5.2.14

অধ্যায় ৫ ~ যেসব পদ্ধতি শরী’য়াহ পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক

আমরা ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কর্মপদ্ধতি, তা অনুসরণ করা ও এ পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার গুরুত্ব উপস্থাপন করেছি। তবে আমরা দেখতে পাই কিছু ইসলামিক দল ও চিন্তাবিদগন এ পদ্ধতি ব্যতিরেকে অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করছেন। যাই হোক যারাই এসব পদ্ধতি গ্রহণ করছেন, আমাদেরকে সে বিষয়ে অবশ্যই আলোচনা করতে হবে। দ্রুত পরীক্ষা করে এ বিষয়ে এমনভাবে অজ্ঞানতার পর্দাকে উন্মোচন করতে হবে যাতে মুসলিমগণ অবিরতভাবে হতবুদ্ধি না হয় এবং গোলকধাঁধায় হারিয়ে না যায় অথবা দাওয়াত বহনের ক্ষেত্রে সন্দিহান না থাকে। নিম্নে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি উপস্থাপন করব।

কিছু মুসলিম বলে যে, খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার কাজের বাধ্যবাধকতা কেবলমাত্র শাসক ও তাদের পারিষদবর্গকে আহবানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত

মালাআ হল একটি জনগোষ্ঠীর প্রধান। তাদের হাতে জনগনের সব বিষয় থাকে এবং তারা সব সময় শাসকদের চারপাশে থাকে। যদি তাদের ক্ষেত্রে দাওয়াত সফল হয় তাহলে ইসলামের সুবিধা হবে, সমাজকে সহজেই পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। যে বিষয়টি দাওয়াত কেবলমাত্র শাসকশ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবার উপলদ্ধি তৈরি করেছে তা হল, সাধারণ জনগনকে দাওয়াত প্রদান করবার মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজ করা শুরু করলে তা তাদের জন্য শাসক কর্তৃক লাঞ্ছণা বয়ে নিয়ে আসবে। তারা এমন বোঝায় ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে যা বহনে তারা অক্ষম এবং মুসলিমদের এ অবস্থায় পর্যবসিত হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ

মুসলিমদের নিজেদের খর্ব করা উচিত নয়।যখন তাঁকে (সাঃ) জিজ্ঞেস করা হলঃ কীভাবে একজন নিজেকে খর্ব করে?’ তিনি (সাঃ) বলেনঃ নিজেকে এমন ক্লেশের মধ্যে ঠেলে দিয়ে যা বহনে সে অক্ষম। (আহমেদ, তিরমিযী এবং ইবনে মাজাহ)

কেউ যদি যে পরিবেশে সমাজ পরিবর্তনের দাওয়াতের উত্থান ঘটে সে বাস্তবতা অধ্যয়ন করে, তাহলে দেখতে পাবে যে, তা এমন একটা সময়ে হয় যখন সমাজে থাকে অবিচার, নৈতিক অবক্ষয়, ধ্বংস, দূর্দশা এবং প্রতিকূলতা। সমাজে এসবই হয়ে থাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ও তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতি ঈমানের অভাবের কারনে, এজন্য অতীতে নবীরা এবং আমাদের মহান রাসূল (সাঃ) প্রথমেই দাওয়াত দিতেন ঈমান ও আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) ইবাদতের প্রতি।

অতীতে এবং আজকেও সমাজ শাসক ও তাদের পারিষদবর্গের দ্বারা পরিচালিত হয়। তারা নিজের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য মনগড়া আইন ও মিথ্যা আক্বীদা ভিত্তিক চিন্তা ধারণ করে। নিজের স্বার্থ ও সামাজিক মর্যাদার জন্য তারা এসব মিথ্যা বিশ্বাসকে রক্ষা করে। এ কারণে ইসলামের দাওয়াতের কথা প্রথমবার শুনবার পর একজন বিচক্ষণ বেদুইন নিম্নের গভীর ও সঠিক মন্তব্যটি করেছিল যে, অবশ্যই এটা এমন একটি বিষয় যা শাসকদের বিরাগভাজন হওয়ার কারণ।সমাজের লোকেরা নিজেদের সমাজের শাসক ও তাদের পারিষদগবর্গের কাছে সমর্পন করে। একটি প্রতিক্রিয়া তৈরির বদলে তারা প্রভাবিত হয়। ঘৃণা করা সত্ত্বেও তারা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য করে। কারণ তারা জানে শাসকদের এ অবিচারের মূলোৎপাটন করা সহজসাধ্য নয়।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যখন কোন নবী বা রাসূল প্রেরণ করেন তা হয় তাদের লোকদের সত্য পথ নির্দেশ করবার জন্য। যারা এ ব্যাপারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং নবী রাসূলদের বিপক্ষে অবস্থান নেয় তারা হল এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ শাসক ও তাদের পারিষদবর্গ। মালাআগণ শাসকদের সাহায্যকারী। তারা স্বার্থলিপ্সু, ধনী ও অমিতব্যয়ী। তারা জনগনের নেতা ও প্রধান, যারা শাসকদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাহক হয়ে উঠে। শাসকগণ তাদের উপর নির্ভর করে ও সাহায্য প্রার্থনা করে। তারা এমনসব লোক যাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন যে, যারা আল্লাহর নবীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তাদের মধ্যে তারা সম্মুখে থাকবে। কারণ তাদের হৃদয় টাকা ও পদমর্যাদার প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং স্বার্থের সাথে তাদের পদমর্যাদা সর্ম্পকিত। সেকারণে যখনই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি দাওয়াতের কথা আসে তখনই তারা চিন্তা করে যে, এটা তাদের স্বার্থ ও পদমর্যাদার পথে অন্তরায়। তারা দাওয়াতের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং শাসকদের দাওয়াতকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও নির্মূল করতে প্ররোচিত করে। পাপ ও পঙ্কিলতার কারনে শাসক তাদের উপদেশ গ্রহণ করে। এ কারণে অবধারিতভাবে আল্লাহর নবীগণ ও মালার পাশে থাকা শাসকদের সাথে সংঘাত হয়েছে। আল্লাহর নবী, শাসক ও তাদের পারিষদবর্গদের মধ্যে সাধারণ লোকদের হৃদয় জয় করবার জন্য রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার প্রতিযোগিতা হত। নবীগণ সত্য দিয়ে লোকদের আহ্বান করতেন। কিন্তু তারা ছিলেন দূর্বল, অরক্ষিত। কেবলমাত্র সত্য উচ্চারণের ক্ষমতা দিয়ে মানুষের হৃদয় মন জয় করে নিয়েছিলেন। শাসক ও তাদের পারিষদবর্গ প্রথমদিকে এ আহ্বানের বিরুদ্ধে অসত্য যুক্তি উপস্থাপন করে বলত এগুলো জাদুকরী মন্ত্র, পৌরাণিক গল্প, সত্য ধারণকারীরা মিথ্যাবাদী, বিশ্বাসীরা বোকা অথবা হীন মানসিকতাসম্পন্ন। যখন এ পদ্ধতি কাজ না করত তখন নির্যাতন, বিতাড়ন, গ্রেফতার ও হত্যার পথ বেছে নেয়া হত। নবী ও তাঁর অনুসারীদের সাথে শাসক, তাদের পারিষদবর্গ ও রাজার ধর্ম অনুসারীদের মধ্যে সর্বাত্নক যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। কুরআন বারংবার এ বিষয়টিকে একটি আইন বলে উল্লেখ করেছে।

সেকারণে আমরা দেখতে পাই যে, সাইয়্যিদিনা নুহ () যখন লোকদের দাওয়াত দিচ্ছিলেন তখন সর্বপ্রথম বাধা এসেছিল এই পারিষদবর্গের কাছ থেকে। এ সর্ম্পকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেনঃ

নিশ্চয় আমি নুহকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠিয়েছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্যে একটি মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি। তার সম্প্রদায়ের সর্দাররা বললঃ আমরা তোমাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মাঝে দেখতে পাচ্ছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, আমি কখনও ভ্রান্ত নই; কিন্তু আমি বিশ্ব প্রতিপালকের রাসূল। (সূরা আল রাফঃ ৫৯-৬১)

সাইয়্যিদিনা হুদ () তার কওম আদকে আহ্বান করেছিলেন। লোকদের মধ্যে নেতাগন সর্বপ্রথম এ দাওয়াতকে প্রত্যাখান করেছিল। এ সর্ম্পকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেনঃ

আদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই হুদকে। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তার সম্প্রদায়ের সর্দাররা বললঃ আমরা তোমাকে নির্বোধ দেখতে পাচ্ছি এবং আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করি। (সূরা আল রাফঃ ৬৫-৬৬)

সাইয়্যিদিনা সালেহ () তার কওম সামুদকে আহ্বান করেছিলেন। লোকদের মধ্যে নেতাগন সর্বপ্রথম এ দাওয়াতকে প্রত্যাখান করেছিল। এ সর্ম্পকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেনঃ

সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই সালেহকে। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই...’ (সূরা আল রাফঃ ৭৩)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেনঃ

তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক সর্দাররা ঈমানদার দরিদ্রদেরকে জিজ্ঞেস করলঃ তোমরা কি বিশ্বাস কর যে, সালেহকে তার প্রতিপালক প্রেরণ করেছেন? তারা বললঃ আমরা তো তার আনীত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসী। দাম্ভিকরা বললঃ তোমরা যে বিশ্বাস স্থাপন করেছ, আমরা তাতে অস্বীকৃত। (সূরা আল রাফঃ ৭৫-৭৬)

একইভাবে সাইয়্যিদিনা শুআইব () মাদাইনের লোকদের যখন আহ্বান করেছিলেন তখন নেতৃস্থানীয় লোকেরা অত্যন্ত ঔদ্ধ্যতের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেনঃ

আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শুআইবকে প্রেরণ করেছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়। তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নাই...’ (সূরা আল রাফঃ ৮৫)

এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেনঃ

তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক সর্দাররা বললঃ হে শুআইব, আমরা অবশ্যই তোমাকে এবং তোমার সাথে বিশ্বাস স্থাপনকারীদেরকে শহর থেকে বের করে দেব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে। (সূরা আল রাফঃ ৮৮)

যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সাইয়্যিদিনা মুসা () কে ফিরাউন ও তার পারিষদবর্গের কাছে প্রেরণ করলেন, তখন তারা তাকে প্রত্যাখান করল ও মুসার সঙ্গীদের ভয় পেল এবং তাঁকে হত্যা করবার জন্য পরামর্শ দিল। এ সর্ম্পকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেনঃ

অতঃপর আমি তাদের পরে মূসাকে পাঠিয়েছি নিদর্শনাবলি দিয়ে ফেরাউন ও তার সভাসদদের নিকট। বস্তুত ওরা তার মোকাবেলায় কুফরী করেছে। সুতরাং চেয়ে দেখ, কি পরিণতি হয়েছে অনাচারীদের। (সূরা আল রাফঃ ১০৩)

এবং আল্লাহ বলেনঃ

ফেরাউনের সাঙ্গ-পাঙ্গরা বলতে লাগল, নিশ্চয় লোকটি বিজ্ঞ- যাদুকর। (সূরা আল রাফঃ ১০৯)

ফেরাউনের সম্প্রদায়ের সর্দাররা বলল, তুমি কি এমনি ছেড়ে দেবে মূসা ও তার সম্প্রদায়কে। দেশময় হৈ-চৈ করার জন্য এবং তোমাকে ও তোমার দেব-দেবীকে বাতিল করে দেবার জন্য। (সূরা আল রাফঃ ১২৭)

আর কেউ ঈমান আনল না মূসার প্রতি, তার কওমের কতিপয় বালক ছাড়া- ফেরাউন ও তার সর্দারদের ভয়ে যে, এরা না আবার কোন বিপদে ফেলে দেয়। ফেরাউন দেশময় কর্তৃত্বের শিখরে আরোহণ করেছিল। আর সে তার হাত ছেড়ে রেখেছিল। (সূরা ইউনুসঃ ৮৩)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সীরাত অন্যান্য নবী রাসূল (সাঃ) এর চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। দাওয়াতের গতিকে মন্থর এবং লোকদের দাওয়াত শোনা ও গ্রহণের ব্যাপারে বিতস্পৃহ করবার জন্য ব্যাপক নির্যাতন ও বিশ্বাসীদের উপর অত্যাচার চালানো হয়। বিশ্বাসীরা ভাবত ঈমানের জন্য নিজের লোকদের দ্বারা অত্যাচারিত হতে হবে। যে বিশ্বাস স্থাপন করতে চাইত সে ভেবে নিত যে, পূর্বের বিশ্বাসীদের মতই তার অবস্থাও করুণ হবে। বিশ্বাসী ও মালা নেতৃত্বাধীন তাদের অনুসারীদের মধ্যকার বিবাদ পর্যায়ক্রমিক সফলতার মাধ্যমে চলত। অতঃপর একসময় তাগুতের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে গেল। পরবর্তীতে দাওয়াত বহনকারীরা ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরে।

ইবনে মাসঊদের (রা.) বরাত দিয়ে সহীহ বুখারীতে বলা হয়েছেঃ

       
যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সিজদারত অবস্থায় তখন একদা কুরাইশের লোকেরা তার চারপাশে ছিল। এমতাবস্থায় উকবা বিন আবি মুইত উটের নাড়িভূড়ি নিয়ে এল এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর নিক্ষেপ করল। নবী (সাঃ) তাঁর মাথা উঠালেন না। ফাতিমা (রাঃ) দৌড়ে এলেন এবং নবী (সাঃ) এর পিঠ থেকে উটের নাড়িভূড়ি সরালেন এবং যারা এ কাজটি করেছে তাদের অভিসম্পাত করলেন। নবী (সাঃ) বললেনঃ হে আল্লাহ! কুরাইশদের নেতা (মালা) আবু জাহেল বিন হিশাম, উতবা বিন রাবিয়্যাহ এবং উমাইয়্যা বিন খালাফ.....কে উঠিয়ে নাও।ইবনে মাসুদ অন্য একটি বর্ণণায় বলেনঃ আমি তাদের বদরের দিন নিহত হতে দেখেছি এবং কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

মক্কায় কেবল একজন নেতা ছিল না, অনেক মালা ছিল। এই লোকগুলো রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দাওয়াতকে বিরোধিতা করেছিল এবং লোকদের এ পথ থেকে বিভ্রান্ত করবার অপচেষ্টা করেছে।

অন্যান্য নবীদের কেবলমাত্র তাদের লোকদের কাছে প্রেরণ করা হত, কিন্তু মুহম্মদ (সাঃ) এর দাওয়াত গোটা মানবতার জন্য।

কুরাইশদের পারিষদবর্গ দাওয়াতের কাজে ব্যাপক প্রত্যাখান ও বাধা সৃষ্টি করা শুরু করা সত্ত্বেও দাওয়াত কেবলমাত্র তাদের মাঝেই পরিগ্রহ করেনি। দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কোন বৈষম্য করেননি। গরীব-ধনী, প্রভূ-ক্রীতদাস কারও ক্ষেত্রে তিনি ভেদাভেদ করেননি। তারপরেও ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) এর মত একজন অন্ধ দরিদ্র ব্যক্তির প্রতি ভ্রুকুঞ্চিত করবার কারণে তাঁকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি নেতাদের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাবার জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল ছিলেন এই আশায় যে, তারা ঈমান গ্রহণ করলে তাদের অনুসারীরাও ঈমান গ্রহণ করবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে সতর্ক করা সত্ত্বেও নেতৃস্থানীয় লোকদের প্রতি দাওয়াত বন্ধ হয়নি। কারণ এ তিরষ্কার ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আহ্বানের দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতাদের প্রতি দাওয়াত ও সাধারণ জনগনের প্রতি দাওয়াত একইরকম।

সীরাত থেকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নেতা ও প্রধানদের কাছে কেবলমাত্র তাদের পদমর্যাদার কারণে দাওয়াত নিয়ে যাননি, বরং তারা বিশ্বাসী হলে তাদের অনুসারীরাও বিশ্বাসী হবে এ আশা থেকে তিনি (সাঃ) দাওয়াত দিয়েছিলেন। এ কারণে দাওয়াতের আওতার মধ্যে সবাই অর্ন্তভুক্ত।

এছাড়াও এমন লোক দাওয়াত গ্রহণ করেছিল যারা লোকদের নেতা ছিল না, যেমনঃ বিলাল, আম্মার (রাঃ) এবং তাঁর মা ও বাবা। একই কথা শুআইব ও সালমান (রাঃ) এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; কারণ তারা কেউ কুরাইশ নেতা ছিলেন না। আবার আমীর বিন ফুহাইরা, উম্মে আবিস, জুনাইরাহ, আন নাহদিয়্যা ও তাঁর কন্যা এবং বানু মুমিল এর ক্রীতদাসী এর ক্ষেত্রেও এ কথা খাটে। কারণ আবু বকর (রাঃ) ও প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারীরা তাঁদের সবাইকে দাসত্ব মুক্ত করেছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রাথমিকভাবে তাদেরই দাওয়াত দিয়েছিলেন যাদের মধ্যে খায়ের ছিল। অতঃপর তিনি সবার কাছে গিয়েছিলেন। তরুণ ও বৃদ্ধরা সাধারণত সে আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। সাধারণ ও সম্মানিত লোকেরাও সাড়া দিয়েছিল।

দাওয়াতের পাত্র অনুসন্ধান করবার ক্ষেত্রে কোন সীমাবদ্ধতা নেই। এর মধ্যে সব ধরনের লোকেরাই থাকবে। আর পদ্ধতি হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতির কোন বিকল্প নেই, যার মাধ্যমে তিনি দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

কিছু মুসলিম মনে করে, ইবাদত (আনুষ্ঠানিক ইবাদত) করাটাই হলো প্রয়োজনীয় কাজ; ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা নয়

তারা আরও বলে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) লোকদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছেন, কিন্তু ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে নয় অথবা আল্লাহর প্রতি ইবাদত হল কেন্দ্রীয় ইস্যু, ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়; কিংবা ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরী নয় যতটা জরুরী আল্লাহর ইবাদত করা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তারা এ জাতীয় আরো কিছু কথা বলে থাকে।

এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অবশ্যই ইবাদতের বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করব এবং দেখাব কীভাবে তা অর্জন করতে হয়।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং মানুষকে সৃষ্টির অর্ন্তনিহিত উদ্দেশ্য হল ইবাদত করা। লা ইলাহা ইল্লালাহুএর অর্থ হল, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। আর এ কথার ব্যতিক্রম যে কোন কিছুই মিথ্যা ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য এবং মানুষ এ ব্যাপারে অবশ্যই সাক্ষ্য দেবে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ - এর অর্থ হল, ইবাদত ও আনুগত্য শুধুমাত্র মুহাম্মদ (সাঃ) যা নিয়ে এসেছেন সে পদ্ধতিতে হবে এবং মানুষকে অবশ্যই তার সাক্ষ্য দিতে হবে।

সুতরাং, ইবাদাহ বা উপাসনা হল কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য। আর এটা ততক্ষণ পর্যন্ত করা যাবে না যতক্ষণ না আল্লাহ সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তা প্রদর্শন করেছেন। আর এ বাণীটি আমাদের জীবনে যে কোন কথা ও কাজে মনে রাখতে হবে।

যখন একজন মুসলিম তার বাস্তবতায় নিজের কোন চাহিদা মেটাবার জন্য বা কোন মূল্যবোধের তাগিদে কোন কাজ করে তখন সে কেবলমাত্র তার চাহিদা ও প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করবার উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসর হয় এবং যা সম্পন্ন করা যায় একাধিকভাবে।

শরীয়াগত পদ্ধতিতে এ চাহিদা পূরণ করা এবং এ সীমার মধ্যে অবস্থান করা ও এ কাজকে আল্লাহর বিশ্বাসের সাথে সর্ম্পকযুক্ত করার নামই হল ইবাদত।

প্রতিটি কাজের পিছনে কাজ করে ইচ্ছা ও চাহিদার সন্তুষ্টি, আর মানুষের প্রয়োজন নানাদিকের সাথে সম্পর্কযুক্ত, এটা সহজাত যে তার এ ক্রিয়াকলাপ জীবনের সবদিকই আচ্ছাদিত করে।

সুতরাং ইবাদত হল সে কাজ যা মানুষ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশ ও নিষেধ মেনে করে থাকে এবং এটা কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রতি ঈমানের ভিত্তিতে হতে হবে। আর এর মাধ্যমেই ইবাদতের পূর্ণাঙ্গতা নিশ্চিত হয় এবং এ ইবাদত মানুষের সব কাজকে বেষ্টন করে।

কাউকে আল্লাহর উপাসনাকরতে বলার অর্থ কেবলমাত্র সালাত আদায়, যাকাত প্রদান, হজ্জ সম্পাদন বা ফকীহগন যেগুলোকে ইবাদত বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন সেগুলো করা বুঝায় না, বরং সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলার নামই হল ইবাদত।

সুতরাং যে কোন কাজের মূল হল আল্লাহর প্রতি ঈমান। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের দিকে সব কাজকে ধাবিত করার জন্যই ইবাদত। সুতরাং পুরো দ্বীন হল ইবাদাহ এবং ইবাদাহ অর্থ হল সমর্পণ করা। আর আল্লাহর কাছে মানুষকে সমর্পণ করবার অর্থ হল তার ইবাদত করা, তার আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, তাকে সর্বজ্ঞ ও সর্বসচেতন হিসেবে মেনে নেয়া, সন্তুষ্টির সাথে সর্বান্তকরণে তার কাছে আত্নসমর্পন করা।

সেকারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ইবাদত করা ও তাঁকে মান্য করবার অংশ হল সালাত আদায়, যাকাত প্রদান ও ক্বিয়াম বা রাত জেগে ইবাদত করবার পাশাপাশি সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে নিষেধ করা, কুফর ও নিফাক (মুনাফেক) এর বিরুদ্ধে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণ করা, মুসলিমদের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করা, সব লোকদের কাছে দাওয়াতের প্রসার ঘটানো এবং মুসলিমদের সুরক্ষা প্রদান করা।

আল্লাহর প্রতি উপাসনার মধ্যে মানুষের সব কাজই অর্ন্তভুক্ত, যা মানুষ তার বাস্তবতা অনুসারে পালন করে থাকে। যদি এমন হয় কোন মুসলিম সালাত আদায় করছে না, তাহলে তখন সালাতের দিকে আহ্বান করা হল ইবাদত। একইভাবে সাওম পালনের জন্য আহ্বান করা ইবাদত, শরীয়াহ অনুযায়ী ক্রয় বিক্রয় করবার আহ্বান জানানোর নামও ইবাদত। আল্লাহর প্রতি ঈমানই হল সব ইবাদতের মূল। সেকারণে কাউকে যখন সালাত আদায় বা সাওম পালনের দিকে আহ্বান জানানো হয়, তখন যাকে আহ্বান করা হয়, তার ঈমানী চেতনাকে আগে জাগ্রত করতে হবে এবং এই ঈমানকে কাজের প্রতিশ্রুতি ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিণত করতে হবে।

একইভাবে লোকদের ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করবার দিকে আহ্বান করাও আল্লাহর নির্দেশ এবং এগুলো আমাদের মানতে হবে। এগুলো সে-ই পালন করবে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। সে কারণে এগুলোর দিকে আহ্বান করার আগে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করতে হবে। এভাবে এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ইবাদত উপলদ্ধি হবে।

মুসলিমরা আজকাল কুফরী ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করে, যার হুকুমসমূহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছ থেকে উৎসারিত নয় এবং এর মধ্যে থেকে তারা ইসলামী জীবনব্যবস্থা চর্চা করতে পারে না। এমতাবস্থায় দ্বীন প্রতিষ্ঠার আহ্বান অবশ্যই আল্লাহর ইবাদতের দিকে দাওয়াত দেয়া বুঝায় এবং এ দিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

সুতরাং আমাদের যুগের সমস্যার সাথে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বানকে সর্ম্পকযুক্ত করতে হবে। আর এটি প্রতিফলিত হয় যখন ইসলামিক জীবনধারা পূণঃপ্রবর্তনের দিকে কেউ আহ্বান করে।  কেবলমাত্র তখনই আল্লাহর ইবাদত পূর্ণাঙ্গরূপে করা সম্ভবপর হবে। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের দিকে আহ্বানের অর্থ হল দ্বীন প্রতিষ্ঠার দিকে আহ্বান করা, যা একটি ইবাদত এবং এ দাওয়াতও একটি ইবাদতের দিকে আহ্বান। কারণ এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার একটি হুকুম যার প্রতি আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে আত্নতুষ্টি থেকে কোন মুসলিম এটাকে অবহেলা করে।

সুতরাং বিভিন্ন লোক কর্তৃক এ বিষয়টি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা সঠিক নয়। কারণ তারা এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা আল্লাহর ইবাদতের সাথে সাংঘর্ষিক। আর এ ধরনের মন্তব্য করা বা দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা কুরআনের একটি অংশের উপর আক্রমণের নামান্তর এবং এটা করা হারাম।

কারও কারও মতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সীরাতের যথার্থতা যাচাই করা হয়নি

এর অর্থ হল, যে বিষয়ের দলিল প্রমাণিত নয় সেটি মানতে আমরা বাধ্য নই। ফলে আমরা সে অনুযায়ী কাজও করতে পারি না। তারা মনে করে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য মাক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাজকে অনুসরণ না করবার ব্যাপারে তাদের মতামতের পক্ষে এটি একটি দলিল।

এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিক্রিয়ায় আমরা বলতে পারি, সীরাত হল বর্ণণা ও ঘটনার সংগ্রহ- যে ব্যাপারে নিরীক্ষা ও দালিলিক প্রমাণ অত্যাবশ্যকীয়। যেহেতু এটা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাজের সাথে সর্ম্পকযুক্ত, সেহেতু তা ওহীর অংশ। সুতরাং মুসলিমদের মুস্তফা (সাঃ) এর সীরাতের ব্যাপারে এমনভাবে সচেতন থাকতে হবে যেভাবে তারা কুআন ও হাদীসের ব্যাপারে সচেতন থাকে। সীরাতে মাক্কী জীবনের কাজ বলতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখানে অবস্থানকালে যা করেছিলেন তাকেই বুঝায়, যখন তিনি মদীনাতে দার-উল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করেছিলেন। যাদের সীরাতের যথার্থতা নিয়ে কাজ করবার সক্ষমতা আছে, যদি তারা তা না করে অথবা অন্যদের এ ব্যাপারে উৎসাহ না দেয় তাহলে তারা গোনাহগার হবে।

এটা খুবই অদ্ভুত যে, যারা এরকম দাবী করে তারা সবাই হাদীস গবেষক ও নিরীক্ষক। এমনভাবে এ দৃষ্টিভঙ্গিকে উপস্থাপন করে যেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ থেকে তারা দায়মুক্ত। অবস্থা এমন যেন, তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী উপসংহারে উপনীত হয়েছে।

এ মুসলিমগন কি ভুলে গেছে যে, অন্যান্য মুসলিমদের মতই তারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দায়িত্বশীল? এটা তাদেরকে সীরাত অধ্যয়ন ও নিরীক্ষণকে বাধ্যতামূলক করেছে। যদি বাস্তবতা তাদের আংশিক শরীয়াহ বিষয়গুলোর ব্যাপারে হাদীস পরীক্ষা করতে প্রচেষ্টা চালাতে উদ্ধুদ্ধ করে, (এর জন্য তারা ধন্যবাদ পাবে, এ বিষয়ে তারা জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং এ পথে অনেক সময় ব্যয় করেছে), তাহলে দ্বীন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনুধাবন করার পর তারা কী পরিমাণ গবেষণা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে বাধ্য?

যদি সীরাতের কোন বর্ণণার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ না থাকে তাহলে এমন কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে না যে, বিশেষ কোন সীরাত গ্রন্থের সব বর্ণণা গ্রহণ করা যাবে না।

ইতিহাসের যে শাখায় সীরাত লেখকগন কাজ করেছেন সেখানে মুহাদ্দীসীনদের পদ্ধতির মত সাবধানতা অবলম্বন করেননি। এমনকি বর্ণণাকারী বা সংগ্রাহকের বিশ্বস্ততা, বর্ণিত বিষয়ের যথার্থতা, বাহুল্যতা এবং সঞ্চারণে বীতস্পৃহা সর্ম্পকে সাবধানতা অবলম্বন করা হয়নি। এটা হাদীস বিশারদ ও সীরাতের যাচাইমূলক কাজের সাথে জড়িত যারা তাদের আত্নপ্রসাদপূর্ন করে তুলে।

আসল ব্যাপারটি হল, মুহাদ্দিসগন ও হাদীস বিশেষজ্ঞগন নিজেরা যে তথ্যনুসন্ধান এবং সঞ্চারন (transmit) করেন তাই হাদীস বিজ্ঞানের (science of hadith) জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়। সীরাত বিজ্ঞান একটি দিক থেকে এ জিনিসটি (বর্ণণার বিশুদ্ধতা) দাবী করে, আর সেটা হলো রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও সাহাবী (রাঃ) এর জীবনের সাথে সম্পৃক্ত বিবরণ। অপরদিকে, যে বিষয়টি রাসূল (সঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণের (রাঃ) সাথে সম্পৃক্ত নয় সে বিষয়ে নমনীয়তা এ সর্ম্পকিত জ্ঞানকে ক্ষুন্ন করে না।

ঘটনাপ্রবাহ অনেক বেশী এবং অনেক সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। সেকারণে সীরাত লেখক ও ঐতিহাসিকগন মুহাদ্দিসীগণের পদ্ধতির উপর নির্ভর করলে এত ঘটনাকে বেষ্টন করতে পারবে না। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সীরাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান- যে ব্যাপারে মুসলিমদের সচেতন থাকা উচিত। কারণ এতে রয়েছে তাঁর উক্তি, কাজ, সম্মতি ও বৈশিষ্ট্য। এসবই কুআনের মত আইনের অংশ। নবীর (সাঃ) সীরাত আইনের একটি উপাদান বিধায় হাদীসের অংশ। নবী (সাঃ) এর পক্ষ থেকে যা দালিলিক প্রমাণসহ পাওয়া যায় তাই শরঈ হুকুম। কারণ এটি সুন্নাহ থেকে নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেনঃ

তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। (সূরা আল আহযাবঃ ২১)

সুতরাং সীরাতের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করা ও গুরুত্ব প্রদান করা শরীয়াহ বিষয়।

পূর্বে সীরাত সরবরাহের পদ্ধতি হিসেবে কেবলমাত্র বর্ণণার উপর নির্ভর করা হত। ঐতিহাসিকগন মৌখিভাবে তা সঞ্চালিত করা শুরু করলেন। যে প্রথম প্রজন্ম রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রত্যক্ষ করেছে ও তার ব্যাপারে শুনেছে তারা অন্যদের কাছে এ ব্যাপারে তথ্য সঞ্চালিত করেছে। পরের প্রজন্মের কেউ কেউ এগুলো মিশ্রভাবে লিখে সংরক্ষণ করেছিল-যেগুলো আমরা এখন হাদীস গ্রন্থ হিসেবে পাই। দ্বিতীয় শতাব্দীতে আমরা দেখতে পাই কেউ কেউ সীরাত বিষয়ক কিছু বর্ণণা সংকলন করে একীভূত করেন। সংকলনের সময় তারা হাদীসের মত সঞ্চালক এবং এসব সঞ্চালকগণ যাদের থেকে সংগ্রহ করেছেন তাদের নামও উল্লেখ করেন। সেকারণে হাদীসবেত্তা ও ইসনাদ (বর্ণণাকারীদের ধারাবাহিকতা) নিরীক্ষকগণ গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণিক সীরাত বর্ণণা থেকে বর্ণণাকারী ও বর্ণণাকারীদের ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে দূর্বল ও প্রত্যাখানযোগ্য অংশগুলো খুজে বের করেন। প্রামাণিক সীরাত থেকে এভাবে বর্ণণার সময় নির্ভর করা হয়। নতুন কোন বিষয়ের অবতারণা করা প্রধান ইস্যু নয়, বরং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কথা ও কাজের বর্ণণার নির্ভূলতা ও সঠিকতা নিরূপণ করা অতি প্রয়োজনীয়। তবে কিছু সচেতন মানুষ সীরাত পরীক্ষা করে দেখেছে। সুতরাং যে দল বা সংগঠনটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের অবশ্যই প্রামাণ্য দলিল নির্ভর সীরাত পরখ করে দেখতে হবে।

তাছাড়া, সীরাতের বইগুলোতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অমত সত্ত্বেও হাদীসের গ্রন্থ ও কুর'আনের মত দাওয়াতের বিভিন্ন পর্যায় ও কর্মকান্ডের বর্ণণায় অভিন্নতা রয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কুর'আন দাওয়াতের অনেক বিষয় বিস্তারিতভাবে আমাদের সামনে এমভাবে তুলে ধরেছে যে, এ বিষয়ে একটি সঠিক চিত্র পাওয়া যায়। কুর'আন প্রয়োজনীয় অনেক কিছু সুস্পষ্ট ও সঠিকভাবে উপস্থাপন করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মিথ্যা বিশ্বাস, মূর্তিপূজা, নাস্তিক্যবাদ, ইহুদীবাদ, জাদুবিদ্যা, গোত্রবাদকে আক্রমণ করেছিলেন। কন্যা সন্তান জীবন্ত পুতে ফেলা, ঊসীলা হিসেবে মাদী উট চারণভূমিতে ছেড়ে দেওয়া, কোন প্রানীর জমজ বাচ্চা হলে মুর্তির উদ্দেশ্যে কোরবানী দেওয়া, শরনিক্ষেপ করা ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলে তিনি (সাঃ) তাদের ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে আক্রমণ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তাদের নাম উল্লেখ করে বর্ণণা দেন ও দাওয়াতের ব্যাপারে তাদের ষড়যন্ত্র উন্মোচন করেন। দলটিকে অবশ্যই এগুলো গ্রহণ করতে হবে। গ্রহণের সময় কাজের মৌলিকতা এবং এর সাধারণ অর্থের দিকে খেয়াল খেয়াল করতে হবে, বিস্তারিতভাবে উপকরণ বা ধরণ নয় । সেকারণে দলটি ভুল চিন্তা, অসঠিক ধারণা ও ইসলাম বিরোধী ঐতিহ্য ও রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ করবে। এটা শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, তাদের মুখোশ ও ষড়যন্ত্র উন্মোচন করবে, ইসলামের চিন্তা ও হুকুমসমূহকে পরিষ্কার করে তুলে ধরবে, লোকদের এদিকে আহ্বান করবে ও তাদের জীবনে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমন্ত্রণ জানাবে।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিরস্ত্র ও প্রতিরক্ষাহীন অবস্থায় এগুলো মোকাবেলা করেছেন এবং তখন কোন পক্ষ অবলম্বন করেননি, কারও প্রতি নতজানু হননি এবং কোন আপোষ করেননি। তিনি সব লোভনীয় প্রস্তাব ও হুমকিকে অবজ্ঞা করেছেন এবং ধৈর্য্যের সাথে তার প্রভূর পথের উপর অটল ছিলেন। কুরআন আমাদের এ ব্যাপারে অবহিত করেছে এবং এ কারণে দলটি যখন কাজ করবে তখন এ নির্দেশনা মেনে চলবে।

এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রতি আল্লাহ নাজিল করেনঃ

অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় আয়াত থেকে নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, এর আগে দাওয়াত প্রকাশ্য ছিল না, বরং তা ছিল গোপনীয়-যা প্রকাশ্য দাওয়াতের পূর্বের ধাপ।

এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেনঃ

যাতে আপনি মক্কাবাসী ও পার্শ্ববর্তীদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। (সূরা আল আনআমঃ ৯২)

এ আদেশ মক্কার বাইরে দাওয়াকে বিস্তৃত করবার নির্দেশনা প্রদান করে। পবিত্র কুরআন মুহাজেরীনদের হিজরত ও আনসারদের নুসরাহ-র ব্যাপারে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সুতরাং কুরআন হল প্রথম নির্দেশিকা। মাক্কীযুগে মুসলিমদের বর্ণণার বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছেউদাহরণস্বরূপ, বুখারী কীভাবে নবী (সাঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের সাথে মক্কার মুশরিকরা আচরণ করেছিল -শিরোনামে আলোচনা করেছেন। তিনি খাব্বাব বিন আল আরাতের (রাঃ) হাদীস বর্ণণা করেন, যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে প্রার্থনা করবার অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন, যাতে মুসলিমগন বিজয় লাভ করে। তিনি কুরাইশ নেতাদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দোয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন নবী (সাঃ) কীভাবে তায়েফের লোকদের দ্বারা নির্মম আচরনের শিকার হয়েছিলেন। আমরা হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থেও এরকম বর্ণণা পাই। অতএব আমরা এমন কোন বিষয়ের হুকুম পালন করতে পারি না যার পক্ষে কোন বর্ণনা নেই।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সব সীরাত রচয়িতারা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য যা অন্যান্য চিন্তাবিদদের দ্বারা সমর্থিত।

§ ইবনে ইসহাক (৮৫-১৫২ হিজরী) ‘আল মাগাজী’ (সামরিক অভিযান) নামে একটি বই লিখেন। আয জুহরী তার সর্ম্পকে বলেন, ‘যে ব্যাক্তি মাগাজী (সামরিক অভিযান) সর্ম্পকে জানতে চায় সে যেন ইবনে ইসহাক পড়েন। শাফেঈ তার সর্ম্পকে বলেন, ‘কেউ যদি মাগাজীর উপরে একজন বিশেষজ্ঞ হতে চান তিনি পুরোপুরি মুহম্মদ বিন ইসহাকের উপর নির্ভর করতে পারেন।বুখারী তাকে তার তারিখ গ্রন্থে উল্লেখ করেন।
§ ইবনে সাদ (১৬৮-২৩০ হিজরী) ও তার বই আত তাবাকাত (প্রজন্ম)আল খতীব আল বাগদাদী তার সর্ম্পকে বলেন, ‘আমাদের জন্য মুহম্মদ বিন সাদ একজন বিশ্বাসভাজন লোক। কেননা বর্ণণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকেন বলে তার হাদীসসমূহ বিশ্বাসযোগ্য।ইবনে খাল্লিকান বলেন, ‘তিনি সৎ ও বিশ্বস্ত।ইবনে হাজার তার সর্ম্পকে বলেন, ‘তিনি ছিলেন অন্যতম একজন মহান ও নির্ভরযোগ্য হুফফাজ (যারা হাদীস মুখস্থ করেন) এবং সমালোচক।
§ আত তাবারী (২২৪-৩১০ হিজরী) লিখিত বইয়ের নাম রাসূলগণ ও রাজাদের ইতিহাস’ (তারিখ আর রাসূল ওয়াল মুল্লুক)-যার মাধ্যমে তিনি ইসনাদ(বর্ণণার ধারাবাহিকতা) এর পদ্ধতি বিধৃত করেন। আল খতীব আল বাগদাদী তার সর্ম্পকে বলেন, ‘তিনি সুনান(হাদীস), তাদের বর্ণণার ধারবাহিকতা, জাল হাদীস থেকে সহীহ হাদীস পৃথকীকরণ, লোকদের ইতিহাস ও খবারখবরের বিষয়ে ভাল জ্ঞান রাখতেন।অধিকাংশ হাদীসের ক্ষেত্রে মুহাদ্দীসীনদের পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি তারিখ লিখেন। তিনি হাদীসের একটি বই সংকলন করেন, যার নাম তাহজীবুল আতাহার ওয়া তাফসীল আস সাবিতআন রাসূলুল্লাহি (সাঃ) মিনাল আখবার’ (রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সর্ম্পকিত বর্ণণার পর্যালোচনা এবং প্রামাণিক তথ্যাদির বিস্তারিত আলোচনা)ইবনে আসাকীর এ সর্ম্পকে বলেন, ‘এটি একটি অসাধারণ বই, যেখানে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রত্যেকটি প্রামাণিক হাদীস নিয়ে লিখেছেন।
§ একইভাবে ইবনে কাসীর এবং আয জাহাবীকে হাদীসের উপর বিশেষজ্ঞ ভাবা হয়।

কিছু মুসলিম ভাবে, এখনকার শাসকদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করাই হচ্ছে পরিবর্তনের পদ্ধতি যা অনুসরণ করতে আমরা বাধ্য

তারা দলিল হিসেবে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন না করলে অসৎ শাসকদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অস্ত্রধারণ করবার নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন।

এ অবস্থার প্রতিক্রিয়ায় বলতে চাই যে, অমত পোষণ করলেনও এ ধরনের চিন্তা যারা পোষণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এটুকু বলব যে, আলোচ্য হুকুমের মানাত (যে বাস্তবতার জন্য হুকুমটি এসেছে) বুঝতে পারলে হাদীসটি হৃদয়ঙ্গম করাও সহজতর হবে। এ হাদীসটি মূলত দার ঊল ইসলামের ইমাম এর বিষয়ে- যাকে আইনগতভাবে শরঈ বায়াত দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে তিনি একজন ইমাম হয়েছেন। আর এই ইমাম যে ভূমিকে শাসন করেন তাকে দার ঊল ইসলাম বলা হয়। অর্থাৎ এ ভূমি ইসলাম দ্বারা শাসিত হয় এবং এর নিরাপত্তা কেবলমাত্র মুসলিমদের হাতেই ন্যস্ত। মুসলিমগণ তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য। যদি সে শাসক আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করবার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করেন এবং প্রকাশ্যে কুফর আইন দিয়ে জনগনকে পরিচালনা করতে থাকেন- এমনকি যদি সেটি একটিও হুকুম হয় যে ব্যাপারে সুবহাত দলিলও বা শর দলিলের সাথে সাদৃশ্য খুজে পাওয়া না যায়- তখন প্রয়োজনে মুসলিমদের অস্ত্র ধারণ করে তাকে উৎখাত করতে হবে। নিম্নে বর্ণিত এ হাদীসটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এটি বর্ণণা করেছেন আউফ বিন মালিক আল আসযায়ী, যিনি বলেনঃ

আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, ‘শাসকদের মধ্যে তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ যাদের তোমরা ভালবাস ও যারা তোমাদের ভালবাসে; যাদের জন্য তোমরা প্রার্থনা কর ও যারা তোমাদের জন্য প্রার্থনা করে এবং সবচেয়ে মন্দ শাসক হল তারাই যাদের তোমরা অভিশাপ দাও ও যারা তোমাদের অভিশাপ দেয়।তারা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লা! আমরা কি তরবারীর বলে তাদেরকে অপসারন করব না?’ তিনি বললেনঃ না। যতক্ষন পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত কায়েম রাখবে। (মুসলিম)

এখানে সালাত কায়েম করা বলতে পুরো শরীয়া বাস্তবায়নকেই বুঝায়- ‘বাব তাসমিয়াতুল কুল বি ইসমিল জুঝা’ (একটি অংশ বুঝানোর মাধ্যমে পুরো জিনিসটিকে বুঝানো)

দার উল কুফরের শাসকদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। সে শাসক মুসলিমদের ইমাম নয়। কারণ সে শরীয়াহ পদ্ধতি অনুসারে শাসক হিসেবে আসীন হয়নি। বাধ্যবাধকতা হওয়া সত্ত্বেও সে কখনোই ইসলামী আইন তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করবার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেনি।

যখন আমরা বাস্তবতার দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি এখন পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় অস্ত্র ধারণ করা যথেষ্ট নয়। এটা এখন কেবল শাসকদের পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ইসলাম দ্বারা শাসন করার বিষয়। সুতরাং কে এই দায়িত্ব পালন করবে? এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ ব্যক্তি ও একটি ইসলামী রাজনৈতিক মাধ্যম। ইসলাম দিয়ে শাসন করবার বিষয়টি এত সহজ নয় যে, এ দায়িত্ব কোন সেনাপ্রধান বহন করতে পারবেন, তিনি সামরিক দিক দিয়ে অত্যন্ত দক্ষ হলেও ও ইসলামের দিক দিয়ে আন্তরিক হলেও। এর জন্য দরকার অভিজ্ঞতা, উপলদ্ধি, উদ্বুদ্ধকরণ এবং স্বাতন্ত্রমন্ডিত শরীয়াহর জ্ঞান।

কেবল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতি নীচের সব কিছু নিশ্চিত করেঃ

§ ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের আগে আসাধারণ মুসলিম রাজনীতিবিদ ও নেতৃত্ব সৃষ্টি করা, যাদের রয়েছে দীর্ঘদিনের দাওয়াতের অভিজ্ঞতা। যিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে অপরাজেয় থাকবার জন্য কূটকৌশল ও সুক্ষ্ণ চিন্তার অধিকারী হয়ে উঠেন। তখন তিনি রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করবার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবেন ও বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে পথপ্রদর্শক ও পথপ্রদর্শিত, নব্যুয়তের আদলে খোলাফায়ে রাশেদীন হিসেবে পরিগণিত করতে পারবেন।
§ এ পদ্ধতি আন্তরিক শাবাব তৈরি করে যারা রাষ্ট্র কায়েমের আগে দাওয়াতের বোঝা বহন করবে। দাওয়াতের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল অন্যান্য মুসলিমদের সাথে নিয়ে এই ইসলামী রাজনৈতিক মাধ্যম (Islamic political medium) থেকে এমন লোক তৈরি করবে যাদের মধ্য থেকে ওয়ালী (গভর্ণর), আমীরুল জিহাদ, প্রতিনিধি এবং অন্য রাষ্ট্রে ইসলাম নিয়ে যাবে এমন দাওয়াত বহনকারী হবেন।
§ এটা এমন জনপ্রিয় ভিত্তি তৈরি করবে যারা ইসলাম ও রাষ্ট্রকে গ্রহণ (embrace) করবে এবং রক্ষা করবে।
§ এটা সুপ্রশিক্ষিত ক্ষমতাধর লোক তৈরি করবে। সাধারণ জনগন বিরুদ্ধাচরণ না করে তাদের সাথে থেকে শক্তি বৃদ্ধি করবে। কেননা তারা (জনগন) বুঝতে পারবে শাসক, শাসনযন্ত্র এবং যে ক্ষমতার উপর তারা (শাসক) নির্ভর করে তা তাদের (জনগন) জন্য একটি শক্তি এবং এ এমন এক দায়িত্ব যা ইসলাম প্রয়োগ ও দ্বীনকে বুলন্দ করবার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্দেশ।

তাছাড়া সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য দরকার টাকা, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ। এটা আন্দোলনের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে যাবে- যা অন্যদের উপর নির্ভরশীল হতে প্ররোচিত করবে। এটাই ব্যর্থতার প্রথম সোপান। মুসলিমগন এ পথে প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং নিজেদের অনেক ক্ষতিসাধন করেছে। এটা আর উল্লেখের প্রয়োজন নেই যে, চেষ্টা করে দেখা যাক’ (“try out”) একটি ভ্রমাত্বক অভিব্যক্তি।

যখন আমরা বলি অস্ত্রধারণ করা শরঈ পদ্ধতি নয়, তখন মোটেও সেইসব শাসকদের ছাড় দেয়া হয় না যারা মুসলিমদের তোয়াক্কা করে না। বরং আমরা দ্বীনের ভেতর কিছু আন্তরিক ভাইদের তাদের বর্তমান কাজকে পরিত্যাগ করতে বলি যাতে তাদের প্রচেষ্টাকে শরীয়াহ কাজে একীভূত করতে পারি। আমরা তাদের মাক্কীযুগে কিছু সাহাবীর অস্ত্র ধারণ করা বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিষেধাজ্ঞা মনে করিয়ে দিতে চাই, যখন তিনি (সাঃ) বলেছিলেন,

আমি ক্ষমা করবার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, সুতরাং যুদ্ধ করো না। (সীরাত ইবনে হিশা)

এছাড়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুআনে নাজিল করেনঃ

তুমি কি সেসব লোককে দেখনি, যাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখ, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দিতে থাক? অতঃপর যখন তাদের প্রতি জিহাদের নির্দেশ দেয়া হল...’ (সূরা আন নিসাঃ ৭৭)

একইভাবে আমরা আরও শক্তিশালী শরঈ দলিল দেখাতে পারব যার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে বলা সম্ভব যে, দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এর সাথে কোন কিছু যুক্ত করা, বাদ দেয়া, পরিবর্তন করা, সংশোধন দাওয়াত, দল ও ইসলামিক উম্মাহের উপর কুপ্রভাব ফেলবে। নবী (সাঃ) এর সুন্নাহকে পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের জন্য এ কারণে শরীর সঠিক অধ্যয়ন ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতির আনুগত্য করার উপর আমরা গুরুত্ব আরোপ করতে চাই। এটা কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য যিনি আমাদের সঠিক পথ দেখান।

30.11.13

Q&A: Vaccinations and the Shari'ah Rule on them

Question:

Assalam Alaikum Wa Rahmatullah Wa Barakaatuhu

To the honourable scholar Ata Bin Khalil Abu Al-Rashta, the Ameer of Hizb ut Tahrir may Allah safeguard and look after him. I direct the following to you:

I am Chechen; I have lived in Belgium for 14 years where the majority of the Chechen Community resides. Recently there has been a lot of talk and queries regarding children's vaccination in Islam, i.e. vaccination against measles, polio, hepatitis, mumps, tuberculosis, and other forms of vaccinations. There is a big anti-vaccination movement here; their reasons they say are due to the side effects after taking the vaccine, which are growing steadily. In their view, this is a harm that we are not allowed to subject our healthy children to; and taking medicine to be cured is not obligatory, so taking it for prevention from the disease is no doubt of a lesser degree. They say that vaccination is the transfer of microbes into the child's body which is prohibited in addition to the fact that the vaccines are taken from animals like monkeys as an example.

Your Sister in the Aqeedah, Medinat Yuziva.

(The end of their view).

The question is: What is the reality of vaccination and what is the Shar' ruling on it? And will vaccination with all its different types be available in the Khilafah State?

Half of the Muslim community here does not vaccinate their children and their number is rising.

It has become the obvious and strong Hukm Shari' (Islamic ruling) which has become unavoidable, can you please give answer with as much clarity and details as you can. Jazak Allah Khair from us and the Muslims.

By Sadiq Ali

Answer:

Wa Alaikumu as-Salaam wa Rahmatullah wa Barakatuhu

Vaccination is a medicine, to seek medicine is recommended not obligatory; the evidences for this are:

1.      Narrated by Bukhari from Abu Huraira that he said that the Prophet (saw) said:

"Allah has not sent down a disease except that He has also sent down its cure."

Muslim narrated from Jabir Ibn Abdullah from the Prophet that he said:

"Every illness has a cure, and when the proper cure is applied to the disease, it ends it, by the permission of Allah Azza wa Jal."

Narrated by Ahmad in his Musnad from Abdullah Ibn Mas'ood:

"Allah has not sent down a disease except that He also sent down its cure; whoever knows it (the cure), knows it, and whoever is unaware of it (the cure), he is unaware of it"

These hadiths contain instructions; for every disease there is medicine that cures it; this is an encouragement to seek medicine that can cure the disease by the permission of Allah (swt); it is an instruction and not an obligation.

2.      Ahmad narrated from Anas that the Prophet (saw) said:

"There is no disease that Allah has created except that He also has created its remedy, so seek medicine."

Abu Dawoud narrated from Usama Ibn Shareek that he said: I approached the Prophet (saw) and his companions, they appeared as if they had birds sitting on their heads, I extended my greetings and sat down, then many Bedouins came from here and there and asked: 'O Messenger of Allah, should we seek medicine?' He said: "Yes, O slaves of Allah! seek medicine, for Allah has not created a disease except that he has also created its cure, except for one illness.' They said: 'And what is that?' He said: 'Al-Haram' [death]" i.e. except for death.

In the first hadith, he (saw) commanded to seek medication and in this hadith his answer to the Bedouins was to seek medicine for Allah did not send a disease except that He sends the cure. The speech in both hadiths came in the command format which means a general order and not an obligation; unless the subject is regarding a definite issue. The definite command requires a Qareena (an indication) to its presence. In both hadith there are no Qareena present that indicates the obligation. In addition there has been narrations of hadiths that indicates the permissibility of not seeking medicine, which negates the indication of the obligation from both hadiths.

Muslim narrated from Imran Ibn Haseen that the Prophet (saw) said:

"Seventy thousand from my Ummah shall enter Jannah without any reckoning" They said: "who are they O Allah's Messenger?" He said: "They are the ones who do not get themselves branded (cauterized) nor they treat themselves with Ruqqya and they trust in Allah."

Ruqqya and cauterization is a form of medicine.

Bukhari narrated from Ibn Abbas that he said: "This black woman came to the Prophet (saw) and said: "I have (epileptic) seizures and I get exposed, so supplicate to Allah for me." He (saw) said: "If you wish, be patient and you will attain Jannah; or if you wish, I will ask Allah to cure you." She replied: "I will be patient! But my body gets exposed (because of the fall), so supplicate to Allah for me that I do not become exposed." and he (saw) made supplication for her."

These two hadiths indicate the permissibility of not seeking medication.

This explains all of the issue:

To "seek medicine" is not an obligation, therefore it is either permissible or recommended. The extent of encouragement by the Prophet (saw) to seek medication makes the command of seeking medicine that is mentioned in the hadith recommended. Therefore the ruling on vaccination is that it is recommended, because vaccination is a medicine; to seek the cure is recommended. Except in the case when it is proven that a specific type of vaccine is harmful, e.g. its ingredients are expired or is harmful for some reason, then vaccination in this situation it is prohibited according to the principle of harm that was mentioned in the hadith of the Prophet (saw) that was extracted by Ahmad in his Musnad from Ibn Abbas that the Prophet (saw) said:

"There should be neither harming, nor reciprocating harm." Other than that, these cases are rare.

As for the Khilafah State, there will be vaccinations against diseases available as is required, for instance, the contagious diseases and so on. The medicine would be free from any impurities. Allah (swt) is Ash-Shafi (grants the cure),

"And when I am ill, it is He who gives me the cure" (Ash-shu'ara: 80)

What is known from the Shari’ah is that health care is an obligation on the Khaleefah in his role of looking after the affairs of the people, and according to the saying of the Prophet (saw):

"The Imam is a Shepherd and he is responsible for those under his care." Extracted by Bukhari from Abdullah Ibn Umar; it is a general text regarding the responsibility of the state to show that health and medical care are the obligation of the state in its role to look after the affairs of the people.

There is also specific evidence regarding health and medical care: Muslim extracted from Jaber that he said:

"The Prophet (saw) sent a physician to Ubai Ibn Ka'b, he cut one vein from him then he cauterized over it."

Al-Hakim extracted in Al Mustadrak from Zaid Ibn Aslam from his father he said:

"I suffered a severe illness during the time of Umar Ibn Al khatab, he sent me a physician who gave me a strict diet, I used to suck on the date stone."

The Prophet (saw) in his capacity as a leader sent a doctor to Ubai and Umar (ra) the second rightly guided Khaleefah also sent a doctor to Aslam to provide him with medication. They are both evidences that health and medical care are from the basic needs of welfare that the state is obliged to provide for free to those under its care.

Your brother,

Ata Bin Khalil Abu Al- Rashtah

15 Muharram 1435 AH

18/11/2013 CE

Or,

See this Link:

Q&A: Vaccinations and the Shari'ah Rule on them

http://khilafah.com/index.php/concepts/islamic-culture/17467-qaa-vaccinations-and-the-shariah-rule-on-them

Q&A: The Ruling on dealing with Islamic Banks specifically the Issue of Profit Sales (murabaha)

Question:

Assalaamu Alaikum wa Rahmatullah wa Barakatuhu

Our esteemed Sheikh, I would like to request from you that you clarify the hukm (ruling) on dealing with Islamic banks, specifically the issue of profit sales (murabaha) such as buying a car or house through the Islamic bank. I know that it is haram but when I give advice to someone regarding this I cannot explain the matter in details. I would like to give an example from our reality that people say it resembles the Islamic Bank in how they deal... where we reside you can make an agreement with the building companies to build a complete house for you in payment installments (checks) while they contract welders, carpenters, cement...etc. for a specific rate for the materials (e.g.15%), and while they do not own the house, is there any difference between this transaction and that?

From Hasan S. Al-Tarda

Answer:

Wa Alaikumu Assalaam wa Rahmatullah wa Barakaatuhu

1.    Islamic banks transactions which are called profit sales are transactions contradictory to the Shari', as highlighted in the following:

First: The bank conducts the contract of sale with the buyer before it buys the car or refrigerator. The Prophet (saw) prohibited selling of that which you do not own, from Hakeem Ibn Hizam, said:

I said: "O Messenger of Allah, a man comes to me to buy (a product), but I do not have what he asks for, I sell it to him later from the market". He (saw) said: "Do not sell that which you do not own". [Narrated by Ahmad]

This man asked the Prophet (saw) about the buyer who comes to buy a product from him which he does not have, so he goes to the market and buys it then sells it to him.

The Prophet (saw) prohibited him from this unless the product is with him and he presents it to the buyer, if the buyer wishes to purchase or not.

To elaborate further: The one who asks the bank for a financial loan, he will be questioned by the bank for the reasons for borrowing the loan or money. The borrower will say that it is to buy a refrigerator or car or washing machine, the bank will conduct the deal with him to buy the product for him and then sells it to him in installments for a certain price.

This agreement becomes binding even before the bank purchases the refrigerator for the person; the person cannot back down from buying the refrigerator from the bank, because the agreement with the bank has taken place before the product became the possession of the bank, the contract is conducted before the bank owns the refrigerator.

It is incorrect to say that the bank sells the product to the buyer after the bank have bought it, because the contract between the bank and the buyer was conducted on a binding basis before the bank purchases the product with the proof that the buyer cannot refuse to buy it after it has been purchased by the bank for him, because the contract was conducted on a binding basis before the bank have purchased the product.

If the bank had a warehouse with products e.g. refrigerators inside and it showcases them for the person then he chooses to buy or not just like with any other sellers, then the sale in cash or in installments is permitted.

Second: It is not permitted to increase the value of the installments if the buyer delays the payment of one installment, i.e. the value of the debt increases; because this is Riba and it is called accrued interest (riba an-nassi'a) and this was practiced during the Jahiliya time if the time for payment arrived and the debtor was unable to re-pay due to the assigned date and the increase in debt which Islam came to prohibit absolutely, and granted the debtor who is facing hardship no increase in the value of the debt

"And if someone is in hardship, then [let there be] postponement until [a time of] ease. But if you give [from your right as] charity, then it is better for you, if you only knew" (Al-Baqara: 280)

According to what is mentioned above, this transaction with the bank is not allowed.

2.    As for what you have mentioned in terms of contractors, the situation is different. There is no contract of sale for a house which is not owned by the contractor, the situation is that the land owner makes an agreement with the contractor for a leasing contract to build the house according to the criteria for a wage that the house owner gives to the contractor in installments to finish the job, it is not a contract of sale for a house in the air that is not owned by anyone.

If the reality is that it is the selling of a flat which is not built yet and the contactor does not have a correct ownership of it then the sale is not permitted.

Your brother,

Ata Bin Khalil Abu Al-Rashtah

24 Rajab1434 AH

3 June 2013 CE

Or,

See this Link:

Q&A: The Ruling on dealing with Islamic Banks specifically the Issue of Profit Sales (murabaha)
http://khilafah.com/index.php/the-khilafah/economy/17482-qaa-the-ruling-on-dealing-with-islamic-banks-specifically-the-issue-of-profit-sales-murabaha