আর কখনও তেমন শোকাভিভূত হতে দেখা যায়নি। তিনি শহীদ কমাণ্ডারদের বাড়ী গিয়ে তাদের পরিবারবর্গকে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। যায়িদের বাড়ী পৌঁছলে তাঁর ছোট্ট মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে রাসূল (সাঃ)-কে জড়িয়ে ধরে এবং রাসূল (সাঃ) উচ্চস্বরে কেঁদে ফেলেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে সা’দ ইবন উবাদা বলে ওঠেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, একি?তিনি বলেনঃ ‘এ হচ্ছে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।’

রাসূল (সাঃ) বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে যায়িদের অল্পবয়স্ক পুত্র উসামাকে পিতৃ হত্যার বদলা নেওয়ার জন্য এক বাহিনী সহকারে পাঠান। এত অল্পবয়স্ক ব্যক্তির নেতৃত্ব অনেকের পছন্দ হলো না। রাসূল (সাঃ) একথা জানতে পেরে বললেনঃ ‘তোমরা পূর্বে তার পিতার নেতৃত্বের সমালোচনা করেছিলে। এখন তার পুত্রের নেতৃত্বে সন্তুষ্ট হতে পারছো না। আল্লাহর কসম। যায়িদ নেতা হওয়ার যোগ্য ছিল এবং সে ছিল আমার সর্বাধিক প্রিয়। তারপর আমার সবচেয়ে প্রিয় তাঁর পুত্র উসামা।’ উসামা ছিলেন পিতার উপযুক্ত সন্তান। পিতৃহত্যার উপযুক্ত বদলা নিয়ে তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রতি ভক্তি, ভালোবাসা, আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল হযরত যায়িদের জীবনের একমাত্র ব্রত। তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় একথার প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত উম্মু আয়মন (রা.) ছিলেন বেশী বয়সের প্রায় বৃদ্ধা, বাহ্যিক রূপহীনা এক নারী। শুধু রাসূল (সাঃ)-কে খুশী করার উদ্দেশ্যেই হযরত যায়িদ (রা.) তাঁকে বিয়ে করেন। হযরত যয়নাবের (রা.) সাথে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তিনি নিজেই আবার যয়নাবের (রা.) কাছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বিয়ের পয়গাম উত্থাপন করেন। শুধুমাত্র এজন্য যে, রাসূল (সাঃ) তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণে হযরত যয়নাবের (রা.) প্রতি সম্মানের খাতিরে তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাননি। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে শুধু প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন। (মুসলিম)

হযরত যায়িদ ও তাঁর সন্তানদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সীমাহীন ভালোবাসা লক্ষ্য করে হযরত আয়িশা (রা.) বলতেনঃ ‘যদি যায়িদ জীবিত থাকতেন, রাসূল (সাঃ) মৃত্যুর পর হয়তো তাকেই স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন।’

3.1.15

জা’ফর ইবন আবী তালিব (রা.)

জাফর ইবন আবী তালিব (রা.)

আবু আবদিল্লাহ জাফর নাম, পিতা আবু তালিব এবং মাতা ফাতিমা। কুরাইশ গোত্রের হাশেমী শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চাচাত ভাই এবং হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর সহোদর। বয়সে আলী (রা.) থেকে দশ বছর বড়।

বনী আবদে মান্নাফের পাঁচ ব্যক্তির চেহারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চেহারার সাথে এত বেশী মিল ছিল যে প্রায়শঃ ক্ষীণ দৃষ্টির লোকেরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলতো। সে পাঁচ ব্যক্তি হলেনঃ

১. আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস ইবন আবদিল মুত্তালিব। তিনি একাধারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চাচাতো ভাই এবং দুধ ভাইও
২. কুসাম ইবনুল আব্বাস ইবন মুত্তালিব। তিনিও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চাচাতো ভাই
৩. আস-সায়িব ইবন উবায়িদ ইবন আবদে ইয়াযিদ ইবন হাশিম। তিনি ছিলেন ইমাম শাফেয়ীর (রহ.) পিতামহ
৪. হাসান ইবন আলী- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দৌহিত্র। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চেহারার সাথে তাঁর চেহারার সাদৃশ্য ছিল সর্বাধিক
৫. জাফর ইবন আবী তালিব

কুরাইশদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও অধিক সন্তান-সন্ততি ও পোষ্যের কারণে আবু তালিবের আর্থিক অবস্থা ছিল দারুণ অসচ্ছল। মরার ওপর খাড়ার ঘার মত সেই অনাবৃষ্টির বছরটি তাঁর অসচ্ছল অবস্থাকে আরও নিদারুণ করে তোলে। সেই মারাত্মক খরার বছরে কুরাইশদের সব ফসল পুড়ে যায়, গবাদি পশুও ধ্বংস হয়ে যায়। মানুষের মধ্যে একটা হাহাকার পড়ে যায়। এ সময় বনী হাশিমের মধ্যে ‍মুহাম্মদ বিন আবদিল্লাহ এবং তাঁর চাচা আব্বাস অপেক্ষা অধিকতর সচ্ছল ব্যক্তি আর কেউ ছিলেন না।

একদিন মুহাম্মাদ (সাঃ) চাচা আব্বাসকে বললেনঃ চাচা, আপনার ভাই আবু তালিবের তো অনেক সন্তানাদি। মানুষ এ সময় দারুণ দুর্ভিক্ষ ও অন্নকষ্টের মধ্যে আছে। চলুন না আমরা তাঁর কাছে যাই এবং তাঁর কিছু সন্তানের বোঝা আমাদের কাঁধে তুলে নেই। তাঁর একটি ছেলেকে আমি নেব এবং অপর একটিকে আপনি নেবেন। আব্বাস মন্তব্য করলেনঃ ‘তুমি সত্যিই একটি কল্যাণের দিকে আহ্বান জানিয়েছ এবং একটি ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করেছ।

অতঃপর তাঁরা দুজন আবু তালিবের নিকট গেলেন। বললেনঃআমরা এসেছি আপনার পরিবারের কিছু বোঝা লাঘব করতে, যাতে মানুষ যে দুর্ভিক্ষে নিপতিত হয়েছে তা থেকে আপনি কিছুটা মুক্তি পান। আবু তালিব বললেনঃআমার জন্য আকীলকে (আকীল ইবন আবী তালিব) রেখে তোমরা যা খুশী তাই করতে পার।অতঃপর মুহাম্মাদ (সাঃ) নিলেন আলীকে এবং আব্বাস জাফরকে।

আলী প্রতিপালিত হতে লাগলেন মুহাম্মাদ (সাঃ) এর তত্ত্বাবধানে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে নবুওয়্যাত দান করেন এবং যুবকদের মধ্যে আলীই তাঁর ওপর প্রথম ঈমান আনার সৌভাগ্য অর্জন করেন। অন্যদিকে জাফর তাঁর চাচা আব্বাসের নিকট প্রতিপালিত হয়ে যৌবনে পদার্পণ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে স্বনির্ভর হন।

জাফর ইবন আবী তালিব ও তাঁর সহধর্মিনী আসমা বিনত উমাইস ইসলামী নূরের কাফিলার যাত্রাপথেই তাতে যোগদান করেন। তাঁরা দুজনই হযরত সিদ্দীকে আকবরের হাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দারুল আরকামেপ্রবেশের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। (‘দারুল আরকাম’ মক্কার একটি গৃহ। দারুল ইসলাম নামেও প্রসিদ্ধ। গৃহটি আরকাম ইবন আবদ মান্নাফ আল মাখযূমীর। মক্কায় রাসূল (সাঃ) এ বাড়ী থেকে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন।) একদিন আবু তালিব দেখতে পেলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পাশে দাঁড়িয়ে আলী নামায আদায় করছেন। এ দৃশ্য আবু তালিবের খুবই ভালো লাগলো। পাশেই দাঁড়ানো জাফরের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেনঃ ‘জাফর, তুমিও তোমার চাচাতো ভাই মুহাম্মাদের (সাঃ) একপাশে দাঁড়িয়ে যাও।’ জাফর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বাম দিকে দাঁড়িয়ে সেদিন নামায আদায় করেন। এ ঘটনা জাফরের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এর অল্পকিছু দিনের মধ্যেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বে মাত্র ৩১/৩২ জন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

প্রথম যুগের মুসলমানরা যেসব দৈহিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করেছিল তার সবই এ হাশেমী যুবক ও তাঁর যুবতী স্ত্রী ভোগ করেছিলেন। কিন্তু কখনও তাঁরা ধৈর্যহারা হননি। তাঁরা জানতেন, জান্নাতের পথ বন্ধুর ও কন্টাকাকীর্ণ। তবে যে বিষটি তাঁদের অন্যান্য দ্বীনী ভাইদের মত তাঁদেরকেও পীড়া দিত এবং ভাবিয়ে তুলতো তা হল, ইসলামী অনুশাসনগুলি পালনে এবং এক আল্লাহর ইবাদাতে কুরাইশদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুরাইশরা তাঁদের জন্য ওঁৎ পেতে থেকে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ গড়ে তুলতো।

এমনি এক মুহূর্তে জাফর ইবন আবী তালিব, তাঁর স্ত্রী এবং আরও কিছু সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট হাবশায় হিজরাতের অনুমতি চাইলেন। অত্যন্ত বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তাদের অনুমতি দিলেন। ব্যাপারটি তাঁর কাছে এত কষ্টদায়ক ছিল এ জন্য যে, এসব সৎ ও পবিত্র-আত্মা লোক তাদের প্রিয় জন্মভূমি-শৈশব কৈশোর ও যৌবনের চারণভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে শুধু এ কারণে যে, তারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তাছাড়া অন্য কোন অপরাধে তারা অপরাধী নয়। তারা দেশত্যাগ করছে, তাদের ওপর যুলুম, উৎপীড়ন চলছে আর তিনি নিতান্ত অসহায়ভাবে তা তাকিয়ে দেখছেন।

মুহাজিরদের প্রথম দলটি জাফর ইবন আবী তালিবের নেতৃত্বে হাবশায় উপনীত হলেন। সেখানে তাঁরা সৎ ন্যায়নিষ্ঠ নাজ্জাশীর দরবারে আশ্রয় লাভ করলেন। ইসলাম গ্রহণের পর এই প্রথমবারের মত তাঁরা একটু নিরাপত্তার স্বাদ এবং নিঃশঙ্কচিত্তে স্বাধীনভাবে এক আল্লাহর ইবাদাতের মাধুর্য অনুভব করলেন।

মুসলিমদের এ দলটির হাবশায় হিজরাত এবং সেখানে বাদশার দরবারে আশ্রয় ও নিরাপত্তা লাভের ব্যাপারে কুরাইশরা অবহিত ছিল। তারা তাদেরকে হত্যা অথবা ফিরিয়ে আনার জন্য ষড়যন্ত্র আরম্ভ করল। এই ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হযরত উম্মু সালামা (রা.) বলেনঃ আমরা যখন হাবশায় পৌঁছলাম, সেখানে সৎ প্রতিবেশী এবং আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করলাম। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের ব্যাপারে আমরা কোন প্রকার যুলুম-অত্যাচারের সম্মুখীন হলাম না অথবা আমাদের অপছন্দনীয় কোন কথাও আমরা শুনলাম না। এ কথা কুরাইশরা জানতে পেরে ষড়যন্ত্র শুরু করল। তারা তাদের মধ্য থেকে শক্তিমান ও তাগড়া জোয়ান দুব্যক্তিকে নির্বাচন করে নাজ্জাশীর কাছে পাঠাল। এ দুব্যক্তি হল, আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবন আবী রাবীয়া। তারা তাদের দুজনের সংগে নাজ্জাশী ও তার দরবারের চাটুকার পাদ্রীদের জন্য প্রচুর মূল্যবান উপঢৌকন পাঠাল। তাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছিল, হাবশার রাজার সাথে আমাদের বিষয়টি আলোচনার পূর্বেই প্রত্যেক পাদ্রীর জন্য নির্ধারিত হাদিয়া তাদের পৌঁছে দেবে।’

তারা দুজন হাবশা পৌঁছে নাজ্জাশীর পাদ্রীদের সাথে মিলিত হল এবং তাদের প্রত্যেককে তার জন্য নির্ধারিত উপঢৌকন পৌছে দিয়ে বললোঃ ‘‘বাদশাহর সাম্রাজ্যে আমাদের কিছু বিভ্রান্ত সন্তান আশ্রয় নিয়েছে। তারা তাদের পিতৃপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি করেছে। আমরা যখন তাদের সম্পর্কে বাদশাহর সংগে কথা বলবো, আপনারা তাদের দ্বীন সম্পর্কে কোন রকম জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই তাদেরকে আমাদের নিকট ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাদশাহকে একটু অনুরোধ করবেন। কারণ, তাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দইতো তাদের বিশ্বাস ও আচরণ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। তারাই তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন।’’

দরবারী পাদ্রীরা তাদের কথায় সায় দিল।

উম্মু সালামা বলেনঃবাদশাহ আমাদের কাউকে ডেকে তার কথা শুনুক, এর চেয়ে বিরক্তিকর আর কিছু আমর ইবনুল আস ও তার সংগীর নিকট ছিলনা।

তারা দুজন নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে উপঢৌকন পেশ করল। উপঢৌকনগুলি নাজ্জাশীল খুবই পছন্দ হল। তিনি সেগুলির ভূয়সী প্রশংসা করলেন। অতঃপর তারা বাদশাহকে বললঃ ‘‘মহামান্য বাদশাহ, আমাদের কিছু দুষ্টু প্রকৃতির ছেলে আপনার সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছে। তারা এমন একটি ধর্ম আবিষ্কার করেছে যা আমরাও জানিনে এবং আপনিও জানেন না। তারা আমাদের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু আপনাদের দ্বীনও গ্রহণ করেনি। তাদের পিতা, পিতৃব্য ও গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। তাদের সৃষ্ট অশান্তি ও বিপর্যয় সম্পর্কে তাদের গোত্রীয় নেতারাই অধিক জ্ঞাত।’’

নাজ্জাশী তাঁর দরবারে উপস্থিত পাদ্রীদের দিকে তাকালেন। তারা বললঃ মহামান্য বাদশাহ, তারা সত্য কথাই বলেছে। কারণ তাদের গোত্রীয় নেতারাই তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। গোত্রীয় নেতাদের নিকট আপনি তাদের ফেরত পাঠিয়ে দিন, যাতে গোত্রীয় নেতারা তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

পাদ্রীদের কথায় বাদশাহ দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হলেন। বললেনঃ ‘‘আল্লাহর কসম! তা হতে পারেনা। তাদের প্রতি যে অভিযোগ আরোপ করা হচ্ছে সে সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ না করা পর্যন্ত একজনকেও আমি সমর্পণ করব না। সত্যিই তারা যদি এমনই হয় যেমন এ দুব্যক্তি বলছে, তাহলে তাদেরকে সমর্পণ করব। তা না হলে তারা যতদিন আমার আশ্রয়ে থাকতে চায়, আমি তাদেরকে নিরাপত্তার সাথে থাকতে দেব।’’

উম্মু সালামা বলেনঃ ‘‘অতঃপর নাজ্জাশী আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য। যাওয়ার আগে আমরা সকলে একস্থানে সমবেত হলাম। আমরা অনুমান করলাম, নিশ্চয় বাদশাহ আমাদের নিকট আমাদের দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, যা আমরা বিশ্বাস করি তা প্রকাশ করে দেব। আর সবার পক্ষ থেকে জাফর ইবন আবী তালিব কথা বলবেন। অন্য কেউ কোন কথা বলবে না।’’

উম্মু সালামা বলেনঃ “অতঃপর নাজ্জাশীর নিকট গিয়ে দেখতে পেলাম, তিনি তাঁর সকল পাদ্রীদের ডেকেছেন। তারা তাদের বিশেষ অভিজাত পোশাক পরে সাথে ধর্মীয় গ্রন্থসমূহ মেলে ধরে বাদশাহর ডান ও বাম দিকে বসে আছে। আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবন আবী রাবীয়াকেও আমরা বাদশাহর নিকট দেখতে পেলাম। মজলিসে আমরা স্থির হয়ে বসার পর, নাজ্জাশী আমাদের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ সে কোন ধর্মমত- যা তোমরা নতুন আবিষ্কার করেছ এবং যার কারণে তোমরা তোমাদের খান্দানী ধর্মকেও পরিত্যাগ করেছ, অথচ আমার অথবা অন্যকোন ধর্মও গ্রহণ করনি?’

জাফর ইবন আবী তালিব সবার পক্ষ থেকে বললেনঃ ‘‘মহামান্য বাদশাহ! আমরা ছিলাম একটি মূর্খ জাতি। মূর্তির উপাসনা করতাম, মৃত জন্তু ভক্ষণ করতাম, অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম এবং প্রতিবেশীর সাথে অসদ্ব্যবহার করতাম। আমাদের সবলরা দুর্বলদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করত। আমরা ছিলাম এমনি এক অবস্থায়। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমাদের নিকট একজন রাসূল পাঠালেন। আমরা তাঁর বংশ, সততা, আমানতদারী, পবিত্রতা ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানালেন, যেন আমরা তার একত্বে বিশ্বাস করি, তাঁর ইবাদত করি এবং আমরা ও আমাদের পূর্ব পুরুষরা যেসব গাছ, পাথর ও মূর্তির পূজা করতাম তা পরিত্যাগ করি। তিনি আমাদের নির্দেশ দিলেন সত্য বলার, গচ্ছিত সম্পদ যথাযথ প্রত্যর্পণের, আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখার, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার, হারাম কাজ ও অবৈধ রক্তপাত থেকে বিরত থাকার। তাছাড়া অশ্লীল কাজ, মিথ্যা বলা, ইয়াতিমের সম্পদ ভক্ষণ ও নিষ্কলূষ চরিত্রের নারীর প্রতি অপবাদ দেয়া থেকে নিষেধ করলেন। তিনি আমাদের আরও আদেশ করেছেন এক আল্লাহর ইবাদত করার, তাঁর সাথে অন্য কিছু শরীক না করার, নামায কায়েম করার, যাকাত দানের এবং রমযান মাসে রোযা রাখার। আমরা তাঁকে সত্যবাদী জেনে তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি এবং আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণ করেছি। সুতরাং যা তিনি আমাদের জন্য হালাল এবং হারাম ঘোষণা করেছেন, আমরা তা হালাল ও হারাম বলে বিশ্বাস করেছি। মহামান্য বাদশাহ! অতঃপর আমাদের জাতির সকলেই আমাদের ওপর বাড়াবাড়ি আরম্ভ করল। তারা আমাদের দ্বীন থেকে পুনরায় মূর্তিপূজার দিকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আমাদের ওপর অত্যাচার চালাল। তারা যখন আমাদেরকে অত্যাচার উৎপীড়নে জর্জরিত করে তুলল এবং আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল, তখন আমরা অন্য কোথাও না গিয়ে আপনার এখানেই আসাকেই প্রাধান্য দিলাম এই আশায় যে, আপনার এখানে আমরা অত্যাচারিত হব না।’’

উম্মু সালামা বলেনঃ “অতঃপর নাজ্জাশী জাফর ইবন আবী তালিবের দিকে একটু তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের নবী আল্লাহর নিকট থেকে যা নিয়ে এসেছেন তার কিছু অংশ কি তোমাদের সংগে আছে?’ তিনি বললেনঃ ‘হ্যাঁ।’ আমাকে একটু পাঠ করে শুনাও তো।জাফর পাঠ করলেনঃ কাফ-হা-ইয়া-আইন-সাদ। এ তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করেছিল গোপনে। সে বলেছিলোঃআমার অস্থি দুর্বল হয়েছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক সাদা হয়েছে; হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে আহ্‌বান করে আমি কখনও ব্যর্থকাম হইনি। এভাবে তিনি পবিত্র কুর’আনের সূরা মারঈয়ামের প্রথম অংশ পাঠ করে শুনালেন। আল্লাহর কালাম শুনে নাজ্জাশী এত কাঁদলেন যে অশ্রুধারায় তার শ্মশ্রু সিক্ত হয়ে গেল এবং দরবারে উপস্থিত পাদ্রীরা কেঁদে তাদের সম্মুখে উন্মুক্ত ধর্মগ্রন্থসমূহ ভিজিয়ে দিল। কিছুটা শান্ত হয়ে নাজ্জাশী বললেনঃ তোমাদের নবী যা নিয়ে এসেছেন এবং তাঁর পূর্বে ঈসা (আ.) যা নিয়ে এসেছিলেন উভয়ের উৎস এক। অতঃপর আমর ও তার সংগীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমরা চলে যাও। আল্লাহর কসম! তোমাদের হাতে আমি তাদেরকে সমর্পণ করব না।

উম্মু সালামা বলেনঃ ‘আমরা নাজ্জাশীর দরবার থেকে বেরিয়ে এলে আমর ইবনুল আস আমাদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে তার সংগীকে বললোঃআল্লাহর কসম! আগামীকাল আবার আমরা বাদশাহর নিকট আসব এবং তাঁর নিকটে তাদের এমন সব কার্যকলাপ তুলে ধরব যাতে তাঁর হৃদয়ে হিংসার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে এবং তাদের প্রতি ঘৃণায় তাঁর অন্তর পূর্ণ হয়ে যায়। তাদেরকে সম্পূর্ণ উৎখাত করার জন্য আমরা অবশ্যই বাদশাহকে উৎসাহিত করব। একথা শুনে তার সংগী আবদুল্লাহ ইবন আবী রাবীয়া বললঃ আমর, এমনটি করা উচিত হবে না। ধর্মীয় ব্যাপারে আমাদের বিরোধিতা করলেও তারা তো আমাদের আত্মীয়। আমর বললঃ তুমি রাখ তো এসব কথা। আমি অবশ্যই বাদশাহকে এমন সব কথা অবহিত করব যা তাদের অন্তরকে কাঁপিয়ে তুলবে। বাদশাহকে আমি বলবঃ ‘তারা মনে করে ঈসা ইবন মারঈয়াম অন্যদের মতই একজন বান্দা।

পরদিন সত্যি সত্যিই আমর নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললঃ মহামান্য বাদশাহ! এসব লোক, যাদেরকে আপনি আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করছেন, তারা ঈসা ইবন মারঈয়াম সম্পর্কে একটা মারাত্মক কথা বলে থাকে। আপনি তাদের কাছে লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখুন তারা তাঁর সম্পর্কে কি বলে।

উম্মু সালামা বলেনঃ “আমরা একথা জানতে পেয়ে ভীষণ দুঃশ্চিন্তায় পড়লাম। আমরা পরস্পর পরস্পরকে জিজ্ঞেস করলামঃ বাদশাহ যখন ঈসা ইবন মারঈয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা তখন কি বলবে?’ সবাই ঐকমত্যে পৌছলাম; তাঁর সম্পর্কে আল্লাহ যা বলেছেন তার অতিরিক্ত আর কিছুই আমরা বলব না। আমাদের নবী তাঁর সম্পর্কে যা কিছু এনেছেন তা থেকে আমরা এক আংগুলের ডগা পরিমাণও বাড়িয়ে বলবনা। তাতে আমাদের ভাগ্যে যা থাকে তা-ই হবে। আমাদের পক্ষ থেকে এবারও জাফর ইবন আবী তালিব কথা বলবেন।”

নাজ্জাশী আমাদের ডেকে পাঠালেন। আমরা তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলাম, পাদ্রীরা পূর্বের দিনের মত একই বেশভূষায় বসে আছে। আমর ইবনুল আস তার সংগী সেখানে উপস্থিত হতেই বাদশাহ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ঈসা ইবন মারঈয়াম সম্পর্কে তোমরা কি বলে থাক?’ জাফর ইবন আবী তালিব বললেনঃ আমাদের নবী তাঁর সম্পর্কে যা বলেন তার অতিরিক্ত আমরা কিছুই বলিনে। তিনি কি বলে থাকেন?’ তিনি বলেনঃ ‘তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি তার রূহ ও কালাম- যা তিনি কুমারী ও পবিত্র মারঈয়াম এর প্রতি নিক্ষেপ করেছেন।

জাফরের কথা শুনে নাজ্জাশী হাত দ্বারা মাটিতে আঘাত করতে করতে বললেনঃ আল্লাহর কসম! ঈসা ইবন মারঈয়াম সম্পর্কে তোমাদের নবী যা বলেছেন তা একটি লোম পরিমাণও অতিরঞ্জন নয়।একথা শুনে নাজ্জাশীর আশেপাশে উপবিষ্ট পেট্রিয়ার্করা তাদের নাসিকাছিদ্র দিয়ে ঘৃণাসূচক শব্দ বের করল। বাদশাহ বললেনঃ তা তোমরা যতই ঘৃণা কর না কেন।তারপর তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ ‘যাও, তোমরা স্বাধীন ও নিরাপদ। কেউ তোমাদের গালি দিলে বা কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তার বদলা নেওয়া হবে। আল্লাহর কসম! আমি সোনার পাহাড় লাভ করি, আর তার বিনিময়ে তোমাদের কারও ওপর সামান্য বিপদ আপতিত হোক- এটাও আমার পছন্দনীয় নয়।’ এরপর তিনি আমর ও তার সংগীর দিকে ফিরে বললেনঃ এ দুব্যক্তির উপঢৌকন তাদেরকে ফেরত দাও। আমার সেগুলি প্রয়োজন নেই।

উম্মু সালামা বলেনঃ ‘এভাবে আমর ও তাঁর সংগীর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হল এবং তারা ভগ্ন হৃদয়ে পরাজিত ও হতাশ অবস্থায় দরবার থেকে বেয়ে গেল। আর আমরা উত্তম বাসগৃহে সম্মানিত প্রতিবেশীর মত নাজ্জাশীর নিকট বসবাস করতে লাগলাম।’

অতঃপর জাফর ইবন আবী তালিব ও তাঁর সহধর্মিনী নাজ্জাশীর আশ্রয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে পূর্ণ দশটি বছর অতিবাহিত করেন। সপ্তম হিজরীতে তাঁরা দুজন এবং আরও কিছু মুসলিম হাবশা থেকে ইয়াসরিবের (মদীনা) দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁরাও মদীনায় পৌঁছলেন, আর এদিকে রাসূল (সাঃ) খাইবার বিজয় শেষ করে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন। রাসূল (সাঃ) জাফরকে দেখে এত খুশী হলেন যে, তাঁর দুচোখের মাঝখানে চুমু দিয়ে বললেনঃ আমি জানিনে, খাইবার বিজয় আর জাফরের আগমণ- দুটির কোনটির কারণে আমি বেশী খুশী।

সাধারণভাবে সমগ্র মুসলিম সমাজ এবং বিশেষভাবে গরীব মুসলিমদের আনন্দ ও খুশী জাফরের আগমণে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর থেকে বিন্দুমাত্র কম ছিল না। কারণ জাফর ছিলেন গরীব-মিসকীনদের প্রতি ভীষণ দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। এ কারণে তাঁকে ডাকা হত আবূল মাসাকীন বা মিসকীনদের পিতা বলে।

জাফর ইবন আবী তালিবের মদীনায় আসার পর একটি বছর কেটে গেল। অষ্টম হিজরীর প্রথম দিকে সিরিয়ার রোমান বাহিনীকে আক্রমণের জন্য রাসূল (সাঃ) সেনাবাহিনী প্রস্তুত করলেন। যায়িদ বিন হারিসাকে সেনাপতি নিয়োগ করে তিনি বললেনঃ যায়িদ নিহত হলে আমীর হবে জাফর ইবন আবী তালিব। জাফর নিহত বা আহত হলে আমীর হবে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। আর সে নিহত বা আহত হলে মুসলমানরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে আমীর নির্বাচন করবে।

মুসলিম বাহিনী জর্দানের সিরিয়া সীমান্তের মূতানামক স্থানে পৌঁছে দেখতে পেল, এক লাখ রোমান সৈন্য তাদের মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত এবং তাদের সাহায্যের জন্য লাখম, জুজাম, কুদাআ ইত্যাদি আরব গোত্রের আরও এক লাখ খৃষ্টান সৈন্য পেছনে প্রতীক্ষা করছে। অন্যদিকে মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা মাত্র তিন হাজার। যুদ্ধ শুরু হতেই যায়িদ বিন হারিসা বীরের ন্যায় শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর জাফর বিন আবী তালিব তাঁর ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং শত্রু বাহিনী যাতে সেটি ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য নিজের তরবারী দ্বারা ঘোড়াটিকে হত্যা করে ফেলেন। তারপর পতাকাটি তুলে ধরেন রোমান বাহিনীর অভ্যন্তরভাগে বহু দূর পর্যন্ত প্রবেশ করে শত্রু নিধন কার্য চালাতে থাকেন। এমতাবস্থায় তাঁর ডান হাতটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তিনি বাম হাতে পতাকা উঁচু করে ধরেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তরবারির অন্য একটি আঘাতে তাঁর বাম হাতটিও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবুও তিনি হাল ছাড়লেন না। বাহু দিয়ে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে তিনি ইসলামী পতাকা সমুন্নত রাখলেন। এ অবস্থায় কিছুক্ষণ পর তরবারির তৃতীয় একটি আঘাত তাঁর দেহটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।

অতঃপর পতাকাটি আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তুলে নিলেন। শত্রু সৈন্যের সাথে বীর বিক্রমে লড়তে লড়তে তিনিও তাঁর দুই সাথীর অনুগামী হলেন। তারপর খালিদ বিন ওয়ালিদ পতাকা হাতে নিয়ে মুসলিম বাহিনীকে উদ্ধার করেন।

এ যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমারও অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেনঃ ‘জাফরের লাশ তালাশ করে দেখা গেল, শুধু তাঁর সামনের দিকেই পঞ্চাশটি ক্ষতচিহ্ন। সারা দেহে তাঁর নব্বইটিরও বেশী ক্ষত ছিল। কিন্তু তার একটিও পেছন দিকে ছিল না।’

এ তিন সেনাপতির শাহাদাতের খবর শুনে রাসূল (সাঃ) দারুণভাবে ব্যথিত হন। বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তাঁর চাচাত ভাই জাফরের বাড়ীতে যান। তখন তাঁর স্ত্রী আসমা স্বামীকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি রুটির জন্য আটা বানিয়ে রেখেছেন, ছেলেমেয়েদের গোসল করিয়ে তেল মাখিয়েছেন এবং তাদেরকে নতুন পোশাক পরিয়েছেন।

আসমা বলেনঃ ‘পাতলা ও পরিষ্কার একখানা কাপড় দিয়ে পবিত্র মুখমণ্ডল ঢেকে রাসূল (সাঃ)-কে আমাদের বাড়ীর দিকে আসতে দেখে আমার মনে নানারকম ভীতি ও শঙ্কার উদয় হল। কিন্তু খারাপ কিছু শুনতে হয় এ ভয়ে আমি তাঁকে জাফর সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পাচ্ছিলাম না। কুশলাদি জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেনঃ জাফরের ছেলেমেয়েদের আমার কাছে নিয়ে এস।আমি তাদেরকে ডাকলাম। তারা খুশিতে বাগবাগ হয়ে কে আগে রাসূল (সাঃ) এর নিকট পৌঁছবে এরূপ একটা প্রতিযোগিতা নিয়ে দৌড় দিল। রাসূল (সাঃ) তাদেরকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে লাগলেন। তখন তাঁর দুচোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আপনি কাঁদছেন কেন? জাফর ও তার সংগী দুজনের কোন দুঃসংবাদ পেয়েছেন কি?’ তিনি বললেনঃ ‘হ্যাঁ। আজই তারা শাহাদাত বরণ করেছেন।’ আর সেই মুহূর্তে ছোট্ট ছেলে-মেয়েদের মুখের হাসি বিলীন হয়ে গেল। যখন তারা শুনতে পেল তাদের মা কান্না ও বিলাপ করছে, তারা নিজ নিজ স্থানে পাথরের মত এমন স্থির হয়ে গেল, যেন তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে। প্রতিবেশী মহিলারা এসে আসমার পাশে ভিড় করল। রাসূল (সাঃ) চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেলেন। বাড়ীতে পৌঁছে আযওয়াজে মুতাহহারাতকে বললেনঃ আজ তোমরা জাফরের পরিবারবর্গের প্রতি একটু নজর রেখ। তারা আজ চেতনাহীন।

হযরত জাফরের শাহাদাতের পর দীর্ঘদিন ধরে রাসূল (সাঃ) শোকাভিভূত ও বিমর্ষ ছিলেন। অবশেষে হযরত জিবরাঈল (আ.) তাঁকে সুসংবাদ দান করেন যে, আল্লাহ তাআলা জাফরকে তাঁর দু’টি কর্তিত হাতের পরিবর্তে নতুন দুটি রক্তরাঙা হাত দান করেছেন এবং তিনি জান্নাতে ফিরিশতাদের সাথে উড়ে বেড়াচ্ছেন। এ কারণে তাঁর উপাধি হয়, ‘যুল-জানাহাইনতাইয়ার’- দুডানাওয়ালা ও উড়ন্ত।

ইবন সাদ তাঁর তাবাকাতে বর্ণনা করেনঃ ‘যায়িদ বিন হারিসা, জাফর ইবন আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার শাহাদাতের খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে তাদের পরিচয় তুলে ধরে প্রশংসা করে এক সংক্ষিপ্ত খুতবা দেন এবং দুআ করেনঃ হে আল্লাহ, আপনি যায়িদকে ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ, আপনি যায়িদকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, আপনি জাফর ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে মাফ করে দিন।

ইমাম আহমাদ আবদুল্লাহ ইবন আসলাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জাফরকে বলতেনঃসিরাত ও সুরাত- চরিত্র ও দৈহিক গঠনে তুমি আমার মত।

হযরত জাফর ছিলেন গরীব মিসকীনদের প্রতি অত্যন্ত সদয়। আবু হুরাইরা বলেনঃ ‘‘আমাদের মিসকীন সম্প্রদায়ের জন্য জাফর ইবন আবী তালিব ছিলেন সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি আমাদেরকে সংগে করে তাঁর গৃহে নিয়ে যেতেন, যা কিছু তাঁর কাছে থাকত তা আমাদের খাওয়াতেন। যখন তাঁর খাবার শেষ হয়ে যেত তখন তাঁর ছোট্ট শূন্য ঘি-এর মশকটি বের করে দিতেন। আমরা তা ফেঁড়ে ভেতরে যা কিছু লেগে থাকত চেটেপুটে খেতাম।’ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলতেনঃ আমার আগে যত নবী এসেছেন তাঁদের মাত্র সাতজন বন্ধু দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার বিশেষ বন্ধুর সংখ্যা চৌদ্দ এবং জাফর তার একজন (বুখারী,মানাকিবু জাফর)

বিলাল ইবন রাবাহ (রা.)

বিলাল ইবন রাবাহ (রা.)

আবু আবদুল্লাহ বিলাল তাঁর নাম। পিতা রাবাহ এবং মাতা হামামাহ। হাবশী বংশোদ্ভূত ক্রীতদাস। তবে মক্কায় জন্মলাভ করেছিলেন। বনু জুমাহ ছিল তাদের মনিব।

হাবশী দাস হিসাবে তাঁর বাহ্যিক রং কালো হলেও অন্তর ছিল দারুণ স্বচ্ছ। আরবের গৌরবর্ণের লোকেরা যখন আভিজাত্যের ও কৌলিণ্যের বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়ে হকের দাওয়াত অস্বীকার করে চলেছিল, তখনই তাঁর অন্তর ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। অল্প কিছু লোক দাওয়াতে হক কবুল করলেও যে সাত ব্যক্তি প্রকাশ্য ঘোষণার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে এ হাবশী গোলাম অন্যতম।

চিরকালই দুর্বলরা অত্যাচার উৎপীড়নের শিকার হয়ে থাকে। বিলালের সামাজিক অবস্থানের কারণে তাঁর ওপর অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট নেমে আসে। শাস্তি ও যন্ত্রণার নানা রকম অনুশীলনের মাধ্যমে তাঁর সবর ও ইসতিকলালের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। গলায় উত্তপ্ত বালু, পাথরকুচি ও জ্বলন্ত অংগারের ওপর তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে, গলায় রশি বেঁধে ছাগলের মত শিশুরা মক্কার অলিতে গলিতে টেনে নিয়ে বেড়িয়েছে। তবুও তাওহীদের শক্ত রশি তিনি হাত ছাড়া করেননি। আবু জাহল তাঁকে উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে পিঠের ওপর পাথরের বড় চাক্কি রেখে দিত। মধ্যাহ্ন সূর্যের প্রচণ্ড খরতাপে তিনি যখন অস্থির হয়ে পড়তেন, আবু জাহল বলতোঃ বিলাল, এখনো মুহাম্মাদের আল্লাহ থেকে ফিরে এসো।কিন্তু তখনো তার পবিত্র মুখ থেকে আহাদ’ ‘আহাদধ্বনি বের হতো।

অত্যাচারী মুশরিকদের মধ্যে উমাইয়্যা ইবন খালাফ ছিল সর্বাধিক উৎসাহী। সে শাস্তি ও যন্ত্রণার নিত্য নতুন কলা-কৌশল প্রয়োগ করতো। নানা রকম পদ্ধতিতে সে তাঁকে কষ্ট দিত। কখনো গরুর কাঁচা চামড়ায় তাঁকে ভরে, কখনো লোহার বর্ম পরিয়ে উত্তপ্ত রোদে বসিয়ে দিয়ে বলতোঃ তোমার আল্লাহ লাত ও উযযাহ।কিন্তু তখনো এ তাওহীদ প্রেমিক লোকটির যবান থেকে আহাদ’ ‘আহাদছাড়া আর কোন বাক্য বের হতো না। মুশরিকরা বলতোঃ ‘তুমি আমাদের কথিত শব্দগুলিই উচ্চারণ করো। তিনি বলতেনঃ আমার যবান ঠিক মত তোমাদের শব্দগুলি উচ্চারণ করতে পারে না।

প্রতিদিনের মত সেদিনও হযরত বিলালের ওপর বাতহাউপত্যকায় অত্যাচারের স্টীম রোলার চলছিল। ঘটনাক্রমে হযরত আবু বকর সিদ্দীকও সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দারুণ মর্মাহত হলেন। মোটা অংকের অর্থ বিলালের মনিবকে দিয়ে তিনি তাঁকে আযাদ করে দেন। এ খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ ‘আবু বকর, আমাকেও তুমি এ কাজে শরীক করে নাও।’ তিনি আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি তো তাঁকে আযাদ করেই দিয়েছি।

মক্কা থেকে হিজরাত করে মদীনায় তিনি হযরত সাদ ইবন খুসাইমার (রা.) অতিথি হলেন। হযরত আবু রুওয়াইহা আবদুল্লাহ ইবন আবদুর রহমান খাসয়ামীর (রা.) সাথে তাঁর ভ্রাতৃ-সম্পর্ক স্থাপিত হলো। তাঁদের দুজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ফারুকের সময় হযরত বিলাল সিরিয়া অভিযানে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন। খলীফা উমার (রা.) জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘বিলাল, তোমার ভাতা কে উঠাবে?’ জবাব দিলেনঃ আবু রুওয়াইহা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের দুজনের যে ভ্রাতৃসম্পর্ক কায়েম করে দিয়েছিলেন তা কখনো বিচ্ছিন্ন হতো পারে না।

হিজরাতের আগ পর্যন্ত মক্কায় ইসলাম ছিল দুর্বল, হিজরাতের পর মদীনায় তা সবল  হয়ে দাঁড়ায়। এই মাদানী জীবনের সূচনা থেকে ইসলামী আচার-আচরণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মুল ভিত্তির স্থাপনা শুরু হয়। মসজিদ প্রতিষ্ঠা, পাঁচ ওয়াক্ত নামায এবং নামাযের জন্য আযানের প্রচলন হলো। হযরত বিলাল প্রথম ব্যক্তি, আযানের দায়িত্ব যাঁর ওপর অর্পিত হয়। বিলালের উচ্চ ও হৃদয়গ্রাহী আযান ধ্বনি শুনে নারী পুরুষ, কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কেউ ঘরে স্থির থাকতে পারতো না। মসজিদে তাওহীদের ধারক-বাহকদের ভীড় জমে উঠলে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দরজায় গিয়ে আওয়ায দিতেনঃ হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ, আস-সালাহ ইয়া রাসূলাল্লাহ- হে আল্লাহর রাসূল! নামায উপস্থিত।রাসূল (সাঃ) বেরিয়ে আসতেন, বিলাল তাকবীর দিতেন। কোনদিন হযরত বিলাল মদীনায় উপস্থিত না থাকলে হযরত আবু মাহযুরা এবং হযরত আমর ইবন উম্মে মাকতুম (রা.) তাঁর দায়িত্ব পালন করতেন। বিলাল (রা.) সাধারণতঃ সুবহে সাদিক হওয়ার আগেই ফজরের আযান দিতেন। এ কারণে সকালে দুবার আযান দেওয়া হতো। শেষের আযান দিতেন আমর ইবন উম্মে মাকতুম (রা.)। এ জন্য রমজান মাসে হযরত বিলালের আযানের পর পানাহার জায়েয ছিল।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মদীনায় অবস্থান বা সফরের সময়, উভয় অবস্থায় বিলাল ছিলেন তাঁর বিশেষ মুয়াজ্জিন। একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কোন এক সফরে পথ চলতে চলতে রাত হয়ে গেল। সাহাবাদের কেউ কেউ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, এখানে কোথাও রাত্রি যাপনের জন্য তাঁবু গাড়ার হুকুম দিলে ভালো হতো। রাসূল (সাঃ) বললেনঃ আমার ভয় হচ্ছে ঘুম তোমাদের নামায থেকে উদাসীন করে না দেয়।হযরত বিলাল সকলকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব নিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অনুমতি পেয়ে সবাই তাঁবু গেড়ে বিশ্রামে গা এলিয়ে দিলেন। এদিকে বিলাল (রা.) অধিক সতর্কতার সাথে হাওদার কাঠের সাথে হেলান দিয়ে সুবহে সাদিকের প্রতীক্ষায় থাকলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে এ অবস্থায় তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে এলো এবং গভীর ঘুমে এমন অচেতন হয়ে পড়লেন যে সূর্যোদয়ের আগে আর চেতনা ফিরে এলো না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঘুম থেকে জেগে সর্বপ্রথম বিলালকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘তোমার দায়িত্ব পালনের কি হলো?’ বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আজ আমি এমনভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম যে, এমনটি আমার সাধারণত হয় না।’ রাসূল (সাঃ) বললেনঃ আল্লাহ যখন ইচ্ছা তোমাদের রূহ অধিকার করে নেন, আবার যখন ইচ্ছা তা ফিরিয়ে দেন। উঠে আযান দাও এবং লোকদের নামাযের জন্য সমবেত কর।

হযরত বিলাল (রা.) প্রধান প্রধান সকল যুদ্ধেরই শরীক ছিলেন। বদর যুদ্ধে তিনি ইসলামের এক মস্তবড় দুশমন উমাইয়্যা ইবন খালাফকে হত্যা করেন। মক্কায় যাঁরা বিলালের ওপর নির্যাতন চালাতো, এ উমাইয়া ছিল তাদের অন্যতম। মক্কা বিজয়ের দিনে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সংগী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে তিনিও কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশের সৌভাগ্য লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নির্দেশে কাবার ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি আযান ধ্বনি উচ্চারণ করেন।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর ওফাতের পর হযরত বিলাল (রা.) তাঁর প্রতি সর্বাধিক ইহসানকারী ব্যক্তি হযরত সিদ্দিকে আকবরের (রা.) নিকট আরজ করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা! আপনি কি আমাকে আযাদ করেছেন আল্লাহর ওয়াস্তে না আপনার সংগী বানানোর উদ্দেশ্যে?’ তিনি বললেনঃ আল্লাহর ওয়াস্তে বিলাল বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মুখে শুনেছি, মু’মিনের উত্তম কাজ হচ্ছে আল্লাহর পথে জিহাদ করা। এ কারণে আমি চাই, এই মহান কাজটিকে আমরণ আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে।হযরত আবু বকর (রা.) বললেনঃ বিলাল, ‍তুমি আমার থেকে দূরে চলে গিয়ে বিচ্ছেদ বেদনায় আমাকে কাতর করে তুলো না।হযরত আবু বকরের আবেদনে সাড়া দিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় বিলাল কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।

হযরত আবু বকরের পর খলীফা হযরত উমার। বিলাল তাঁর কাছেও অনুমতি চাইলেন জিহাদে অংশগ্রহণের। প্রথম খলীফার মত দ্বিতীয় খলীফা তাঁকে ঠেকিয়ে রাখতে চাইলেন। কিন্তু তাঁর অত্যধিক উৎসাহ ও অনমনীয় মনোভাব দেখে খলীফা উমার তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তিনি সিরিয়া অভিযানে অংশগ্রহণ করলেন। ১৬ হিজরী সনে হযরত উমারের সিরিয়া সফরকালে অন্যান্য সামরিক অফিসারদের সাথে বিলালও জাবিয়ানামক স্থানে খলীফাকে স্বাগত জানান এবং বাইতুল মুকাদ্দাসসফরে তিনি খলীফার সংগী হন। সফরের এক পর্যায়ে একদিন খলীফা বিলালকে অনুরোধ করলেন আযান দেওয়ার জন্য। বিলাল বললেনঃ যদিও আমি অঙ্গীকার করেছি, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পর আর কারো জন্য আযান দিব না, তবে আজ আপনার ইচ্ছা পূরণ পূরণ করবো।এ কথা বলে তিনি এমন হৃদয়গ্রাহী আওয়াযে আযান দিলেন যে উপস্থিত জনতার মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিল। হযরত উমার এত কাঁদলেন যে তাঁর বাক রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। হযরত আবু উবাইদা ও হযরত মুয়ায বিন জাবাল (রা.) কান্নায় ভেংগে পড়েছিলেন। সবারই মনে তখন নবী-যুগের ছবি ভেসে উঠছিল, অন্তরে তখন এক বিশেষ অনুভূতি জেগে উঠেছিল।

সিরিয়ার সবুজ ও শস্য-শ্যামল ভূমি হযরত বিলালের খুবই মনঃপুত হয়। তিনি দ্বিতীয় খলীফার নিকট তাঁর ইসলামী ভাই আবু রুওয়াইহাসহ তাঁকে সিরিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দানের জন্য আবেদন জানান। তাঁর আবেদন মঞ্জুর হলো। তাঁরা দুজন খাওলাননামক ছোট একটি শহরে বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের পূর্বেই এ শহরে বসতি স্থাপন করেছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু দারদা আনসারীর (রা.) গোত্র। এখানে তাঁরা দুজন এ গোত্রের দুটি মেয়েকে বিয়ে করে তাদের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হন।

দীর্ঘদিন যাবত হযরত বিলাল (রা.) সিরিয়ায় বসবাস করতে থাকেন। একদিন স্বপ্নে দেখলেন, রাসূল (সাঃ) বলছেনঃ বিলাল, এমন নিরস জীবন আর কতকাল? আমার যিয়ারতের সময় কি তোমার এখনো হয়নি?’ এ স্বপ্ন তাঁর প্রেম ও ভালোবাসার ক্ষত আবার তাজা করে দিল। তখুনি তিনি মদীনা রওয়ানা হলেন এবং পবিত্র রওজা মুবারকে হাজির হয়ে জবাই করা মোরগের মত ছটফট করতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কলিজার টুকরা হযরত হাসান ও হুসাইনকে (রা.) জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকেন। তাঁরা দুজন সে দিন সকালে ফজরের আযান দেওয়ার জন্য হযরত বিলালকে (রা.) অনুরোধ করেন। তাঁদের অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারেননি। সুবহে সাদিকের সময় মসজিদে নববীর ছাদে দাঁড়িয়ে তিনি আল্লাহু আকবরবলছিলেন, আর সে ধ্বনি মদীনার অলিতে গলিতে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরছিল। তাঁর সে আযান ধ্বনি শুনে মদীনার জনগণ তাকবীর ধ্বনি দিয়ে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলছিল।

তিনি যখন আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলাল্লাহবললেন, তখন মদীনার নারী-পুরুষ সকলের অস্থিরভাবে কাঁদতে কাদতে ঘর থেকে বেরিয়ে মসজিদের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। বর্ণিত আছে, এমন ভাব-বিহ্বল দৃশ্য মদীনায় আর কখনো দেখা যায়নি।

এ নিষ্ঠাবান রাসূলপ্রেমিক হিজরী ২০ সনে প্রায় ষাট বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। দিমাশকের বাবুস সাগীরেরকাছেই তাঁকে দাফন করা হয়।

চারিত্রিক সৌন্দর্য হযরত বিলালের (রা.) মর্যাদা ও সম্মানকে অত্যধিক বাড়িয়ে দিয়েছিল। হযরত উমার বলতেনঃ আবু বকর আমাদের নেতা এবং তিনি আমাদের নেতা বিলালকে আযাদ করেছেন।

হযরত রাসূলে পাকের সাহচর্য ও সেবাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। সব সময় রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর আশেপাশে উপস্থিত থাকতেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সফর সংগী হতেন। ঈদ ও ইসতিসকার নামাযের সময় বল্লম হাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আগে আগে ময়দানে যেতেন। ওয়াজ নসীহতের মজলিসেও উপস্থিত থাকতেন। শত প্রয়োজন ও দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও হাতে কিছু এলেই তার একাংশ রাসূল (সাঃ)-কে উপঢৌকন পাঠাতেন। একবার উৎকৃষ্ট মানের কিছু খেজুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে নিয়ে আসেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ বিলাল, এগুলি কোথায় পেলে?’ জবাব দিলেনঃ ‘আমার কাছে কিছু নিম্নমানের খেজুর ছিল। যেহেতু আপনার খিদমতে কিছু পাঠানোর ইচ্ছা ছিল, এ জন্যই দুসায়ের বিনিময়ে এর এক সাখেজুর লাভ করেছি।’ রাসূল (সাঃ) বললেনঃ হায়, হায়, এমন করোনা। এ তো এক ধরণের সুদ। যদি তোমাকে খরীদ করতেই হতো, তাহলে প্রথমে তোমার খেজুরগুলি বিক্রি করে দিতে এবং সেই অর্থ দিয়ে এগুলি খরীদ করতে।’

মক্কায় যে অত্যাচার ও উৎপীড়ন হযরত বিলাল সহ্য করেছিলেন, তা দ্বারাই তাঁর সহ্যশক্তি, ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। কেউ তাঁর কোন গুণের কথা বললে বলতেনঃ আমি তো শুধু একজন হাবশী, কাল পর্যন্তও যে দাস ছিল।সততা, নিষ্কলুষতা ও বিশ্বস্ততা ছিলো তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

হযরত বিলাল যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বিশেষ মুয়াযযিন ছিলেন এ কারণে অধিকাংশ সময় মসজিদেই কাটাতে হতো। রাত দিনের বেশী সময় ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। একবার রাসূল (সাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘তোমার কোন ভালো কাজটির জন্য সবচেয়ে বেশী সাওয়াবের আশা করো?’ বললেনঃ আমি তো এমন কোন ভালো কাজ করিনি। তবে প্রত্যেক অজুর পরে নামায আদায় করেছি।

সম্ভ্রান্ত আরব পরিবারে তিনি একাধিক বিয়ে করেছিলেন। হযরত আবু বকরের কন্যার সাথে রাসূল (সাঃ) নিজে বিয়ে দিয়েছিলেন। বনু যুহরা ও আবু দারদার পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু কোন পক্ষেই তাঁর কোন সন্তান জন্ম লাভ করেনি।

সহীহ ইবন খুযাইমা গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, একদিন রাসূল (সাঃ) বিলালকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘বিলাল, কিসের বদৌলতে তুমি আমার আগেই জান্নাতে পৌঁছে গেলে? গতরাতে আমি জান্নাতে প্রবেশ করে তোমার খশ্‌খশাআওয়ায শুনতে পেলাম।বিলাল বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কোন গুনাহ করলেই দুরাকাত নামায আদায় করি। আর অজু চলে গেলে তখনি আবার অজু করে আমি দুরাকাত নামায আদায় করে থাকি।