29.11.14

যুবাইর ইবন আওয়াম (রা.)

যুবাইর ইবন আওয়াম (রা.)

নাম যুবাইর, কুনিয়াত আবু আবদিল্লাহ এবং লকব হাওয়ারিয়্যূ রাসূলিল্লাহ। পিতার নাম আওয়ামএবং মাতা সাফিয়্যা বিনত আবদিল মুত্তালিব। মা হযরত সাফিয়্যা ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ফুফু। সুতরাং যুবাইর ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ফুফাতো ভাই। উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদিজাতুল কুবরা ছিলেন তাঁর ফুফু। অন্যদিকে হযরত সিদ্দিকে আকবরের কন্যা হযরত আসমাকে বিয়ে করায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন তাঁর ভায়রা। হযরত আসমা (রা.) ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশার (রা.) বোন। এভাবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সংগে ছিল তাঁর একাধিক আত্মীয়তার সম্পর্ক।

হযরত যুবাইর (রা.) হিজরাতের আটাশ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবকালীন জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে এটা নিশ্চিত যে প্রথম থেকেই তাঁর মা তাঁকে এমনভাবে প্রতিপালন করেছিলেন, যাতে বড় হয়ে তিনি একজন দুঃসাহসী, দৃঢ়-সংকল্প ও আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ হন। এ কারণে প্রায়ই তার মা তাঁকে মারধর করতেন এবং কঠোর অভ্যাসে অভ্যস্ত করতেন। একদিন তাঁর চাচা নাওফিল বিন খুওয়াইলিদ তাঁর মা হযরত সাফিয়্যার ওপর ভীষণভাবে ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘এভাবে মারতে মারতে ছেলেটাকে তুমি মেরেই ফেলবে।তাছাড়া বনু হাশিমের লোকদের ডেকে বলেন, ‘তোমরা সাফিয়্যাকে বুঝাওনা কেন?’ জবাবে সাফিয়্যা বলেন, ‘যারা বলে আমি তাকে দেখতে পারি না, তারা মিথ্যা বলে। আমি তাকে এজন্য মারধর করি যাতে সে বুদ্ধিমান হয় এবং পরবর্তী জীবনে শত্রুসৈন্য পরাজিত করে গণীমাতের মাল লাভে সক্ষম হয়।’

এমন প্রতিপালনের প্রভাব অবশ্যই তাঁর ওপর পড়েছিলো। অল্প বয়স থেকেই তিনি বড় বড় পালোয়ান ও শক্তিশালী লোকেদের সাথে কুস্তি লড়তেন। একবার মক্কায় একজন তাগড়া জোয়ানের সাথে তাঁর ধরাধরি হয়ে গেল। তাকে এমন মারই না মারলেন যে, লোকটির হাত ভেঙ্গে গেল। লোকেরা তাঁকে ধরে হযরত সাফিয়্যার নিকট নিয়ে এসে অভিযোগ করলো। তিনি পুত্রের কাজে অনুতপ্ত হওয়া বা ক্ষমা প্রার্থনার পরিবর্তে সর্বপ্রথম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা যুবাইরকে কেমন দেখলে সাহসী না ভীরু?’

যুবাইর (রা.) মাত্র ষোল বছর বয়সেই ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অনন্য ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।

যদিও তাঁর বয়স ছিল কম তবুও দৃঢ়তা ও জীবনকে বাজি রাখার ক্ষেত্রে কারো থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর একবার কেউ রটিয়ে দিয়েছিলো, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বন্দী অথবা হত্যা করে ফেলেছে। একথা শুনে তিনি আবেগ ও উত্তেজনায় এতই আত্মভোলা হয়ে পড়েছিলেন যে, তক্ষুণি একটানে তরবারি কোষমুক্ত করে মানুষের ভিড় ঠেলে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দরবারে গিয়ে হাজির হন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে যুবাইর?’ তিনি বললেন, ‘শুনেছিলাম, আপনি বন্দী অথবা নিহত হয়েছেন।রাসূলে কারীম (সাঃ) অত্যন্ত খুশী হয়ে তাঁর জন্যে দু’আ করেন। সীরাত লেখকদের বর্ণনা, এটাই হচ্ছে প্রথম তলোয়ার যা আত্মোৎসর্গের উদ্দেশ্যে একজন বালক উন্মুক্ত করেছিলো।

প্রাথমিক পর্যায়ে মক্কার অন্যান্য মুসলমানদের মত তিনিও অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হন। তাঁর চাচা তাঁকে ইসলাম থেকে ফিরানোর জন্যে চেষ্টার ত্রুটি করেননি। কিন্তু তাওহীদের ছাপ যার অন্তরে একবার লেগে যায় তা কি আর মুছে ফেলা যায়? ক্ষেপে গিয়ে চাচা আরো কঠোরতা শুরু করে দেন। উত্তপ্ত পাথরের উপর চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে এমন মারই না মারতেন যে তাঁর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যেত। তবুও তিনি বলতেন, ‘যত কিছুই করুন না কেন আমি আবার কাফির হতে পারিনা।অবশেষে নিরুপায় হয়ে জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে হাবশায় হিজরাত করেন। হাবশায় কিছুকাল অবস্থানের পর মক্কায় ফিরে এলেন। এদিকে রাসূল (সাঃ)-ও মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করলেন। তিনিও মদীনায় গেলেন।

রাসূল (সাঃ) মক্কায় তালহা ও যুবাইরের মধ্যে ইসলামী ভ্রাতৃ-সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু মদীনায় আসার পর নতুন করে হযরত সালামা ইবন সালামা আনসারীর সাথে তাঁর ভ্রাতৃসম্পর্ক স্থাপিত হয়। সালামা ছিলেন মদীনার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব এবং আকাবায় বাইয়াত গ্রহণকারীদের অন্যতম।

যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি বদর যুদ্ধে অত্যন্ত সাহস ও নিপুণতার পরিচয় দেন। মুশরিকদের প্রতিরোধ ব্যুহ ভেঙ্গে তছনছ করে দেন। একজন মুশরিক সৈনিক একটি টিলার ওপর উঠে। দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানালে যুবাইর তাকে মুহূর্তের মধ্যে এমনভাবে জাপটে ধরেন যে, দুজনেই গড়িয়ে নীচের দিকে আসতে থাকেন। তা দেখে রাসূল (সাঃ) বলেনঃএদের মধ্যে যে প্রথম ভূমিতে পড়বে, সে নিহত হবে।সত্যি তাই হয়েছিলো। মুশরিকটি প্রথম মাটিতে পড়ে এবং যুবাইর (রা.) তরবারির এক আঘাতে তাকে হত্যা করেন। এমনিভাবে তিনি উবাইদা ইবন সাঈদের মুখোমুখি হলেন। সে ছিল আপাদমস্তক এমনভাবে বর্মাচ্ছাদিত যে কেবল দুটি চোখই তার দেখা যাচ্ছিলো। তিনি খুব তাক করে তার চোখ লক্ষ্য করে তীর ছুড়লেন। নিশানা নির্ভুল হলো। তীরের ফলা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল। অতি কষ্টে তিনি তার লাশের উপর বসে ফলাটি বের করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে তা কিছুটা বেঁকে গিয়েছিলো। স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে রাসূল (সাঃ) এ তীরটি নিজেই নিয়ে নেন এবং তাঁর ইনতিকালের পর তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান পর্যন্ত এ তীরটি বিভিন্ন খলীফার নিকট রক্ষিত ছিল। হযরত উসমানের শাহাদাতের পর হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর তীরটি গ্রহণ করেন এবং তাঁর শাহাদাত পর্যন্ত এটি তাঁর নিকট ছিল।

বদরে তিনি এত সাংঘাতিকভাবে লড়েছিলেন যে তাঁর তরবারি ভোঁতা হয়ে গিয়েছিলো এবং আঘাতে আঘাতে তাঁর সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো। এ দিনের একটি ক্ষত এত গভীর ছিল যে চিরদিনের জন্য তা একটি গর্তের মত হয়ে গিয়েছিলো। তাঁর পুত্র হযরত উরওয়া বলেন, ‘আমরা সেই গর্তে আংগুল ঢুকিয়ে খেলা করতাম।এ যুদ্ধে তিনি হলুদ রঙের পাগড়ী পরিহিত ছিলেন। তা দেখে রাসূল (সাঃ) বলেনঃআজ  ফিরিশতাগণও এ বেশে এসেছে।

উহুদের ময়দানে সত্য ও মিথ্যার লড়াই যখন চরম পর্যায়ে, তখন রাসূল (সাঃ) স্বীয় তরবারি কোষমুক্ত করে বললেনঃআজ কে এর হক আদায় করবে?’ সকল সাহাবীই অত্যন্ত আগ্রহের সাথে নিজ নিজ হাত বাড়ালেন। যুবাইরও (রা.) তিনবার নিজের হাত বাড়ালেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা লাভের গৌরব অর্জন করেন হযরত আবু দুজানা আনসারী (রা.)। উহুদের যুদ্ধে তীরন্দাজ সৈনিকদের অসতর্কতার ফলে যখন যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল এবং মুসলিমদের সুনিশ্চিত বিজয় পরাজয়ের রূপ নিল তখন যে চৌদ্দজন সাহাবী নিজেদের জীবনের বিনিময়ে রাসূলে পাককে কেন্দ্র করে প্রতিরোধ ব্যুহ রচনা করেন যুবাইর (রা.) ছিলেন তাঁদের অন্যতম।

খন্দকের যুদ্ধে মুসলিম নারীরা যেদিকে অবস্থান করছিলেন, সে দিকটির প্রতিরক্ষার দায়িত্বভার লাভ করেন যুবাইর (রা.)। এ যুদ্ধের সময় মদীনার ইয়াহুদী গোত্র বনু কুরাইজা মুসলিমদের সাথে সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তি ভঙ্গ করে। রাসূল (সাঃ) তাদের অবস্থা জানার জন্যে কাউকে তাদের কাছে পাঠাতে চাইলেন। তিনবার তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃতোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে তাদের সংবাদ নিয়ে আসতে পার?’ প্রত্যেকবারই হযরত যুবাইর বলেনঃআমি। রাসূল (সাঃ) তাঁর আগ্রহে সন্তুষ্ট হয়ে বলেনঃপ্রত্যেক নবীরই থাকে হাওয়ারী। আমার হাওয়ারী যুবাইর।

খন্দকের পর বনু কুরাইজার যুদ্ধ এবং বাইয়াতে রিদওয়ানেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। খাইবারের যুদ্ধে তিনি অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দেন। খাইবারের ইয়াহুদী নেতা মুরাহহিব নিহত হলে বিশাল দেহ ও বিপুল শক্তির অধিকারী তার ভাই ইয়াসির ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে হুঙ্কার ছেড়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানায়। হযরত যুবাইর (রা.) লাফিয়ে পড়লেন। তখন তাঁর মা হযরত সাফিয়্যা বললেনঃইয়া রাসূলাল্লাহ, নিশ্চয় আজ আমার কলিজার টুকরা শহীদ হবে।রাসূল (সাঃ) বললেনঃনা। যুবাইরই তাকে হত্যা করবে।সত্যি সত্যি অল্পক্ষণের মধ্যে যুবাইর তাকে হত্যা করেন।

খাইবার বিজয়ের পর মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি চলছে। মানবীয় কিছু দুর্বলতার কারণে প্রখ্যাত সাহাবী হাতিব বিন আবী বালতা'আ (রা.) সব খবর জানিয়ে মক্কার কুরাইশদের নিকট একটি চিঠি লিখলেন। চিঠিসহ গোপনে একজন মহিলাকে তিনি মক্কায় পাঠান। এদিকে ওহীর মাধ্যমে সব খবর রাসূল ‍(সাঃ) অবগত হলেন। তিনি চিঠিসহ মহিলাটিকে গ্রেফতারের জন্যে যে দলটি পাঠান, হযরত যুবাইরও ছিলেন সে দলের একজন। চিঠিসহ মহিলাকে গ্রেফতার করে মদীনায় নিয়ে আসা হলো। হাতিব বিন বালতা'আ লজ্জিত হয়ে তাওবাহ করেন। রাসূল (সাঃ)-ও তাঁকে ক্ষমা করেন।

মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সাঃ) মুসলিম সেনাবাহিনীকে কয়েকটি দলে বিভক্ত করেন। সর্বশেষ ও ক্ষুদ্রতম দলটিতে ছিলেন রাসূল (সাঃ) নিজে। আর এ দলটির পতাকাবাহী ছিলেন যুবাইর (রা.)। রাসূল (সাঃ) মক্কায় প্রবেশ করলেন। চারদিকে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে এলে হযরত মিকদাদ ও হযরত যুবাইর (রা.) নিজ নিজ ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে রাসূলে পাকের নিকট উপস্থিত হলেন। রাসূল (সাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে তাঁদের উভয়ের মুখমণ্ডলের ধুলোবালি ঝেড়ে দেন।

হুনাইন যুদ্ধের সময় হযরত যুবাইর কাফিরদের একটি গোপন ঘাঁটির নিকটে পৌঁছলে তারা তাঁকে অতর্কিত আক্রমণ করে। অত্যন্ত সাহসের সাথে অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ঘাঁটিটি সাফ করে ফেলেন। তায়িফ ও তাবুকের যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করে। দশম হিজরীতে বিদায় হজ্জেও তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সফরসঙ্গী ছিলেন।

দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা.) খিলাফতকালে সিরিয়ার ইয়ারমুক প্রান্তরে বিশাল রোমান বাহিনীর সাথে মুসলিম বাহিনীর ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটা ছিল সিরিয়ার ভাগ্য নির্ধারণী যুদ্ধ। হযরত যুবাইর এ যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের এক চরম পর্যায়ে মুসলিম সৈনিকদের এক দল সিদ্ধান্ত নিল, হযরত যুবাইর রোমান বাহিনীর মধ্যভাগে প্রচণ্ড আক্রমণ চালাবেন এবং অন্যরা তাঁর সমর্থনে পাশে পাশে থাকবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত যুবাইর (রা.) ক্ষিপ্রতার সাথে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ চালিয়ে রোমান বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে অপর প্রান্তে চলে যান কিন্তু অন্যরা তাঁকে অনুসরণ করতে সক্ষম হলেন না। একাকী আবার রোমান বাহিনী ভেদ করে ফিরে আসার সময় প্রচণ্ডভাবে আক্রান্ত হয়ে ঘাড়ে দারুণভাবে আঘাত পান। হযরত উরওয়া বলেন, বদরের পর এটা ছিল দ্বিতীয় যখম যার মধ্যে আংগুল ঢুকিয়ে ছেলে বেলায় আমরা খেলতাম। তাঁর এ দুঃসাহসী আক্রমণের ফলে রোমান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

হযরত আমর ইবনুল আস মিসরে আক্রমণ চালিয়ে ফুসতাতের কিল্লা অবরোধ করে রেখেছেন। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার তাঁর সাহায্যে দশ হাজার সিপাহী ও চার হাজার অফিসার পাঠালেন। আর চিঠিতে লিখলেন, এসব অফিসারের এক একজন এক হাজার অশ্বারোহীর সমান। হযরত যুবাইর ছিলেন এ চার হাজার অফিসারের একজন। মুসলিম সৈন্যরা সাত মাস ধরে কিল্লা অবরোধ করে আছে। জয়-পরাজয়ের কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে হযরত যুবাইর একদিন বললেনঃআজ আমি মুসলিমদের জন্য আমার জীবন কুরবান করবো।এ কথা বলে উন্মুক্ত তরবারি হাতে সিঁড়ি লাগিয়ে কিল্লা প্রাচীরের মাথার ওপর উঠে পড়লেন। আরো কিছু সাহাবীও তাঁর সঙ্গী হলেন। প্রাচীরের ওপর থেকে অকস্মাৎ তাঁরা আল্লাহু আকবারধ্বনি দিতে শুরু করেন। এ দিকে নিচ থেকে সকল মুসলিম সৈনিক এক যোগে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলেন। খৃষ্টান সৈন্যরা মনে করলো, মুসলিমগণ কিল্লায় ঢুকে পড়েছে। তারা ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়লো। এক পর্যায়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে হযরত যুবাইর কিল্লার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ফটক উন্মুক্ত করে দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বাহিনী অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। উপায়ন্তর না দেখে মিসরের শাসক মাকুকাস সন্ধির প্রস্তাব দেয় এবং তা গৃহীত হয়। সকলকে আমান দেওয়া হয়।

হিজরী ২৩ সনে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার (রা.) এক অগ্নি উপাসকের ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ছয়জন প্রখ্যাত সাহাবীর সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠন করে তাদের ওপর পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পণ করে যান। তিনি বলেনঃজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাসূল (সাঃ) এদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন।হযরত যুবাইর ছিলেন এ বোর্ডের অন্যতম সদস্য।

তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানের খিলাফতকালে হযরত যুবাইর (রা.) নিরিবিলি জীবন যাপন করছিলেন। কোন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। আসলে বয়সও বেড়ে গিয়েছিলো। ৩৫ হিজরীতে বিদ্রোহীদের দ্বারা হযরত উসমান অবরুদ্ধ হলে তাঁর নিরাপত্তার জন্য হযরত যুবাইর স্বীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহকে নিয়োগ করেন। হযরত উসমান শহীদ হলে রাতের অন্ধকারে গোপনে তিনি তাঁর জানাযার নামায আদায় করে দাফন করেন।

হযরত আলীর (রা.) শাসনকালে তিনি এবং হযরত তালহা মক্কায় যেয়ে হযরত আয়িশার (রা.) সাথে মিলিত হন। সেখানে তাঁরা ‍মুসলিম উম্মাহর তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেন এবং মদীনায় না গিয়ে বসরার দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিপুল সংখ্যক লোক তাঁদের সহযোগী হয়। এদিকে হযরত আলী (রা.) তাঁদেরকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীসহ অগ্রসর হন এবং হিজরী ৩৬ সনের ১০ই জমাদিউল উখরা বসরার অনতিদূরে যীকারনামক স্থানে দুই মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি হয। ইতিহাসে এটি উটের যুদ্ধ নামে পরিচিতি।

ইসলামী ইতিহাসের এ দুঃখজনক অধ্যায়ের বিশ্লেষণ আমাদের এ প্রবন্ধের মুখ্য বিষয় নয়। তবে একদিন যাঁরা ছিলেন ভাই ভাই, আজ তাঁরা একে অপরের খুনের পিপাসায় কাতর। ব্যাপারটি যাই হোক না কেন, এটা যে তাঁদের ব্যক্তিগত ঝগড়া ও আক্রোশের কারণে নয়, তা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। সত্য ও সততার আবেগ-উৎসাহ ও উদ্দীপনায় তাঁরা এমনটি করেছিলেন। এ কারণে আমরা দেখতে পাই, একই গোত্রের লোক তখন দুদিকে বিভক্ত। তাছাড়া দুপক্ষের নেতৃবৃন্দের মূল লক্ষ্যই ছিল একটা সমঝোতায় উপনীত হওয়া। আর এ কারণেই দুপক্ষের মধ্যে দূত বিনিময়ের মাধ্যমে আলাপ-আলোচনা হয়েছিলো। আর একই কারণে আমরা দেখতে পাই, হযরত আলী একাকী ঘোড়ায় চড়ে রণাঙ্গণের মাঝখানে এসে হযরত যুবাইরকে ডেকে বলছেনঃআবু আবদুল্লাহ! তোমার কি সে দিনটির কথা মনে আছে, যে দিন আমরা দুজন হাত ধরাধরি করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। রাসূল (সাঃ) তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ ‘তুমি কি আলীকে মুহাব্বত কর?’ বলেছিলেঃ ‘হ্যাঁ ইয়া রাসূলাল্লাহ!’ স্মরণ কর, তখন রাসূল (সাঃ) বলেছিলেনঃ একদিন তুমি অন্যায়ভাবে তার সাথে লড়বে।হযরত যুবাইর জবাব দিলেনঃহ্যাঁ এখন আমার স্মরণ হচ্ছে।

একটি মাত্র কথা। কথাটি বলে হযরত আলী (রা.) তাঁবুতে ফিরে গেলেন। এ দিকে যুবাইরের অন্তরে ঘটে গেল এক বিপ্লব। তাঁর সকল সংকল্প ও দৃঢ়তা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশার (রা.) কাছে এসে বললেনঃ আমি সম্পূর্ণ ভুলের ওপর ছিলাম। আলী আমাকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর একটি বাণী স্মরণ করে দিয়েছে। আয়িশা (রা.) জিজ্ঞেস করলেনঃতাহলে এখন ইচ্ছা কি?’ তিনি বললেনঃ আমি এ ঝগড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।পুত্র আবদুল্লাহ বললেনঃআব্বা আপনি আমাদেরকে গর্তে ফেলে আলীর ভয়ে এখন পালিয়ে যাচ্ছেন?’ তিনি বললেনঃআমি কসম করেছি, আলীর সাথে আর লড়বো না।আবদুল্লাহ বললেনঃকসমের কাফফারা সম্ভব।এই বলে তিনি স্বীয় গোলাম মাকহুলকে ডেকে আযাদ করে দেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাওয়ারী যুবাইর বললেনঃ বেটা, আলী আমাকে এমন কথা স্মরণ করে দিয়েছে যাতে আমার সকল উদ্যম-উৎসাহ স্তিমিত হয়ে পড়েছে। আমি সুনিশ্চিত যে, আমরা হকের ওপর নেই। এসো তুমিও আমার অনুগামী হও।হযরত আবদুল্লাহ অস্বীকার করলেন। হযরত যুবাইর একাকী বসরার দিকে রওয়ানা হলেন।

হযরত যুবাইরকে যেতে দেখে আহনাফ বিন কায়েস বললেনঃ কেউ জেনে এসো তো তিনি যাচ্ছেন কেন?’ আমর ইবন জারমুয বললো, ‘আমি যাচ্ছি।এই বলে সে অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে হযরত যুবাইরের সঙ্গে মিলিত হলো। তখন তিনি বসরা ছেড়ে একটু দূরে গিয়ে পৌঁছেছেন। কাছে এসে ইবনে জারমুয বললেনঃ

- আবু আবদুল্লাহ। জাতিকে আপনি কি অবস্থায় ছেড়ে এলেন?
- তারা সবাই একে অপরের গলা কাটছে।
- এখন কোথায় যাচ্ছেন?
- আমার ভুল আমি বুঝতে পেরেছি। এ কারণে এ ঝগড়া থেকে দূরে থাকার জন্যে অন্য কোথাও যেতে চাই।

ইবন জারমুয বললোঃ চলুন, আমাকেও এ দিকে কিছুদূর যেতে হবে।দুজন এক সংগে চললেন। জুহরের নামাযের সময় হযরত যুবাইর থামলেন। ইবনে জারমুয বললো, ‘আমিও আপনার সাথে নামায আদায় করবো। দুজন নামাযে দাঁড়ালেন। হযরত যুবাইর যেই তাঁর মাবুদের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়েছে, বিশ্বাসগত ইবন জারমুয অমনি তরবারির এক আঘাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাওয়ারীর দেহ থেকে তাঁর শির বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

ইবন জারমুয হযরত যুবাইরের তরবারি, বর্ম ইত্যাদিসহ হযরত আলীর (রা.) নিকট উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত গর্বের সাথে তার কৃতিত্বের বর্ণনা দিল। আলী (রা.) তলোয়ার খানির প্রতি অনুশোচনার দৃষ্টিতে এক নজর তাকিয়ে বললেনঃতিনি অসংখ্যবার রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সম্মুখ থেকে মুসিবতের মেঘমালা অপসারণ করেছেন। ওরে ইবন সাফিয়্যার হন্তা, শুনে রাখ, জাহান্নাম তোর জন্যে প্রতীক্ষা করছে।এভাবে হযরত যুবাইর (রা.) হিজরী ৩৬ সনে শাহাদাত বরণ করেন এবং আস-সিবাউপত্যকায় সমাহিত হন। তিনি ৬৪ বছর জীবন লাভ করেছিলেন।

হযরত যুবাইর ছিলেন অত্যন্ত মহৎ চরিত্রের অধিকারী। তাকওয়া, সত্য-প্রীতি, দানশীলতা, উদারতা ও বেপরোয়াভাব ছিল তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। শিশুদের মত তাঁর অন্তর ছিল কোমল। সামান্য ব্যাপারেই তিনি মোমের মত বিগলিত হয়ে যেতেন। যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলোঃ

তুমি তো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল। অতঃপর কিয়ামত দিবসে তোমরা পরস্পর তোমাদের প্রতিপালকের সম্মুখে বাক-বিতণ্ডা করবে। (যুমার/৩১) তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃইয়া রাসূলাল্লাহ! কিয়ামতের দিন আমাদের এ ঝগড়ার কি পুনরাবৃত্তি হবে?’ রাসূল (সাঃ) বললেনঃহ্যাঁ। অণু-পরমাণুর হিসাব করে প্রত্যেক হকদারকে তার হক দেওয়া হবে।এ কথা শুনে তার অন্তর কেঁপে ওঠে। তিনি বলে উঠলেনঃআল্লাহু আকবর। কেমন কঠিন ব্যবস্থা হবে।

একবার তাঁর দাস ইবরাহীমের দাদী উম্মু আতার কাছে গিয়ে তিনি দেখলেন, আইয়্যামে তাশরীকের পরেও তাদের নিকট কুরবানীর গোশত অবশিষ্ট রয়েছে। তিনি বললেনঃউম্মু আতা! রাসূল (সাঃ) মুসলমানদেরকে তিনদিনের বেশী কুরবানীর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।উম্মু আতা বললেনঃ আমি কি করবো। লোকেরা এত হাদীয়া পাঠায় যে তা শেষই হয়না।’ (মুসনাদে ইমাম আহমাদ /১৬৬)

হযরত ‍যুবাইর যদিও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাওয়ারী ও সার্বক্ষণিক সহচর ছিলেন, তবুও আল্লাহ-ভীতি ও সতর্কতার কারণে খুব কমই হাদীস বর্ণনা করতেন। একদিন পুত্র আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেনঃআব্বা, অন্যদের মত আপনি বেশী বেশী হাদীস বর্ণনা করেন না- এর কারণ কি?’ তিনি বললেনঃবেটা, অন্যদের থেকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাহচর্য ও বন্ধুত্ব আমার কোন অংশে কম ছিল না। যেদিন ইসলাম গ্রহণ করেছি, সেদিন থেকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাহচর্য হতে বিচ্ছিন্ন হইনি কিন্তু তাঁর এ সতর্কবাণীটি আমাকে দারুণভাবে সতর্ক করেছে- যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে তার আবাসস্থল নির্ধারণ করে নেয়।’

ইসলামী সাম্যের প্রতি তিনি এতবেশী সতর্ক ছিলেন যে, দুজন মুসলিম মৃতের মধ্যেও একজনকে সামান্য প্রাধান্য দান তিনি বৈধ মনে করেননি। উহুদের যুদ্ধে তাঁর মামা হযরত হামযা (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর মা হযরত সাফিয়্যা (রা.) ভাইয়ের কাফনের জন্যে দুপ্রস্থ কাপড় নিয়ে আসেন। কিন্তু মামার পাশেই একজন আনসারী ব্যক্তির লাশ ছিলো। একটি লাশের জন্যে দুটি কাপড় হবে আর অন্যটি থাকবে কাফনহীন-ব্যাপারটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। উভয়ের মধ্যে ভাগ করার জন্যে কাপড় দুটিকে মাপলেন। ঘটনাক্রমে কাপড় দুখানা ছিল ছোট-বড়। যাতে কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব না হয়, সে জন্য লটারীর মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করেন।

হযরত যুবাইর যে কোন ধরণের বিপদ-আপদকে তুচ্ছ জ্ঞান করতেন। মৃত্যু-ভয় তাঁর দৃঢ় সংকল্পে কোনদিন বিন্দুমাত্র ফাটল ধরাতে পারেনি। ইসকান্দারিয়া অবরোধের সময় তিনি সিঁড়ি লাগিয়ে কিল্লার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে চাইলেন। সঙ্গীরা বললেনঃভেতরে মারাত্মক প্লেগ।জবাবে বললেনঃআমরা তো যখম ও প্লেগের জন্যেই এসেছি। সুতরাং মৃত্যুভয় কেন?’ সেদিন তিনি ভীষণ সাহসিকতার সঙ্গে সিঁড়ি লাগিয়ে কিল্লায় প্রবেশ করেছিলেন।

হযরত যুবাইরের সততা, আমানতদারী, পরিচালনা ক্ষমতা ও সংগঠন যোগ্যতা ছিল অসাধারণ। মৃত্যুকালে লোকেরা তাঁকে আপন আপন সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদের মুহাফিজ বানাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করতো। মুতী ইবনুল আসওয়াদ তাঁকে অসী বানাতে চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। তখন তিনি কাতর কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আমি আপনাকে আল্লাহ, রাসূল ও নিকট- আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে বলছি। আমি ফারুকে আজম উমারকে বলতে শুনেছি, যুবাইর দ্বীনের একটি রুকন বা স্তম্ভ। হযরত উসমান, মিকদাদ, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, আবদুর রহমান ইবন আউফ প্রমুখ সাহাবী মৃত্যুকালে তাঁকে অসী নিযুক্ত করেছিলেন। অত্যন্ত সততার সাথে তিনি তাঁদের ধন-সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করে তাঁদের সন্তান ও পরিবার-পরিজনদের জন্য ব্যয় করেন।

হযরত যুবাইর স্ত্রী ও ছেলে-সন্তানদের গভীরভাবে ভালোবাসতেন। বিশেষতঃ পুত্র আবদুল্লাহ ও তাঁর সন্তানদেরকে অতিমাত্রায় স্নেহ করতেন। মৃত্যুর পূর্বে সন্তানদের তালীম ও তারবিয়্যাতের ব্যাপারে তিনি ছিলেন দারুণ সচেতন। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি পুত্র আবদুল্লাহকে সংগে নিয়ে যান। তখন তার বয়স মাত্র দশ বছর। হযরত যুবাইর তাকে একটি ঘোড়ার ওপর বসিয়ে একজন সিপাহীর তত্ত্বাবধানে দিয়ে দেন, যাতে সে যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্যগুলি দেখিয়ে তাকে বীরত্ব ও সাহসিকতার শিক্ষা দেয়।

বদান্যতা, দানশীলতা ও আল্লাহর রাস্তায় খরচের ব্যাপারে তিনি অন্য কারো থেকে কখনো পিছিয়ে থাকেননি। তাঁর এক হাজার দাস ছিল। প্রতিদিন তিনি তাদের ভাড়া খাটিয়ে মোটা অংকের অর্থ লাভ করতেন। কিন্তু তার একটি পয়সাও নিজের বা পরিবারবর্গের জন্য ব্যয় করা সমীচীন মনে করতেন না। সবই বিলিয়ে দিতেন। মোটকথা, নবীর একজন হাওয়ারীর মধ্যে যত রকমের গুণ থাকা সম্ভব, সবই হযরত যুবাইরের মধ্যে ছিল।

ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল হযরত যুবাইরের প্রধান পেশা। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, যে ব্যবসায়ে তিনি হাত দিয়েছেন, কখনো তাতে লোকসান হয়নি।

আল্লাহর রাহে সংগ্রামে দুশমনদের তীর-বর্শার অসংখ্য আঘাত তিনি খেয়েছেন। আলী ইবন খালিদ বলেন, আমাদের কাছে মুসেল থেকে একটি লোক এসেছিলো। সে বর্ণনা করলোঃ আমি যুবাইর ইবনুল আওয়ামের একজন সফর-সঙ্গী ছিলাম। সফরের এক পর্যায়ে আমি তাঁর দেহের এমন সব ক্ষতিচিহ্ন দেখতে পেলাম যা অন্য কারো দেহে আর কখনো দেখিনি। জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ ‘এ সবই ঘটেছে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সঙ্গে ও আল্লাহর রাহে।

আলী ইবন যায়িদ বলেন, ‘যুবাইরকে দেখেছে এমন এক ব্যক্তি আমাকে বলেছে, তাঁর (যুবাইরের) বুকে ঝরণার মত দেখতে তীর বর্শার অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল।

পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে। তবে তাঁর তরবারিটি ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। তরবারির হাতলটি ছিল চমৎকার নকশা অংকিত।

হযরত মু’আবিয়া (রা.) আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকে (রা.) জিজ্ঞেস করলেনঃতালহা ও যুবাইর সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি।তিনি বললেনঃআল্লাহ তাদের দুজনের ওপর রহমত বর্ণন করুন। আল্লাহর কসম, তাঁরা দুজনই ছিলেন অত্যন্ত সংযমী, পূণ্যবান, সৎকর্মশীল, আত্মসমর্পণকারী, পুত-পবিত্র, পবিত্রতা অর্জনকারী ও শাহাদাত বরণকারী।

হযরত যুবাইর বলেনঃরাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার জন্য এবং আমার সন্তান-সন্ততি ও পৌত্র-পৌত্রীদের জন্য দুআ করেছেন।

হযরত যুবাইরের সবচেয়ে বড় পরিচয় ও সৌভাগ্য এই যে, তিনি আশারায়ে মুবাশশারা অর্থাৎ দুনিয়াতে জান্নাতের শুভ সংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবীর একজন।

উসমান ইবন আফফান (রা.)

উসমান ইবন আফফান (রা.)

নাম উসমান, কুনিয়াত আবু আমর, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা এবং লকব যুন-নূরাইন। (তাবাকাত /৫৩, তাহজীবুত তাহজীব) পিতা আফফান, মাতা আরওরা বিনতু কুরাইয। কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা শাখার সন্তান। তাঁর উর্ধ্ব পুরুষ আবদে মান্নাফে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে। খুলাফায়ে রাশেদার তৃতীয় খলীফা। তাঁর নানী বায়দা বিনতু আবদিল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ফুফু। জন্ম হস্তীসনের ছবছর পরে ৫৭৬ খৃষ্টাব্দে। (আল-ইসতিয়াব) এ হিসাবে রাসূলে করীম (সাঃ) থেকে তিনি ছয় বছর ছোট। তবে তাঁর জন্মসন সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ফলে শাহাদাতের সময় তাঁর সঠিক বয়স কত ছিল সে সম্পর্কে অনুরূপ মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কোন কোন বর্ণনা মতে, তাঁর জন্ম হয় তায়েফে। (ফিতনাতুল কুবরা, ডঃ তোহা হুসাইন)

হযরত উসমান (রা.) ছিলেন মধ্যমাকৃতির সুঠাম দেহের অধিকারী। মাংসহীন গণ্ডদেশ, ঘন দাড়ি, উজ্জ্বল ফর্সা, ঘন কেশ, বুক ও কোমর চওড়া, কান পর্যন্ত ঝোলানো যুলফী, পায়ের নলা মোটা, পশম ভরা লম্বা বাহু, মুখে বসন্তের দাগ, মেহেদী রঙের দাড়ি এবং স্বর্ণখচিত দাঁত।

হযরত উসমানের জীবনের প্রাথমিক অবস্থা অন্যান্য সাহাবীর মত জাহিলী যুগের অন্ধকারেই রয়ে গেছে। তাঁর ইসলামপূর্ব জীবন এমনভাবে বিলীন হয়েছে যেন ইসলামের সাথেই তাঁর জন্ম। ইসলামপূর্ব জীবনের বিশেষ কোন তথ্য ঐতিহাসিকরা আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি।

হযরত উসমান ছিলেন কুরাইশ বংশের অন্যতম কুষ্টিবিদ্যা বিশারদ। কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাসেও ছিল তাঁর গভীর জ্ঞান। তাঁর প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, সৌজন্য ও লৌকিকতাবোধ ইত্যাদি গুণাবলীর জন্য সব সময় তাঁর পাশে মানুষের ভীড় জমে থাকতো। জাহিলী যুগের কোন অপকর্ম তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। লজ্জা ও প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ ছিল তাঁর মহান চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। যৌবনে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মত ব্যবসা শুরু করেন। সীমাহীন সততা ও বিশ্বস্ততার গুণে ব্যবসায়ে অসাধারণ সাফল্য লাভ করেন। মক্কার সমাজে একজন বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী হিসাবে গনীউপাধি লাভ করেন।

হযরত উসমানকে আস-সাবেকুনাল আওয়ালুন’ (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী), ‘আশারায়ে মুবাশশারাএবং সেই ছজন শ্রেষ্ঠ সাহাবীর মধ্যে গণ্য করা হয় যাঁদের প্রতি রাসূলে করীম (সাঃ) আমরণ খুশী ছিলেন। আবু বকর সিদ্দীকের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। তাঁরই তাবলীগ ও উৎসাহে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। (সীরাতে ইবন হিশাম) মক্কার আরো অনেক নেতৃবৃন্দের আচরণের বিপরীত হযরত উসমান রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নবুওয়্যাতের সূচনা পর্বেই তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেন এবং আজীবন জান-মাল ও সহায় সম্পত্তি দ্বারা মুসলমানদের কল্যাণব্রতী ছিলেন। হযরত উসমান বলেনঃ আমি ইসলাম গ্রহণকারী চারজনের মধ্যে চতুর্থ। (উসুদুল গাবা) ইবন ইসহাকের মতে, আবু বকর, আলী এবং যায়িদ বিন হারিসের পরে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি হযরত উসমান।

হযরত উসমানের ইসলাম গ্রহণের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সীরাত লেখক ও মুহাদ্দীসগণ যেসব বর্ণনা দিয়েছেন তার সারকথা নিম্নরূপঃ

কেউ কেউ বলেন, তাঁর খালা সুদা ছিলেন সে ‍যুগের একজন বিশিষ্ট কাহিনবা ভবিষ্যদ্বক্তা। তিনি নবী করীম (সাঃ) সম্পর্কে উসমানকে কিছু কথা বলেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনার জন্য উৎসাহ দেন। তারই উৎসাহে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। (আল ফিতনাতুল কুবরা) পক্ষান্তরে ইবন সাদ সহ আরো অনেকে বর্ণনা করেনঃ হযরত উসমান সিরিয়া সফরে ছিলেন। যখন তিনি মুয়ান ও যারকারমধ্যবর্তী স্থানে বিশ্রাম করছিলেন তখন তন্দ্রালু অবস্থায় এক আহবানকারীকে বলতে শুনলেনঃ ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তিরা, তাড়াতাড়ি কর। আহমাদ নামের রাসূল মক্কায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। মক্কায় ফিরে এসে শুনতে পেলেন ব্যাপারটি সত্য। অতঃপর আবু বকরের আহ্বানে ইসলাম গ্রহণ করেন। (তাবাকাতঃ /৫৫)

হযরত উসমান যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁর বয়স তিরিশের উপরে। ইসলামপূর্ব যুগেও আবু বকরের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রায় প্রতিদিনই তাঁর আবু বকরের বাড়ীতে যাতায়াত ছিল। একদিন হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর সামনে ইসলাম পেশ করলেন। ঘটনাক্রমে রাসূল (সাঃ)-ও তখন সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেনঃ উসমান, জান্নাতের প্রবেশকে মেনে নাও।’ আমি তোমাদের এবং আল্লাহর সকল মাখলুকের প্রতি তাঁর রাসূল হিসেবে এসেছি। একথা ‍শুনার সাথে সাথে তিনি ইসলাম কবুল করেন। হযরত উসমানের ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর খালা সুদা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি কাসীদা রচনা করেছিলেন।

হযরত উসমানের সহোদরা আমীনা, বৈপিত্রীয় ভাই বোন ওয়ালীদ, খালীদ, আম্মারা, উম্মু কুলসুম সবাই মুসলমান হয়েছিলেন। তাঁদের পিতা উকবা ইবন আবী মুয়ীত। দারু কুতনী বর্ণনা করেছেন, উম্মু কুলসুম প্রথম পর্বের একজন মুহাজির। বলা হয়েছে তিনিই প্রথম কুরাইশ বধূ যিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাতে বাই’আত করেন। হযরত উসমানের অন্য ভাই-বোন মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশদের একজন সম্মানিত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ইসলামের শত্রুদের লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। তাঁর চাচা হাকাম ইবন আবিল আস তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে বেদম মার দিত। সে বলতো, একটা নতুন ধর্ম গ্রহণ করে তুমি আমাদের বাপ-দাদার মুখে কালি দিয়েছ। এ ধর্ম ত্যাগ না করা পর্যন্ত তোমাকে ছাড়া হবে না। এতে হযরত উসমানের ঈমান একটুও টলেনি। তিনি বলতেনঃ ‘তোমাদের যা ইচ্ছে কর, এ দ্বীন আমি কক্ষণো ছাড়তে পারবো না। (তাবাকাতঃ /৫৫)

হযরত উসমান ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজ কন্যা রুকাইয়্যাকেতাঁর সাথে বিয়ে দেন। হিজরী দ্বিতীয় সনে মদীনায় রুকাইয়্যার ইনতিকাল হলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমকে তাঁর সাথে বিয়ে দেন। এ কারণে তিনি যুন-নূরাইন’- দুই জ্যোতির অধিকারী উপাধি লাভ করেন।

রুকাইয়্যা ছিলেন হযরত খাদীজার (রা.) গর্ভজাত সন্তান। তাঁর প্রথম শাদী হয় উতবা ইবন আবী লাহাবের সাথে এবং উম্মু কুলসুমের শাদী হয় আবু লাহাবের দ্বিতীয় পুত্র উতাইবার সাথে। আবু লাহাব ছিল আল্লাহর নবীর কট্টর দুশমন। পবিত্র কুর’আনের সূরা লাহাব নাযিলের পর আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মু জামীল (হাম্মা লাতাল হাতাব) তাদের পুত্রদ্বয়কে নির্দেশ দিল ‍মুহাম্মাদের কন্যাদ্বয়কে তালাক দেওয়ার জন্য। তারা তালাক দিল। অবশ্য ইমাম সুয়ূতী মনে করেন, ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই রুকাইয়্যার সাথে উসমানের শাদী হয়। উপরোক্ত ঘটনার আলোকে সুয়ূতির মতটি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।

নবুওয়্যাতের পঞ্চম বছরে মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথম যে দলটি হাবশায় হিজরাত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উসমান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাও ছিলেন। হযরত আনাস (রা.) বলেনঃ হাবশার মাটিতে প্রথম হিজরাতকারী উসমান ও তাঁর স্ত্রী নবী দুহিতা রুকাইয়্যা।রাসূল (সাঃ) দীর্ঘদিন তাঁদের কোন খোঁজ-খবর না পেয়ে ভীষণ উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন। সেই সময় এক কুরাইশ মহিলা হাবশা থেকে মক্কায় এলো। তার কাছে রাসূল (সাঃ) তাঁদের দুজনের কুশল জিজ্ঞেস করেন। সে সংবাদ দেয়, ‘আমি দেখেছি, রুকাইয়্যা গাধার ওপর সওয়ার হয়ে আছে এবং উসমান গাধাটি তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাসূল (সাঃ) তাঁর জন্য দুআ করেনঃ ‘আল্লাহ তার সহায় হোন। লূতের (আ.) পর উসমান আল্লাহর রাস্তায় পরিবার পরিজনসহ প্রথম হিজরাতকারী। (আল-ইসাবা) হাবশা অবস্থানকালে তাঁদের সন্তান আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করে এবং এ ছেলের নাম অনুসারে তাঁর কুনিয়াত হয় আবু আবদিল্লাহ। হিজরী ৪র্থ সনে আবদুল্লাহ মারা যান। রুকাইয়্যার সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হয়েছিল। লোকেরা বলাবলি করতো কেউ যদি সর্বোত্তম জুটি দেখতে চায়, সে যেন উসমান ও রুকাইয়্যাকে দেখে।

হযরত উসমান বেশ কিছু দিন হাবশায় অবস্থান করেন। অতঃপর মক্কায় ফিরে আসেন এই গুজব শুনে যে, মক্কার নেতৃবৃন্দ ইসলাম গ্রহণ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মদীনায় হিজরাতের পর আবার তিনি মদীনায় হিজরত করেন। এভাবে তিনি যুল হিজরাতাইন’- দুই হিজরাতের অধিকারী হন।

একমাত্র বদর ছাড়া সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসূল (সাঃ) যখন বদর যুদ্ধে রওয়ানা হন, হযরত রুকাইয়্যা তখন রোগ শয্যায়। রাসূলের (সাঃ) নির্দেশে হযরত উসমান পীড়িত স্ত্রীর সেবার জন্য মদীনায় থেকে যান। বদরের বিজয়ের খবর যেদিন মদীনায় এসে পৌঁছুলো সেদিনই হযরত রুকাইয়্যা ইনতিকাল করেন। রাসূল (সাঃ) উসমানের জন্য বদরের যোদ্ধাদের মত সওয়াব ও গনীমতের অংশ ঘোষণা করেন। (তাবাকাতঃ৩/৫৬) এ হিসেবে পরোক্ষভাবে তিনিও বদরী সাহাবী।

রুকাইয়্যার ইনতিকালের পর রাসূল (সাঃ) রুকাইয়্যার ছোট বোন উম্মু কুলসুমকে উসমানের সাথে বিয়ে দেন হিজরী তৃতীয় সনে। একটি বর্ণনায় জানা যায়, আল্লাহর নির্দেশেই রাসূল (সাঃ) উম্মু কুলসুমকে উসমানের সাথে বিয়ে দেন। হিজরী নবম সনে উম্মু কুলসুমও নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। উম্মু কুলসুমের মৃত্যুর পর রাসূল (সাঃ) বলেনঃ আমার যদি তৃতীয় কোন মেয়ে থাকতো তাকেও আমি উসমানের সাথে বিয়ে দিতাম। (হায়াতু উসমানঃ রিজা মিসরী)

হযরত উসমান উহুদের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সেই মুষ্টিমেয় কিছু যোদ্ধাদের মত রাসূলুল্লাহর সাথে অটল থাকতে পারেননি। অধিকাংশ মুজাহিদদের সাথে তিনিও ময়দান ছেড়ে চলে যান। অবশ্য আল্লাহ তা’আলা তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষনা করেছেন। পরবর্তী সকল যুদ্ধেই অন্যসব বিশিষ্ট সাহাবীদের মত অংশগ্রহণ করেছেন।

রাসূল (সাঃ) তাবুক অভিযানের প্রস্তুতির ঘোষণা দিলেন। মক্কা ও অন্যান্য আরব গোত্রসমূহেও ঘোষণা দিলেন এ অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য। ইসলামী ফৌজের সংগঠন ও ব্যয় নির্বাহের সাহায্যের আবেদন জানালেন। সাহাবীরা ব্যাপকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। আবু বকর তাঁর সকল অর্থ রাসূলের হাতে তুলে দিলেন। উমার তাঁর মোট অর্থের অর্ধেক নিয়ে হাজির হলেন। আর এ যুদ্ধের এক তৃতীয়াংশ সৈন্যের যাবতীয় ব্যয়ভার উসমান নিজ কাঁধে তুলে নিলেন। তিনি সাড়ে নয়শউট ও পঞ্চাশটি ঘোড়া সরবরাহ করেন। ইবন ইসহাক বলেন, তাবুকের বাহিনীর পেছনে হযরত উসমান এত বিপুল অর্থ ব্যয় করেন যে, তাঁর সমপরিমাণ আর কেউ ব্যয় করতে পারেনি। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, তাবুকে রণপ্রস্তুতির জন্য উসমান কোরচে করে এক হাজার দীনার নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর কোলে ঢেলে দেন। রাসূল (সাঃ) খুশীতে দীনারগুলি উল্টে পাল্টে দেখেন এবং বলেনঃ আজ থেকে উসমান যা কিছুই করবে, কোন কিছুই তার জন্য ক্ষতিকর হবেনা।এভাবে অধিকাংশ যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় তিনি প্রাণ খুলে চাঁদা দিতেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, তাবুকের যুদ্ধে তাঁর দানে সন্তুষ্ট হয়ে রাসূল (সাঃ) তাঁর আগে-পিছের সকল গুনাহ মাফের জন্য দুআ করেন এবং তাঁকে জান্নাতের ওয়াদা করেন। (আল-ফিতনাতুল কুবরা)

হুদাইবিয়ার ঘটনা। রাসূল (সাঃ) উমারকে ডেকে বললেনঃ ‘তুমি মক্কায় যাও। মক্কার নেতৃবৃন্দকে আমাদের আগমণের উদ্দেশ্য অবহিত কর।উমার বিনীতভাবে বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুরাইশদের কাছ থেকে আমার  জীবনের আশঙ্কা করছি। আপনি জানেন তাদের সাথে আমার দুশমনি কতখানি। আমি মনে করি উসমানই এ কাজের উপযুক্ত।’ রাসূল (সাঃ) উসমানকে ডাকলেন। আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবৃন্দের নিকট এ পয়গামসহ উসমানকে পাঠালেন যে, আমরা যুদ্ধ নয়, বরং বাইতুল্লাহরযিয়ারতের উদ্দেশ্যে এসেছি।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পয়গাম নিয়ে উসমান মক্কায় পৌঁছলেন। সর্বপ্রথম আবান ইবন সাঈদ ইবন আস- এর সাথে তাঁর দেখা হয়। আবান তাঁকে নিরাপত্তা দেন। আবানকে সঙ্গে করে তিনি কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পয়গাম পৌঁছে দেন। তারা উসমানকে বলেন, তুমি ইচ্ছে করলে তাওয়াফকতে পার। কিন্তু উসমান তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যতক্ষণ তাওয়াফনা করেন, আমি তাওয়াফকরতে পারিনে। কুরাইশরা তাঁর এ কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে আটক করে।

কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, ’উসমানকে তারা তিনদিন আটক করে রাখে। এ দিকে হুদাইবিয়ায় মুসলিম শিবিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে উসমানকে শহীদ করা হয়েছে। রাসূল (সাঃ) ঘোষণা করলেন উসমানের রক্তের বদলা না নিয়ে আমরা প্রত্যাবর্তন করবো না। রাসূল (সাঃ) নিজের ডান হাতটি বাম হাতের ওপরে রেখে বলেনঃ ‘হে আল্লাহ, এ বাই’আত উসমানের পক্ষ থেকে। সে তোমার ও তোমার রাসূলের কাজে মক্কায় গেছে।’ হযরত উসমান মক্কা থেকে ফিরে এসে বাই’আতের কথা জানতে পারেন। তিনি নিজেও রাসূলুল্লাহর হাতে বাই’আত করেন। ইতিহাসে এ ঘটনা বাই’আতে রিদওয়ান, বাই’আতুশ শাজারা ইত্যাদি নামে খ্যাত হয়েছে। পবিত্র কুর’আনে এ বাই’আতের প্রশংসা করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ওফাতের পর যখন আবু বকরের হাতে বাই’আত নেওয়া হচ্ছিল উসমান সংবাদ পেয়ে খুব দ্রুত সেখানে যান এবং আবু বকরের হাতে বাই’আত করেন। মৃত্যুকালে আবু বকর উমারকে (রা.) খলীফা মনোনীত করে যে অঙ্গীকার পত্রটি লিখে যান, তার লিখক ছিলেন উসমান। খলীফা উমারের (রা.) হাতে তিনিই সর্বপ্রথম বাই’আত করেন।

হযরত উমার (রা.) ছুরিকাহত হয়ে যখন মৃত্যু শয্যায়, তাঁর কাছে দাবী করা হলো পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের জন্য। কিন্তু তিনি ইতস্ততঃ করে বললেনঃ ‘আমি যদি খলিফা বানিয়ে যাই, তবে তার দৃষ্টান্ত অবশ্য আছে, যেমনটি করেছেন আমার থেকেও এক উত্তম ব্যক্তি, অর্থাৎ আবু বকর (রা.) আর যদি না-ও বানিয়ে যাই তারও দৃষ্টান্ত আছে। যেমনটি করেছিলেন আমার থেকেও এক উত্তম ব্যক্তি, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। তিনি আরো বললেনঃ ‘আবু উবাইদা জীবিত থাকলে তাকেই খলীফা বানিয়ে যেতাম। আমার রব আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আপনার নবীকে আমি বলতে শুনেছি, তিনি এই উম্মাতের আমীন বা পরম বিশ্বাসী ব্যক্তি। যদি আবু হুজাইফার আযাদকৃত দাস সালেমও আজ জীবিত থাকতো, তাকেও খলীফা বানিয়ে যেতে পারতাম, আমার রব জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আপনার নবীকে আমি বলতে শুনেছি, সালেম বড় আল্লাহ-প্রেমিক। এক ব্যক্তি তখন বললো, আবদুল্লাহ ইবন উমার তো আছে। তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহ তোমার অমঙ্গল করুন। কসম আল্লাহর, আমি আল্লাহর কাছে এমনটি চাই না।…. খিলাফতের এ দায়িত্বের মধ্যে যদি ভালো কিছু থাকে, আমার বংশের থেকে আমি তা লাভ করেছি। আর যদি তা মন্দ হয় তাও আমরা পেয়েছি। উমারের বংশের এক ব্যক্তির হিসাব নিকাশই এজন্য যথেষ্ট। আমি আমার নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি, আমার পরিবারবর্গকে মাহরূম করেছি। কোন পুরস্কারও নয় এবং কোন তিরস্কারও নয় এমনভাবে যদি আমি কোন মতে রেহাই পাই, নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবো।’

যখন একই কথা তাঁর কাছে আবার বলা হলো, তিনি আলীর (রা.) দিকে ইঙ্গিত বললেন, তোমাদেরকে হকের ওপর পরিচালনার তিনিই যোগ্য। তবে আমি জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় এ দায়িত্ব বহন করতে রাজী নই। তোমাদের সামনে এই একটি দল আছেন, যঁদের সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, তাঁরা জান্নাতের অধিবাসী। তাঁরা হলেন- আবদে মান্নাফের দুই পুত্র আলী ও উসমান, রাসূলের (সাঃ) দুই মাতুল আবদুর রাহমান ও সা, রাসূলের (সাঃ) হাওয়ারী ও ফুফাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং তালহা তাঁদের যে কোন একজনকে খলীফা নির্বাচিত করবে। তাঁদের যে কেউ খলীফা নির্বাচিত হলে তোমরা তাঁকে সাহায্য করবে, তাঁর সাথে সুন্দর আচরণ করবে। তিনি যদি তোমাদের কারো ওপর কোন দায়িত্ব অর্পণ করেন, যথাযথভাবে তোমরা তা পালন করবে।

হযরত উমার উল্লেখিত দলটির সদস্যদের ডেকে বললেন, আপনাদের ব্যাপারে আমি ভেবে দেখিছি। আপনারা জনগণের নেতা ও পরিচালক। খিলাফতের দায়িত্বটি আপনাদের মধ্যেই থাকা উচিত। আপনাদের প্রতি সন্তুষ্ট অবস্থায় রাসূল (সাঃ) ইনতিকাল করেছেন। আপনারা ঠিক থাকলে জনগণের ব্যাপারে আমার কোন ভয় নেই। তবে আপনাদের পারস্পরিক বিবাদকে আমি ভয় করি। জনগণ তাতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়বে।

তারপর তিনি নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর তিন দিন তিন রাত্রি। মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদকে বলরেন, আমাকে কবরে শায়িত করার পর এই দলটিকে একত্র করবে এবং তাঁরা তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করবে। সুহায়িবকে বললেনঃ তিন দিন তুমি নামাযের জামায়াতের ইমামতি করবে। আলী, উসমান, সা, আবদুর রাহমান, যুবাইর ও তালহার কাছে যাবে, যদি তালহা মদীনায় থাকে (তালহা তখন মদীনার বাইরে ছিলেন)। তাদেরকে এক স্থানে সমবেত করবে। আবদুল্লাহ ইবন উমারকেও হাজির করবে। তবে খিলাফতের কোন হক তার নেই। তাঁদের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখবে। তাঁদের পাঁচজন যদি কোন একজনের ব্যাপারে একমত হয় এবং একজন দ্বিমত পোষণ করে, তরবারি দিয়ে তার কল্লা কেটে ফেলবে। আর যদি চারজন একমত হয় এবং দুজন অস্বীকার করে, তবে সে দুজনের কল্লা উড়িয়ে দেবে। আর যদি তিনজন করে দুভাগে ভাগ হয়ে যায়, আবদুল্লাহন বিন উমার যে পক্ষ সমর্থন করবে তারা তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করবে। অন্য পক্ষ যদি আবদুল্লাহ বিন উমারের সিদ্ধান্ত না মানে, তাহলে আবদুর রাহমান বিন আউফ যে দিকে থাকবে তোমরা সে দিকে যাবে। বিরোধীরা যদি জনগণের সিদ্ধান্ত না মানে তাহলে তাদেরকে মানাতে বাধ্য করবে।

হযরত উমারকে দাফন করার পর মিকদাদ বিন আসওয়াদ শূরার সদস্যদের মিসওয়ার ইবনুল মাখরামা মতান্তরে হযরত আয়িশার হুজরায় একত্র করলেন। তাঁরা পাঁচজন। তালহা তখনো মদীনার বাইরে। তাঁদের সাথে যুক্ত হলেন আবদুল্লাহ বিন উমার। বাড়ীর দরজায় প্রহরী নিয়োগ করা হলো আবু তালহাকে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও তুমুল বাক-বিতণ্ডা হলো। এক পর্যায়ে আবদুর রাহমান বললেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কে আছ, যে তার দাবী ত্যাগ করতে পার এবং তোমাদের উত্তম ব্যক্তিকে নির্বাচনের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পণ করতে পার? আমি আমার খিলাফতের দাবী ত্যাগ করছি। হযরত উসমান সর্বপ্রথম এ প্রস্তাবে রাজী হয়ে আবদুর রাহমানের হাতে তাঁর ক্ষমতা ন্যস্ত করলেন। তারপর অন্য সকলে তাঁর অনুসরণ করলেন। এভাবে খলীফা নির্বাচনের গোটা দায়িত্বটি আবদুর রাহমানের ওপর এসে বর্তায়।

হযরত আবদুর রাহমান দিনরাত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অন্যসব সাহাবী, মদীনায় অবস্থানরত সকল সেনা-অফিসার, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গসহ সকল স্তরের জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করলেন। কখনো ব্যক্তিগতভাবে, কখনো সম্মিলিতভাবে। প্রায় সকলেই হযরত উসমানের পক্ষে তাদের মতামত ব্যক্ত করলেন।

যেদিন সকালে উমার-নির্ধারিত সময় সীমা শেষ হবে, সে রাতে আবদুর রাহমান এলেন মাখরামার বাড়ীতে। তিনি প্রথমে যুবাইর ও সাদকে ডেকে মসজিদে নববীর সুফফায় বসে এক এক করে তাঁদের সাথে কথা বললেন, এভাবে উসমান ও আলীর সাথেও সুবহে সাদিক পর্যন্ত একান্তে আলাপ করেন।

এদিকে মসজিদে নববী লোকে পরিপূর্ণ। শেষ সিদ্ধান্তটি শোনার জন্য সবাই ব্যাকুল। ফজরের নামাযের পর সমবেত মদীনাবাসীদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণের পর আবদুর রাহমান খলীফা হিসেবে হযরত উসমানের নামটি ঘোষণা করেন এবং তাঁর হাতে বাই’আত করেন। তারপরই হযরত আলীও বাই’আত করেন। অতঃপর সমবেত জনমণ্ডলী হযরত উসমানের হাতে বাই’আত করেন। হিজরী ২৪ সনের ১লা মুহাররম, সোমবার সকালে তিনি খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। (তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ, খিদরী বেক)

হযরত উসমান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। খিলাফতের প্রথম পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে তেমন অভিযোগ শোনা যায়না। তবে শেষের দিকে বসরা, কুফা, মিসর প্রভৃতি অঞ্চল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। মূলতঃ এ অসন্তোষ সৃষ্টির পশ্চাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে পরাজিত ইয়াহুদী শক্তি। ধীরে ধীরে তারা সংঘবদ্ধভাবে বিদ্রোহী হয়ে উঠে এবং মদীনার খলীফার বাসভবন ঘেরাও করে। এই বিদ্রোহীদের মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিল না। তারা খলীফাকে হত্যার হুমকি দিয়ে পদত্যাগ দাবী করে। খলীফার বাসগৃহের খাদ্য ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। মসজিদে নামায আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে তারা খলীফার বাড়ীতে ঢুকে পড়ে এবং রোযা অবস্থায় কুর’আন তিলাওয়াতরত বয়োবৃদ্ধ খলীফাকে হত্যা করে। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) এ ঘটনা সংঘটিত হয় হিজরী ৩৫ সনের ১৮ জিলহজ্জ, শুক্রবার আসর নামাযের পর। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ওফাত ও হযরত উসমানের শাহাদাতের মধ্যে ২৫ বছরের ব্যবধান। বারো দিন কম বারো বছর তিনি খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।

জান্নাতুল বাকীর হাশশে কাওকাবনামক অংশে তাঁকে দাফন করা হয়। মাগরিব ও ঈশার মাঝামাঝি সময়ে তাঁর দাফন কার্য সমাধা হয়। যুবাইর ইবন মুতঈম (রা.) তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। কাবুল থেকে মরক্কো পর্যন্ত বিশাল খিলাফতের কর্ণধারের জানাযায় মাত্র সত্তরজন লোক অংশগ্রহণ করেছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স কত হয়েছিল সে সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ৮২ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ছিল। (আল-ফিতনাতুল কুবরা)

খলীফা উসমান বিদ্রোহীদের দ্বারা ঘেরাও হওয়ার পর ইচ্ছা করলে তাদের নির্মূল করতে পারতেন। অন্য সাহাবীরা সেজন্য প্রস্তুতও ছিলেন। কিন্তু হযরত উসমান নিজের জন্য কোন মুসলমানের রক্ত ঝরাতে চাননি। তিনি চাননি মুসলমানদের মধ্যে রক্তপাতের সূচনাকারী হতে। প্রকৃতপক্ষে এমন এক নাজুক মুহূর্তে হযরত উসমান (রা.) যে কর্ম-পদ্ধতি অবলম্বন করেন তা একজন খলীফা ও একজন বাদশার মধ্যে যে পার্থক্য তা স্পষ্ট করে তোলে। তাঁর স্থলে যদি কোন বাদশাহ হতো, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যে কোন কৌশল প্রয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করতো না। তাতে যত ক্ষতি বা ধ্বংসই হোক না কেন। কিন্তু তিনি ছিলেন খলীফা রাশেদ। নিজের জীবন দেওয়াকে তুচ্ছ মনে করেছেন। তবুও যেন এমন সম্মান বিনষ্ট না হতে পারে যা একজন মুসলমানের সবকিছু থেকে প্রিয় হওয়া উচিত।(খিলাফত  মুলুকিয়্যাতঃ আবুল লা মওদূদী)

ইসলামের জন্য হযরত উসমানের অবদান মুসলিম জাতি কোন দিন ভুলতে পারবে না। ইসলামের সেই সংকটকালে আল্লাহর রাস্তায় তিনি যেভাবে খরচ করেছেন, অন্য কোন ধনাঢ্য মুসলমানের মধ্যে তার কোন নজীর নেই। তিনি বিস্তর অর্থের বিনিময়ে ইয়াহুদী মালিকানাধীন বীরে রুমা’- কূপটি খরীদ করে মদীনার মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করেন। বিনিময়ে রাসূল (সাঃ) তাঁকে জান্নাতের অঙ্গীকার করেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যিনি একদিন বীরে রুমাওয়াকফ করে মদীনাবাসীদের পানি-কষ্ট দূর করেছিলেন, তাঁর বাড়ীতেই সেই কূপের পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘেরাও অবস্থায় একদিন তিনি জানালা দিয়ে মাথা বের করে মদীনাবাসীদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নির্দেশে আমিই বীরে রুমা খরীদ করে সর্বসাধারণের জন্য ওয়াকফ করেছি। আজ সেই কূপের পানি থেকেই তোমরা আমাকে বঞ্চিত করছো। আমি আজ পানির অভাবে ময়লা পানি দিয়ে ইফতার করছি।

হযরত উসমানের ফজীলাত ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) হতে যত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার সারকথা তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকটতম ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর বিশেষ স্থান ছিল। রাসূল (সাঃ) বার বার তাঁকে জান্নাতের খোশখবর দিয়েছেন। নবী (সাঃ) বলেছেনঃ প্রত্যেক নবীরই বন্ধু থাকে, জান্নাতে আমার বন্ধু হবে উসমান। (তিরমিযী) হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার বলেনঃ ‘নবী (সাঃ) এর সময়ে মুসলমানরা আবু বকর, উমার ও উসমানকে সকলের থেকে অধিক মর্যাদাবান মনে করতেন। তা ছাড়া অন্য কোন সাহাবীকে বিশেষ কোন মর্যাদা দেওয়া হতো না।

হযরত উসমান (রা.) রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সময়ে কাতিবে অহী’- অহী লিখক ছিলেন। সিদ্দীকী ও ফারুকী যুগে ছিলেন পরামর্শদাতা। প্রতিবছরই তিনি হজ্জ আদায় করতেন। তবে যে বছর শহীদ হন, ঘেরাও থাকার কারণে হজ্জ আদায় করতে পারেননি। সারা বছরই রোযা রাখতেন। সারা রাত ইবাদতে কাটতো। এক রাকআতে একবার কুর’আন শরীফ খতম করতেন। রাতে কারও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতেন না। রাতে চাকরদের খিদমাত গ্রহণ করতেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত লাজুক। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে উসমান সর্বাধিক লজ্জাশীল। তিনি আরো বলেছেনঃ উসমানকে দেখে ফিরিশতারাও লজ্জা পায়। আত্মীয়-বন্ধুদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সদয়। তাঁর গুণাবলী ও মর্যাদা সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে প্রকাশ করা যাবে না।