31.8.14

সাম্রাজ্যবাদের নয়া শোষনের হাতিয়ার টিকফা এবং ইসলামের বক্তব্য

১৭ জুন, ২০১৩ হাসিনা কর্তৃক মন্ত্রীপরিষদ সভায় টিকফার খসড়া অনুমদিত হয়। ২২ মে, ২০১৩ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মণি বিশদ বর্ণনা ছাড়াই এক প্রেস কনফারেন্সে টিকফার পক্ষে ওকালতি করে দাবি করেন, এই চুক্তি ঢাকা এবং ওয়াশিংটন উভয়ের জন্য লাভজনক হবে। উক্ত প্রবন্ধে আমরা টিকফা চুক্তিকে ব্যাখ্যা করবো জাতীয় স্বার্থ এবং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে।

টিকফা কি?

টিকফা শব্দটি নতুন, যার পূর্ববর্তী নাম ছিল টিফা (Trade and Investment Framework), সংক্ষেপে TIFA যার বাংলা হলো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাঠামোগত সমঝোতা। টিফা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এক দশকেরও অধিককাল থেকে। চুক্তির খসড়া প্রণয়েনের কাজ শুরু হয় ২০০১ সালে। ১৩ টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা সম্বলিত চুক্তিটির প্রথম খসড়া প্রস্তুত হয় ২০০২ সালে। পরে আবার সংশোধিত হয় ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে। কিন্তু সচেতন মানুষের ও আদর্শিক রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিবাদের মুখে চুক্তিটি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে উম্মাহকে ধোকা দেওয়ার জন্য Co-operation শব্দটি যোগ করে নাম দেয়া হয় TICFA বা Trade and Investment Co-operation Framework Agreement.

টিকফার উদ্দেশ্য

চুক্তিটি মার্কিন সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের। চুক্তির প্রতিটি ধারা-উপধারা মার্কিনীদের তৈরী, যেহেতু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রশ্নাতীত এবং এই অসমতা পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতেও দেখা যাচ্ছে না। তাই বলা যায়, চুক্তিটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কোরবানী করবে।

টিকফার পরিণতি

চুক্তিটি শুরু থেকে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। ২০০৫ সালে চুক্তির কিছু অংশ ফাঁস হয়, যা থেকে উক্ত চুক্তি সম্পর্কে জানা যায়, যা অন্যান্য দেশের সাথে মার্কিনিদের সম্পাদিত চুক্তির অনুরূপ। তবে চুক্তিগুলোর মুল ভাবনা একই। চুক্তির খসড়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে বাজার উন্মুক্তকরণ এবং সেবা খাতের ঢালাও বেসরকারিকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক খাতসমূহকে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীর স্বার্থ সংরক্ষনের সুস্পষ্ট রূপরেখা বলে প্রতিমিত।

চুক্তির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, উভয় রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য উদারনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে। বেসরকারী খাতের বিকাশের জন্য উভয় দেশে উচ্চ পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত “বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশন” বেসরকারী খাতের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল ও পরামর্শ সরবরাহ করবে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু সেবা খাতের কথা উল্লেখ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শুধুমাত্র সেবা খাতেই বিনিয়োগ করবে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানীর জন্য সকল প্রকার শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করতে বাধ্য থাকবে। দেশীয় শিল্প সংরক্ষনের জন্য কোন প্রকার সুবিধা দেওয়া যাবে না। ১৯৮৬ সালে সম্পাদিত “দ্বিপাক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি” অনুযায়ী মার্কিন বিনিয়োগের পুঁজি ও মুনাফার উপর কোন প্রকার কর আরোপ করা যাবে না এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বিনিয়োগের বিশেষ সুরক্ষাসহ দেশের সেবা খাতকে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। কৃষিখাতের সকল প্রকার ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে। মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন এই চুক্তির এক উল্লেখযোগ্য দিক। মেধাস্বত্ব আইন পুঁজিবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শোষনের হাতিয়ার, এই আইনের আওতায় পুঁজিবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলি অতিরিক্ত মুনাফা লুন্ঠনের আইনি বৈধতা পাবে। উন্নত প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি এবং জীবন রক্ষাকারী ঔষধ প্রস্তুতের জ্ঞানকে কুক্ষিগত করে চুক্তিভুক্ত দেশকে তাদের পণ্যের বাজারে পরিণত করবে। দোহা ঘোষণা ২০০০ অনুযায়ী বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বাণিজ্যবিষয়ক মেধাস্বত্ব চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ২০১৩ পর্যন্ত পণ্য ও সেবা এবং ২০১৬ পর্যন্ত মেধাস্বত্ব বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পেয়েছে। যে সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে ছোট বড় অনেক ঔষধ শিল্প। টিকফার ফলে বিকাশমান বাংলাদেশের ঔষধ শিল্পসমূহ বিপদের সম্মুখীন হবে, কারণ তাদের উৎপাদন মূল্য ছাড়াও প্রদান করতে হবে পেটেন্ট চার্জ।

টিকফা কি শ্রমিক বান্ধব?

টিকফাতে শ্রমের মান, মানবাধিকার, শ্রমজীবীদের অধিকার ও পরিবেশগত বিষয় উল্লেখ থাকলেও এর উদ্দেশ্য শ্রমজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নয় বরং এটা একপ্রকার নন-ট্যারিফ (অশুল্ক) বাধা যা যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করবে বাংলাদেশের রফতানি নিয়ন্ত্রণে। কয়েক শতাব্দী ধরে বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিক শাসন চালিয়ে, নিজ দেশে অমানবিক শ্রম-শোষণ চালিয়ে তারা আজ ধনী রাষ্ট্র। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পর দেশগুলো যখন উন্নতিতে সচেষ্ট, তখন তারা তাদের ইচ্ছেমত শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে শিল্প উন্নতিকে দাবিয়ে রাখার জন্য। এ যেন হাত-পা খোলা মোটা তাজা মানুষ কর্তৃক পেছনে বাধা অনাহারী মানুষকে সমানে সমানে কুস্তি প্রতিযোগিতার আহবান।

টিকফাতে পণ্য ও পুঁজির অবাধ চলাচলের কথা বলা হলেও শ্রমশক্তির যাতায়াতের সুযোগ নাই। শ্রমশক্তিই বাংলাদেশের মত স্বল্প উন্নত দেশগুলোর মূল সম্পদ। শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের “খোলা বাজার নীতি” প্রয়োগে অনীহা, যদিও এক্ষেত্রে স্বল্প উন্নত দেশগুলোর রয়েছে আপেক্ষিক সুবিধা। যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র ঐ সকল ক্ষেত্রেই “খোলা বাজার নীতি” প্রয়োগ করতে চায় যেখানে রয়েছে তার সুবিধা। উল্লেখ্য, টিকফাতে শুল্ক বহির্ভূত বাধা দূর করার কথা বলা হলেও শুল্ক বাধার বিষয়ে কিছু বলা হয় নাই। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত পোশাক শিল্পের পণ্যের ক্ষেত্রে, গড় আন্তর্জাতিক শুল্ক বাধা ১২%, যুক্তরাষ্ট্রে তা ১৯%।

টিকফা কী বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়াবে? বাংলাদেশের পণ্য রফতানী বাড়াবে?

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে টিকফা বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করবে, বাড়াবে পণ্যের রফতানী। চীন ও ভারত তার রফতানীর যথাক্রমে ২১% ও ১৯% পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে করলেও টিকফাতে স্বাক্ষর করে নাই। অর্থাৎ টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির কোন সম্পর্ক নাই। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রফতানির প্রধান বাধা শুল্ক বাধা। বর্তমানে বাংলাদেশের পোষাক রফতানিকারকদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১৫.৩% শুল্ক দিতে হয়, যদিও টিকফায় স্বাক্ষর না করে চীনকে পরিশোধ করতে হয় ৩%। যদিও তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের লোভ দেখিয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য এদেশের উপর চাপ দিচ্ছে, কিন্তু টিকফা এগ্রিমেন্টে এরকম কোন Provision নাই। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের অশুল্ক বাধা সামান্যই।

যুক্তরাষ্ট্র কেন এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য এত আগ্রহী?

পুঁজীবাদী রাষ্ট্র হিসাবে মার্কিনিদের যে কোন কাজের উদ্দেশ্য থাকে মুনাফা। আবার আদর্শিক রাষ্ট্র হিসাবে মার্কিনীদের রয়েছে আদর্শিক শত্রু। টিকফার কারণ ২ টি।

§  প্রথমত, আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে সহযোগিতার ছদ্মাবরণেঃ আধিপত্য বিস্তারের জন্যই আমেরিকা সহযোগিতার ছদ্মাবরণে টিফা বা টিকফার মত দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো করার চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্যেই পাকিস্তান, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ইরাক, উরুগুয়েসহ বিশ্বের ৩০ টিরও বেশি দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই টিফা চুক্তি সাক্ষর করেছে।

§  দ্বিতীয়তঃ আমেরিকা খুব ভালভাবে উপলদ্ধি করছে খিলাফত অতি সন্নিকটে, তারা কোনভাবে উম্মার ইসলামের আকাংখাকে দমাতে পারবেনা, তাই মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণ করতে টিকফার মত চুক্তি করতে মরিয়া

জি.এস.পি সুবিধার পাবার প্রশ্নের সাথে কি টিকফা চুক্তি যুক্ত?

ঢাকায় নিয়োজিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা গত ২৮ জুলাই আবারো এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, Òটিকফা চুক্তি সই না করলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে না।” টিকফা চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে দরকষাকষিকে অস্বস্তিকর বিষয় উল্লেখ করে তিনি জানতে চান, Òএতে খারাপ কী আছে? আমি তো খারাপ কিছু দেখছি না।Ó টিকফার সাথে জি.এস.পি সুবিধার কোন সম্পর্ক নেই। দোহা নীতি অনুসারে আমেরিকা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ৯৭% পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার কথা, যেটাকে সাধারণভাবে জি.এস.পি সুবিধা বলা হয়। আমেরিকা ঠিকই বাংলাদেশের ৯৭% পণ্যের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দিয়েছে, তবে তাতে ঐসব পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যার রপ্তানির পরিমান খুবই কম। সেই সব পণ্যের জন্য জি.এস.পি সুবিধা থাকা আর না সমান কথা। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য, তৈরি-পোশাককে এর বাইরে রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যে গার্মেন্টস পণ্য রফতানি হয়, তার ওপর উচ্চহারে শুল্ক বসিয়ে রেখেছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের গড় আমদানি শুল্ক হার শতকরা ১ ভাগের মতো। কিন্তু বাংলাদেশের গার্মেন্টসের ওপর শুল্কহার শতকরা গড়ে ১৫ ভাগ। এই শুল্ক হার আন্তর্জাতিক বিধিরও পরিপন্থী। এই শুল্ক এমনিতেই বাতিল হওয়া দরকার। এবছরও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক বাবদ প্রদান করেছে প্রায় ৫৬০০ কোটি টাকা। এটা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে ঋণ অনুদান নানাভাবে বাংলাদেশে আসে তার ৬ গুণেরও বেশি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে নয়, বাংলাদেশই যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থের যোগান দিচ্ছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে টিকফা

চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে এই চুক্তির আওতায় গঠিত ফোরামে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সকল বিষয় নির্ধারিত হবে। অক্সিডেন্টাল কর্তৃক বাংলাদেশের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের গ্যাস সম্পদ পুঁড়িয়ে নষ্ট করার অপরাধের মতো বিভিন্ন অপরাধ যখন বিভিন্ন মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানী কর্তৃক সংঘটিত হবে, তখন এই ফোরাম উম্মাহর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে, মার্কিন কোম্পানীর স্বার্থকে সুরক্ষা করবে। মুসলিমরা কাফির রাষ্ট্রের অধীনস্থ হয় এবং মুসলিম ভুমির উপর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, এমন কোন চুক্তির অনুমোদন কুর’আন এবং সুন্নাহ’র মধ্যে নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেনঃ

“... এবং মু’মিনদের উপর কাফিরদের আধিপত্য আল্লাহ কিছুতেই মেনে নেবেন না।” [সূরা আন-নিসাঃ ১৪১]

ইসলামের দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক চুক্তি অবশ্যই এমনভাবে সম্পাদন করতে হবে যাতে তা ইসলামের শক্তি ও উম্মাহর স্বার্থকে আরও সম্প্রসারিত করে। যেসব চুক্তি কাফিরদের শক্তিশালী করে, তা আমাদের জন্য হারাম। আর দেশটি যদি হয় ক্রুসেডার আমেরিকা, যে ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত, তাহলেতো চুক্তির প্রশ্নই আসেনা। সুতরাং, ইসলামের দৃষ্টিতে টিকফা একটি হারাম চুক্তি এবং একে প্রত্যাখ্যান করা মুসলিমদের ঈমানী দায়িত্ব।

আওয়ামী-বিএনপির নেতৃত্ব ক্ষমতালোভী এবং ঘৃণ্য চরিত্রের, ক্ষমতার জন্য এরা যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত, এমনকি খুনী মার্কিন সরকার, যাদের হাতের প্রতিটি লোমকুপ নিরাপরাধ মুসলিমদের রক্তে সিক্ত, তাদের সাথে হাত মেলাতেও প্রস্তুত। শুধুমাত্র টিকফা চুক্তি প্রত্যাখ্যানই যথেষ্ট নয় বরং তার সাথে বর্তমান দূর্নীতিগ্রস্থ শাসকশ্রেণীকে প্রত্যাখ্যান এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণেই রয়েছে প্রকৃত সমাধান, কারণ একমাত্র কুর’আন এবং সুন্নাহ দ্বারা পরিচালিত খিলাফত রাষ্ট্রের নিষ্ঠাবান নেতৃত্বই মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ সংরক্ষণ করবে।


৩.০৭.২০১৩

Nussrah: The Shara’i method to assume authority for the establishment of Khilafah

Coming Soon… Keep an eye on it!

22.8.14

প্রশ্নোত্তরঃ চীনকে মোকাবিলার জন্য ভারতের নীতিতে আমেরিকার প্রভাব

প্রশ্নঃ

০৭.০৪.২০১৪ তারিখে ভারতে সাধারণ নির্বাচন শুরু হয়েছে যা ১২.০৫.২০১৪ তারিখ পর্যন্ত চলবে এবং এর ফলাফল ১৬.০৫.২০১৪ তারিখে ঘোষণা করা হবে। এই নির্বাচনে দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যার একটি হচ্ছে আমেরিকাপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টি ও তার সাথে শরীক দলসমূহ এবং অপরটি হচ্ছে বৃটেনপন্থী কংগ্রেস পার্টি, যেটা ২০০৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বৃটেনের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে ও চীনকে মোকাবিলার ভীতির কারণে আমেরিকার সাথে নিষ্ক্রিয় সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে... প্রশ্ন হচ্ছে যে, চীনকে মোকাবিলার জন্য ভারতের নীতিতে আমেরিকার কি ধরণের প্রভাব থাকবে? এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে আমেরিকার পরিকল্পনার সাথে এর সম্পর্ক কি এবং এই দ্বন্দ্বের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানকে অন্তর্ভূক্ত করার কি উদ্দেশ্য রয়েছে? এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কি বিজেপি কিংবা কংগ্রেস পার্টির বিজয় দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে? ভারতের কি চীনকে মোকাবিলার সামর্থ্য রয়েছে? চীন এবং ভারতের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কেমন?

উত্তরঃ

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নলিখিত বিষয়গুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে পরিষ্কার হবেঃ

১. চীনকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র সুনির্দিষ্টভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আওতাধীন পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের তীরবর্তী দেশগুলোর মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। এই লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে বিভিন্ন ধরণের জোট ও অংশীদারিত্বমূলক মৈত্রি বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সম্পর্ক জোরদার করে চলেছে। এক দশকেরও অধিক সময় পূর্বে আমেরিকা এটা গুরুত্ব সহকারে শুরু করেছিল, কারণ সে অনুধাবন করতে পেরেছিল যে চীনকে নিয়ন্ত্রণের নীতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছে কিংবা স্থবিরতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর অর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র চীনের উপর পূর্বাপেক্ষা অধিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে না। এটা আরো প্রকট হয় যখন দেখা যায় যে, আমেরিকা চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগদানের আমন্ত্রণ জানায়, বাণিজ্যিক সম্পর্কের সম্প্রসারণ ঘটায় এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সংলাপকে আর পূর্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে না...। যাই হোক, চীন আমেরিকার কক্ষপথে আবর্তিত হতে রাজি হয়নি, এমনকি তার নীতির সাথে একমত হতেও সম্মত হয়নি এবং পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের উপর চীনের আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্খাকেও আমেরিকা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজের অখন্ডতা, ঐক্য ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য কিছু অঞ্চলে শুধুমাত্র আর্থিক লাভের জন্য নয় বরং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মানসে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে এবং এই অঞ্চলে তার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা আমেরিকার নীতির সাথে সাংঘর্ষিক কিংবা আমেরিকার প্রভাবকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। চীন এই অঞ্চলের উপর নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চায় এবং এটাকে সে তার নিয়তি মনে করে। চীন নিজের ভৌগলিক সীমারেখার অন্তর্গত অঞ্চলের উপর আধিপত্যকে পর্যাপ্ত মনে করে না এবং সে মনে করে যে কেবল এটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে বৃহৎ একটি রাষ্ট্রের পরিচিতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে... আমেরিকা চীনের সামুদ্রিক এলাকাকে নিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং এই আধিপত্যবাদী মনোভাবের কারণেই আমেরিকা নিজের আঞ্চলিক সীমানায় কর্তৃত্ব স্থাপন করে তৃপ্ত নয় বরং সমগ্র বিশ্বকেই সে তার নিজের এলাকা মনে করে। এজন্যই আমেরিকা আন্তর্জাতিক কর্তৃত্ব সম্প্রসারণের নিমিত্তে চীনের এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়... তাই আমেরিকা বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন ও কৌশলগত সংলাপের মাধ্যমে চীনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এগুলোর কোনটিই চীনকে আমেরিকার কক্ষপথে আবর্তিত করাতে সক্ষম হয়নি; এমনকি জোটের অংশীদারও করতে পারেনি, বরং চীনের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের নীতি আমেরিকাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে; ফলশ্রুতিতে এককভাবে চীনকে নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা আর কার্যকর হচ্ছে না এবং আমেরিকা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে। এজন্যই তার নৌবাহিনীর প্রায় ষাট ভাগ এই অঞ্চলে মোতায়েনের প্রয়োজন হয়েছে। চীনকে বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলার নীতির পাশাপাশি আমেরিকা তার আঞ্চলিক সমস্যাগুলোর মধ্যেও নাক গলানো শুরু করেছে... ... চীনকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে ফেলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য আমেরিকা এই অঞ্চলের দেশগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই দেশগুলোর মধ্যে তিনটি দেশ এই বেষ্টনিকে কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, দেশগুলো হচ্ছেঃ ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া...।

২. ভারতের ক্ষেত্রেঃ চীনের সাথে এই দেশটির প্রায় ৩৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং এদের মধ্যে সীমানা সম্পর্কিত সমস্যা অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। শতাব্দীর সিকিভাগ সময় ধরে তাদের মধ্যে অনেকবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষটি ছিল চতুর্দশতম দ্বি-পাক্ষিক সীমানা নির্ধারণী বৈঠক। অতঃপর তারা বৈঠক স্থগিত করে এবং পঞ্চদশতম বৈঠকটি ১৫.০৪.২০১৩ তারিখের ঘটনার জন্য আর অনুষ্ঠিত হয়নি। উক্ত তারিখে চীনের সামরিক বাহিনী ভারতের সীমানা অতিক্রম করে এবং লাদাখ অঞ্চলের ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করে তাঁবু গেড়ে অবস্থান গ্রহণ করে, কিন্তু তিন সপ্তাহ পরে ঐ এলাকা ছেড়ে চলে আসে। এটা ছিল একটা ক্ষমতার প্রদর্শণী, যার মাধ্যমে চীন ভারতের কাছে একটি বার্তা পৌঁছাতে চেয়েছিল; বার্তাটি হচ্ছে যে, চীন ১৯৬২ সালের অক্টোবরের মত পুনরায় সীমানা অতিক্রম করতে ও যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে। সেই সময়ে চীনের সামরিক বাহিনী অরুণাচল প্রদেশ আক্রমণ করে সেখান থেকে ভারতীয় সেনাদের বিতাড়িত করেছিল। ঐ হামলার এক মাস পরে চীন দ্বিতীয় বারের মতো ভারত আক্রমণ করে এবং প্রায় ২০০০ ভারতীয়কে হত্যা করে। এই ঘটনাটি অমীমাংসিতই থেকে যায় এবং তখন “প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা” প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ব্যাপকভাবে আলোচিত স্থায়ী একটি সমস্যা। ১৯৫০ সালে চীন কর্তৃক দখলকৃত তিব্বত অঞ্চল নিয়ে সমস্যা হতে সৃষ্ট উত্তেজনার পাশাপাশি এটি তাদের মধ্যকার বৈরীতাকে আরো বৃদ্ধি করেছে। তাই এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভারত এই অঞ্চলের বৌদ্ধদেরকে এবং তাদের নেতা দালাইলামাকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে আমেরিকাকে সহযোগিতা করেছে ও নির্বাসিত সরকার হিসেবে দালাইলামার জন্য কেন্দ্রীয় তিব্বত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। এ সকল কারণে ভারত ও চীনের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ...।

৩. চীনকে মোকাবিলা করতে ভারতকে রাজি করানোর জন্য আমেরিকা চীন ও ভারতের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, কিংবা ভারতকে উস্কে দিতে তাদের মধ্যকার সমস্যাগুলোকে খোঁচা দিয়ে আরও প্রকট করে তুলেছিল। এসবের পরও ভারত স্থলপথে চীনকে মোকাবিলা করতে ভয় পায় এবং চীনের আগ্রাসনমূলক আক্রমণাত্মক মনোভাব এই ভীতিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। সেই জন্য চীনের বিরুদ্ধে আগ্রাসী হতে ও সীমান্ত বিষয়ক দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে ভারতকে উৎসাহ প্রদানের জন্য প্রলোভন দেখানো প্রয়োজন ছিল, সুতরাং আমেরিকা ভারতের সাথে একটি কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন করে এবং নিজেদের মধ্যে পরমাণু সহযোগিতামূলক একটি মতৈক্যে পৌঁছায়... সেই সাথে আমেরিকা ভারতের সাথে অনেকগুলো অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর করে। সেই লক্ষ্যে দেশ দুটি ২০০৫ সালে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ২০০৮ সালে একটি বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতামূলক চুক্তিও সম্পাদন করে। এগুলোর সবকিছুই তাদের মধ্যকার নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগিতার দিগন্তকে আরও প্রসারিত করে। ফলশ্রুতিতে দেশ দু’টি বর্তমানে নজিরবিহীন সংখ্যক যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করছে; সেই সাথে ভারতে আমেরিকার তৈরি অস্ত্র বিপুল পরিমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে ...। সুতরাং যখন ভারতের সামরিক বাহিনীর জেনারেল দিপক কাপুর ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ বলেছিল যে, “ভারতের সামরিক বাহিনী একটি দ্বিমুখী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে” (দি ইকোনোমিক, ১৫.০২.২০১০), তখন থেকেই আমেরিকা পাকিস্তানকে চাপ দিয়ে চলেছে, যেন সে ভারতের সাথে তার পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে সৈন্যসংখ্যা হ্রাস করে এবং পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত আফগানিস্তান ও উপজাতীয় এলাকার মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মনোনিবেশ করে। এই সবকিছু করা হচ্ছে যাতে করে ভারত উত্তর ফ্রণ্টে চীনের সাথে যুদ্ধে মনোনিবেশ করতে পারে...। আমেরিকা ভারতের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্যও উদ্যোগ নিয়েছে, কারণ গত ৫ বছরে অন্য যেকোন দেশের তুলনায় ভারতে আমেরিকার রপ্তানির পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের কনফেডারেশনের হিসাব মোতাবেক সেবা খাতে দ্বি-পাক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ আগামী ৬ বছরে ৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে...। যাই হোক, ভারত চীনের সাথে ব্যাপক আকারে স্থলযুদ্ধের বিষয়ে ভীত, সেই সাথে কংগ্রেস পার্টির শাসকেরা আমেরিকার তুলনায় বৃটেনের প্রতি অধিকতর অনুগত এবং তারা আমেরিকার স্বার্থের জন্য চীনের সাথে পরাজয়ের যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে অনিচ্ছুক...!

৪. তাই আমেরিকা ভারতের দৃষ্টি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে নিবদ্ধ করার প্রয়াস চালায় এবং তেল-গ্যাসের লোভ দেখিয়ে আমেরিকার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলের অংশ হিসেবে চীনের সাথে মোকাবিলা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং এই জন্যই চীনের সাথে বিরোধপূর্ণ স্প্র্যাটলি দ্বীপের উপকূলে ভিয়েতনামের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারত তেল-গ্যাসের জন্য খোঁড়াখূড়ি করতে রাজি হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিউ ওয়াইমিন বলেছে যে, “আমরা দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধে বহিঃশক্তির কোন হস্তক্ষেপ দেখতে চাই না এবং আমরা কোন বিদেশী কোম্পানীকে এমন কোন কাজে নিয়োজিত দেখতে চাই না, যা চীনের সার্বভৌমত্ব, অধিকার ও স্বার্থে আঘাত হানতে পারে।” (দি মিডল ইস্ট, ২৮.১১.২০১১)। এর পূর্বে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে দি পিপলস ডেইলী নিউজপেপার ভারত ও ভিয়েতনাম উভয়কেই চীনের সাথে দায়িত্বজ্ঞানহীন দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে অভিযুক্ত করেছে। আমেরিকা ভারতকে এই অঞ্চলে আরও আগ্রাসী হওয়ার জন্য উৎসাহ প্রদান করে আসছে। সেই জন্য ২২.০৭.২০১৩ তারিখে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ বাইডেন ভারত সফরে যায় এবং সেই সফরের পূর্বে ওয়াশিংটনে সে মন্তব্য করেছিল যে, ভারতকে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বে অগ্রসর হতে প্রলুব্ধ করতে হবে। সে বলেছিল, “…..ভারত ক্রমবর্ধমান হারে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ও এর অগ্রবর্তী অঞ্চলে নিজের শক্তি সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের জন্য সুখবর।” সে আরও বলেছে যে, “আমরা ঐ অঞ্চলে ভারতের হস্তক্ষেপ এবং স্থল ও সমুদ্রপথে নতুন বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরীর প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই” (আই.আই.পি ডিজিটাল, ২৩.০৭.২০১৩)। এর এক মাস পূর্বে ২৪.০৬.২০১৩ তারিখে কেরি তার ভারতীয় অংশীদার শ্রী সালমান খুরশীদের সাথে নয়াদিল্লীতে দেখা করেছে এবং মার্কিন-ভারত কৌশলগত সংলাপের চতুর্থ দফা বৈঠকে যুগ্মভাবে সভাপতিত্ব করেছে। সেখানে তারা এশিয়া এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাদের স্বপ্নকে দৃঢ়তাসহকারে পুনর্ব্যক্ত করে। সেই সাথে তারা আঞ্চলিক যোগাযোগকে শক্তিশালী করার বিষয়ে অব্যাহত সহযোগিতার উপর গুরুত্বারোপ করে এবং সমুদ্রযাত্রা বিষয়ক নিরাপত্তার গুরুত্বকে দৃঢ়তাসহকারে পুনর্ব্যক্ত করে...” (আই.আই.পি. ডিজিটাল ২৪.০৬.২০১৩)। এসবকিছু এটাই প্রমাণ করে যে, আমেরিকা ভারতকে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বে ঠেলে দিতে চায়, বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ঘিরে আমেরিকা নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের পরে ভারতের উপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টির পরেও সে গত দু’বছর ধরে আমেরিকার চাহিদা মোতাবেক সাড়া দেয়নি। এর কারণ হচ্ছে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টির বৃটেনের প্রতি আনুগত্য এবং চীনের সাথে যুদ্ধভীতি...।

৫. অষ্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রেঃ আমেরিকা তার নিজের কক্ষপথে আবর্তনকারী অষ্ট্রেলিয়াকে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ করার জন্য কাজ শুরু করেছিল এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনা অনুসারে চীনকে মোকাবিলার জন্য অষ্ট্রেলিয়ার সাথে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। এই জন্য আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে পররাষ্ট্র সচিব হিলারী ক্লিনটন, প্রতিরক্ষা সচিব লিওন প্যানেট্রা এবং প্রাক্তন সেনাপ্রধান মার্টিন ডিম্পসে অষ্ট্রেলিয়ার পার্থ সফরে গিয়েছিল এবং সেখানে তাদের অষ্ট্রেলিয় পক্ষের সাথে আলোচনায় বসেছিল। পার্থে অবস্থিত ওয়েষ্টার্ন অষ্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়ান আমেরিকান সেন্টারের উদ্বোধন দিবসে হিলারী ক্লিনটন বলেছিল যে, “অষ্ট্রেলিয়া হচ্ছে ভারত মহাসাগরের সাথে প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযোগকারী সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানী পরিবহন রুটের প্রবেশদ্বার, অষ্ট্রেলিয়ায় উৎপাদিত জ্বালানী সম্পদ এই রুটগুলোর মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে প্রবাহিত হয়ে থাকে।” সে আরো বলেছে, “এটা বিস্ময়কর নয় যে, বৈদেশিক বিনিয়োগ অষ্ট্রেলিয়াতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যার মধ্যে আমেরিকার বিনিয়োগের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, কারণ এটা বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এবং এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করা হচ্ছে আমেরিকার অন্যতম উদ্দেশ্য, যেটাকে আমরা কখনও কখনও Pivot to Asia’ বলে থাকি...”। সে আরো বলেছে, “আমেরিকা কখনো এশিয়াকে পরিত্যাগ করেনি, আমেরিকা এখনো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরাশক্তি এবং এটা বলবৎ থাকবে।” সে আরও উল্লেখ করে যে, “আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যতের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে আমেরিকার চিন্তাধারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ” (আই.আই.পি. ডিজিটাল, ১১.১৫.২০১২)। এই সেন্টারে হিলারী ক্লিনটন ভারতের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভারতের কাছ থেকে আমেরিকা কি চায় তা উল্লেখ করেছে। ভারতের “Look East” নীতিকে সমর্থন করা আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সে বলেছে যে, “ভবিষ্যতে অষ্ট্রেলিয়া-ভারতের যৌথ নৌ-মহড়াকে আমেরিকা স্বাগত জানায় এবং ২০১৩ সালে অষ্ট্রেলিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে গঠিত ইন্ডিয়ান ওশেন রিম এসোসিয়েসনের সাথে আমেরিকা জোটবদ্ধভাবে কাজ করতে উৎসুক ও আমেরিকা এটাতে ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে যোগদান করেছে” (একই সূত্র)। এই পরিকল্পনাগুলো অঞ্চলটি নিয়ে আমেরিকার চিন্তাধারাকে পরিষ্কার করে। আমেরিকা এই অঞ্চলে চীনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের জন্য অষ্ট্রেলিয়াকে সক্রিয় খেলোয়ার হিসেবে দেখতে চায়। এটা আরো প্রমাণ করে যে, ভারতের মাধ্যমে সে তার উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারেনি। দেশটি স্থলভাগে চীনের প্রতিবেশী এবং আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগরে ভারতের সাথে অষ্ট্রেলিয়াকে কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ করতে চায়। আমেরিকার নীতির সাথে অষ্ট্রেলিয়ার নীতি ভারতের চেয়ে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ পুঁজিবাদকে গ্রহণকারী একটি পশ্চিমাদেশ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর মতই উপনিবেশিকতার মাধ্যমে আধিপত্য করতে আগ্রহী। একারণেই অষ্ট্রেলিয়া যেভাবে বৃটেনের সাথে কাজ করেছে, সেভাবে সাম্রাজ্যবাদের স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকাকে সহযোগিতা করছে এবং অষ্ট্রেলিয়া বৃটেন-আমেরিকা উভয়ের সাথেই সম্পৃক্ত কারণ সে এই দুই দেশের কক্ষপথেই আবর্তিত হয়...।

৬. জাপানের ক্ষেত্রেঃ আমেরিকা জাপানে তার শক্তি বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে এবং চীনের নিয়ন্ত্রণ হতে অঞ্চলটি রক্ষার জন্য জাপানকে আরো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে। ০৬.০৪.২০১৪ তারিখে আমেরিকা ঘোষণা দিয়েছে যে, সে জাপানে অতিরিক্ত মিসাইল প্রতিরক্ষা জাহাজ প্রেরণ করছে এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব চাক হেগেল বলেছে যে, “২০১৭ সালের মধ্যে আমেরিকা জাপানে দুটি অতিরিক্ত এ.ই.জি.আই.এস ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা জাহাজ প্রেরণ করবে এবং এই পদক্ষেপটি হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার নতুন ধরনের পরমাণু পরীক্ষার হুমকির জবাব।” সে চীনকে তার বিপুল ক্ষমতা অপব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, “মহান জাতির কখনো শক্তি প্রয়োগ এবং ভীতি প্রদর্শন করা উচিত নয়, কারণ এগুলো সংঘর্ষের দিকে ধাবিত করে।” সে আরো বলেছে যে, “চীনের নিজস্ব সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সে তার সাথে কথা বলতে চায় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায়” (রয়টার্স, ০৬.০৪.২০১৪)। সে চীনকে সতর্ক করার জন্য রাশিয়ার দিকে ইংগিত করে বলেছে যে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে নিয়ে যা করেছে চীনও জাপানের সাথে বিরোধপূর্ণ দ্বীপ নিয়ে একই ধরনের আচরণ করছে; সে বলেছে যে, “তোমরা সমগ্র বিশ্বে অভিযান পরিচালনা করতে পারনা এবং ভৌগলিক সীমারেখাগুলোকে পূনরায় নির্ধারণ করতে পারনা এবং শক্তি প্রয়োগ, চাপ প্রয়োগ ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রসমূহের আঞ্চলিক অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাহ্য করতে পারনা, সেটা হোক প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট কোন দ্বীপ কিংবা ইউরোপের বড় কোন দেশ।” সে আরো বলেছে যে, “এছাড়াও ... আমি চীনের সাথে তার প্রতিবেশীদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে কথা বলব, শক্তি প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন খুবই মারাত্মক জিনিস, যা শুধুমাত্র সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায়।” গত সপ্তাহে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করেছে। বৈঠকে সে দক্ষিণ চীন সমুদ্র অঞ্চলকে ঘিরে আমেরিকার অধিকতর উদ্বেগের বিষয়ে সতর্ক করেছে (একই সূত্র)। জাপানের কিয়োডো নিউজ ০৫.০৪.২০১৪ তারিখে উল্লেখ করেছে, “এটা খুবই সম্ভাবনাময় যে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব এবং জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইটসুনারী ওনোডেরা সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে জাপানের আত্মরক্ষার অধিকারের বিষয়টি অনুমোদনের জন্য আলোচনা করবে। এর সাথে ওনোডেরা অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি হস্তান্তরের বিষয়েও আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিবের সাথে বৈঠকে আলোচনা করবে এবং উভয়পক্ষ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদির বিষয়ে তাদের পারষ্পরিক সহযোগিতাকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছতে পারে।” এর অর্থ হচ্ছে যে, আমেরিকা চীনের নিয়ন্ত্রণ হতে এ অঞ্চল রক্ষার্থে জাপানকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখতে চায়, যাতে করে তার উপর থেকে বোঝা লাঘব হয় এবং আমেরিকা এজন্যই জাপানীদের মাঝে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটাতে চায়, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জাপানীরা আমেরিকা ব্যতিরেকে স্বাধীনভাবে নিজস্ব ক্ষমতা অর্জনের স্বপ্নকে লালন করবে।

৭. এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমুদ্র অঞ্চলকে ঘিরে আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেস পার্টি কিংবা ভারতীয় জনতা পার্টির বিজয়ের ভূমিকার ক্ষেত্রেঃ সন্দেহ নেই যে এর ভূমিকা রয়েছে, কারণ কংগ্রেস পার্টি হচ্ছে এমন একটি দল যেটা সুদীর্ঘ সময় ধরে বৃটেনের প্রতি অনুগত। এর রাজনৈতিক বুদ্ধি বিবেচনা ওল্ড লেডি বৃটেনের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এজন্য কংগ্রেস পার্টি আমেরিকার জন্য সমস্যা তৈরি করে এবং এটা বৃটেনের মতই পলায়নপর মনোভাবসম্পন্ন। যদিও দলটি কিছু কিছু সামরিক চুক্তি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাস্তবায়ন করে, তথাপি বিভিন্ন রাজনৈতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত বিষয় মানতে চায় না, উদাহরণস্বরূপঃ কংগ্রেস পার্টি ২০০৪ সালে যে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল, সেই নির্বাচনের নির্বাচনী প্রচারণায় আমেরিকার প্রতি তার মনোভাব স্পষ্ট করে বক্তব্য প্রদান করেছিল এবং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির নীতির সমালোচনা করেছিল। সেই বক্তব্যে বলা হয়েছিল, “এটা দুঃখজনক যে ভারতের মত একটি মহান রাষ্ট্র আমেরিকার আনুগত্য করার মত নিচু স্তরের সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যেখানে আমেরিকা ভারত সরকারের আনুগত্যকে নিজেদের পাওনা মনে করে। এজন্যই বিজেপি সরকার ভারতের জন্য প্রয়োজনীয় পররাষ্ট্র নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাজনিত স্বার্থের বিষয় জলাঞ্জলি দিয়ে আমেরিকার স্বার্থ ও নীতিকে প্রাধান্য দিয়েছে।” এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায় যে কংগ্রেস পার্টি আমেরিকার জন্য কতটা সমস্যা সৃষ্টিকারক। এরপরও আমেরিকা-ভারত কৌশলগত সংলাপ বন্ধ হয়ে যায়নি এবং জুন ২০১০-এ তারা সংলাপে ফিরে যায়, যা ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের আমলে শুরু হয়েছিল। সংলাপ ফোরামে আমেরিকার প্রতিনিধিদলের প্রধান পররাষ্ট্র সচিব হিলারী ক্লিনটনের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার হয়: “ভারত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং বিশ্বস্ত বন্ধু।” এজন্য যখন কংগ্রেস পার্টি আমেরিকার আনুগত্যকারী বিজেপিকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আরোহন করে তখন থেকেই চীনকে মোকাবিলায় আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতকে নিয়োজিত রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, যদি না আমেরিকা ভারতকে বিশাল প্রাপ্তির দিকে প্রলুব্ধ করতে পারে এবং এটা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। যাই হোক, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারে ভারতের অনীহা নতুন কোন বিষয় নয়। বিজেপির সময়ও এমনটা ঘটেছিল, যদিও বিজেপি আমেরিকার নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিষয়টি সামনে আনেনি। এটা জানা উচিত যে, কংগ্রেস পার্টি পুরোপুরি বৃটেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তার কাছেই তা হস্তান্তর করে যায় এবং আংশিকভাবেও নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেনা। এর ব্যতিক্রম হয়েছে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নাতিদীর্ঘ সময়ে যখন আমেরিকার আনুগত্যকারী বিজেপি জয়লাভ করেছিল, এরপর আবার কংগ্রেস পার্টি ২০০৪-২০০৯ এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়।

০৭.০৪.২০১৪ তারিখে শুরু হওয়া নির্বাচনের ফলাফল ১৬.০৫.২০১৪ তারিখে ঘোষণা করা হবে। বিভিন্ন জরিপের ফলাফল অনুযায়ী এমনটাই অনুমান করা যাচ্ছে যে, এ নির্বাচনে বিজেপি জোটই বিজয়ী হবে। যদি জনমত জরিপ সঠিক হয়ে থাকে তাহলে, বিজেপি জয়লাভ করে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে পারবে। তখন চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমেরিকার পরিকল্পনা কংগ্রেস পার্টির শাসনামলের তুলনায় অধিকতর কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। যেরূপভাবে অতীতে আমেরিকা বিজেপির শাসনামলে সহজে তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল এবং কংগ্রেস পার্টির কয়েক দশকের শাসন অবসানের পরে আমেরিকা বিজেপির আমলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়েছিল। আবার যখন ২০০৪ সালে কংগ্রেস পার্টি ক্ষমতায় আসে তখন তা ভারতকে ঘিরে আমেরিকার পরিকল্পনা ভন্ডুল করে দিতে থাকে এবং কংগ্রেস পার্টি আমেরিকার পরিকল্পনায় সহায়তা করার পরিবর্তে সুবিধাজনক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে কৌশলে আমেরিকাকে পরিহার করতে থাকে।

৮. চীন এবং ভারতের মধ্যে তুলনায়, চীন অনেকগুলো ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেঃ চীন যদিও রাষ্ট্র হিসেবে তার আদর্শ বাস্তবায়ন করে না এবং পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতিতে তার আদর্শকে অন্তর্ভূক্ত করে না, সেই সাথে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়েও সে তার আদর্শকে পরিত্যাগ করে থাকে, তথাপি চীন তার শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে কমিউনিষ্ট পার্টির নাম ব্যবহার করে, যাতে করে পার্টির ও পার্টির সদস্যদের স্বার্থ এবং রাষ্ট্রের অখন্ডতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। এগুলোই চীনকে একটি অবিভক্ত রাষ্ট্রে কিংবা শক্তিশালী কোন রাষ্ট্রের কক্ষপথে আবর্তিত পরনির্ভর দেশে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করে চলেছে এবং স্বাধীনভাবে নিজস্ব নীতিসমূহ বাস্তবায়নে সক্ষম রেখেছে। ফলশ্রুতিতে এটি এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে, যেটি বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হওয়ার আকাঙ্খা করে। জাতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং যুবক অফিসারদের প্রশিক্ষণ দানকারী কর্ণেল লি. মিনগো তার লেখা “দি চাইনিজ ড্রিম” নামক বইতে এটা প্রকাশ করেছে। সে চীনকে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন করার আহ্বান জানিয়ে বর্তমান বিশ্বের নায়ক আমেরিকাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য দ্রুত অগ্রসর হওয়ার তাগিদ দিয়েছে, চাইনিজদের অপমানকর অবস্থা থেকে নিজেদের উত্তরণ ঘটিয়ে সম্মানজনক অবস্থায় আরোহণ করে বিশ্বের এক নম্বর রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সে বলেছে যে, চীন যদি একুশ শতকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে পরিণত হতে না পারে এবং একটি পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের উত্থান ঘটাতে না পারে, তাহলে এটি সুনিশ্চিতভাবেই একটি নিম্নস্তরের রাষ্ট্রে পরিণত হবে…… চীনের শক্তি ও চ্যালেঞ্জ করার মনোভাব দু’টিই রয়েছে। চীনের উদ্দেশ্য যদি শুধুমাত্র নিজের এলাকার উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে এবং কেবলমাত্র নিজস্ব অঞ্চলে আমেরিকার গতিবিধির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আমেরিকাকে মোকাবেলা করার চিন্তায় সীমাবদ্ধ না থাকে এবং চীন যদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুঁজিবাদকে আদর্শ হিসেবে মেনে নিতে শুরু না করে, বিশেষ করে অর্থনীতিতে... তাহলে সে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি জোড়ালো ভূমিকা রাখার ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হতে পারে এবং এটা আমেরিকার স্বার্থের উপর খুব শক্তিশালী আঘাত হবে। যা হোক, চীনের একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রয়েছে এবং সে তার নিজস্ব অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ভারতের রাষ্ট্র হিসেবে কোন আদর্শ নেই এবং আদর্শ থেকে উৎসারিত কোন চিন্তাধারাও নেই। শুধুমাত্র পশ্চিমাদের, বিশেষ করে বৃটেনের আনুগত্য নিশ্চিতের জন্য সে পুঁজিবাদ বাস্তবায়ন করে এবং এই আদর্শ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, ভারত জেগে উঠবে কিংবা স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোতে যেভাবে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কর্তৃক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুঁজিবাদ বাস্তবায়িত হয়েছে, ঠিক একইরকম ভাবে ভারতেও সেটা ঘটেছে এবং এখনও চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই কারণে তারা স্বাধীন হওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করছে না এবং শক্তিশালীভাবে, দ্রুততার সাথে ও নিজস্ব বিচার বিবেচনার সাথে কাজ করার কোন আগ্রহও তাদের নেই। ভারত একটি অধঃস্তন তাবেদার রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে এবং এর পরিকল্পনা ও নীতি স্বাধীন বা অন্যের প্রভাবমুক্ত নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর গতিবিধি খুবই ধীরগতিসম্পন্ন, যা সবসময় অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এই রাষ্ট্রটির নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা নেই এবং এর উদ্যোগ নিতেও সে সক্ষম নয়, বরং এটি হয় বৃটেনের নতুবা প্রথম প্রভূ আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন। এজন্যই এই ক্ষেত্রে ভারত চীনের চেয়ে ব্যতিক্রম; ভারত বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অনগ্রসরমান এবং যে কোন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির মাপকাঠিতে তারা বিশৃঙ্খল ও যেসব ব্যক্তিবর্গ রাজনৈতিক পরিমন্ডলে কাজ করছে, তারাও কোন ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। তাই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতি সর্বক্ষেত্রে আসন গেড়ে বসেছে এবং সকল রাজনীতিবিদদের গ্রাস করে যাচ্ছে। ভারতের পক্ষে একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক কিংবা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া খুবই কঠিন এবং এটা ভবিষ্যতে সর্বোচ্চভাবে আমেরিকা বা বৃটেন কিংবা উভয়ের মতো কোন বৃহৎ আদর্শিক রাষ্ট্রের কক্ষপথে আবর্তিত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

উপরোক্ত আলোচনাটি ছিল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত-চীনের তুলনামুলক বাস্তবতা; অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বলা যায় যে, চীনের অর্থনীতি ভারতের অর্থনীতির তুলনায় চার গুণ বৃহৎ, যেখানে চীন তার দেশের দারিদ্র সীমা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বিশ্বের ৬৬% গরীব লোক ভারতের নাগরিক। ভারত চীনের সাথে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারবে না। চীন একটি বৃহৎ শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, যা তাকে বিপুল পরিমান নগদ টাকার সঞ্চয় এনে দিয়েছে এবং এর মাধ্যমে সে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। চীনের তুলনায় ভারত উৎপাদন সক্ষমতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ভারী যন্ত্রপাতি তৈরী এবং আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এর মানে এটা নয় যে, ভারতে এসবের কিছুই নেই বরং তারা চীনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে...

সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, চীনের আনুষ্ঠানিক সামরিক বাজেটের পরিমান হচ্ছে ১১৯ বিলিয়ন ডলার, যেটা ভারতের ৩৮ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের তুলনায় তিন গুণ বেশি। চীন তার সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। এখন তারা নিজেদের জন্য বিশালাকৃতির সামরিক গুদাম তৈরী করছে, যেখানে জাহাজ, ট্যাংক ও যুদ্ধবিমানের মতো সামরিক সরঞ্জামাদি তৈরী ও সংরক্ষনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং নিজস্ব নৌ-বহর সম্প্রসারণ করেছে, যা এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যাই হোক, ভারত সম্প্রতি সামরিক আধুনিকায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নকল্পে অর্থের সংস্থানে সক্ষমতা অর্জনের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে, যদিও তা অনেক ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। ভারত এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশগুলোর অন্যতম এবং ভারতের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা অর্জনের দুই দশকের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ষ্টকহোমের আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইন্সটিটিউটের একজন উচ্চপদস্থ গবেষক পিটার ডি. ওয়াইজম্যান বলেছেন, “আমি মনে করি না বিশ্বে এমন কোন দেশ রয়েছে যেটা ভারতের মতো আন্তরিকভাবে অস্ত্র তৈরীর চেষ্টা করে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে” (‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ ভারত আভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অস্ত্র কিনতে চায়’, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস, মার্চ ২০১৪)। সুতরাং, চীন ভারতের তুলনায় ক্ষমতার মাপকাঠিতে অনেকখানিই এগিয়ে রয়েছে ...

৯. পরিশেষে, পাকিস্তানের সাথে ভারতের পশ্চিম সীমানা সুরক্ষিত করে দেয়ার পরে চীনের সাথে বিরোধপূর্ণ উত্তর ফ্রন্টে যুদ্ধ করার জন্য ভারতকে ঠেলে দিতে আমেরিকা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, পাকিস্তানের আমেরিকাপন্থী শাসকেরা বিজেপির আমলে ভারতকে অনেক সুবিধা প্রদান করেছিল, কারণ বিজেপিও আমেরিকাপন্থী একটি দল। যখন কংগ্রেস পার্টি ক্ষমতায় ফিরে আসে তখন এই উদ্যোগে ভাটা পড়ে এবং ভারতের চীনকে মোকাবিলা করার ভীতি ও সাম্প্রতিক সময়ের চীনের হুমকির প্রেক্ষিতে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা প্রতিষ্ঠিত হয়। আরও কারণ হচ্ছে যে, এই পার্টি বৃটেনের প্রতি অনুগত এবং বৃটেন কংগ্রেসকে আমেরিকার পরিকল্পনা অনুসরণ করতে নিরুৎসাহিত করে। আমেরিকা ভারতকে পূর্ব দিকে, বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দক্ষিণ চীন সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হতে চাপ প্রয়োগ করে এবং সেখানকার তেল-গ্যাস জ্বালানী সম্পদের ভাগ নেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভিয়েতনামের সাথে একজোট হয়ে কাজ করার ব্যাপারে রাজি করায় এবং ভিয়েতনামেরও সেই সম্পদের উপর দাবি রয়েছে ও স্প্র্যাটলি দ্বীপ নিয়েও চীনের সাথে তার বিরোধ চলছে... আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়াকেও অনেকগুলো দেশের সমন্বয়ে জোট গড়ে তোলার মাধ্যমে চীনকে মোকাবিলার নিমিত্তে এই অঞ্চলের দিকে ধাবিত করছে... আমেরিকা জাপানকে তার প্রতিরক্ষার বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে করে তার বোঝা লাঘব হয়। যদি নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভ করে এবং আবার ক্ষমতায় পৌছায়, তাহলে পূর্বে দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে ভারতের কার্যক্রম আরও বেগবান হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। চীন-ভারতের তুলনার ক্ষেত্রে: চীন শক্তির তুলনায় ভারতের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে... এবং চীনের উদ্দেশ্য যদি শুধুমাত্র নিজের এলাকার উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে এবং কেবলমাত্র নিজস্ব অঞ্চলে আমেরিকার গতিবিধির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আমেরিকাকে মোকাবেলা করার চিন্তায় সীমাবদ্ধ না থাকে... এবং চীন যদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুঁজিবাদকে আদর্শ হিসেবে মেনে নিতে শুরু না করে, বিশেষ করে অর্থনীতিতে... তাহলে সে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি জোড়ালো ভূমিকা রাখার ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হতে পারে এবং এটা আমেরিকার স্বার্থের উপর খুব শক্তিশালী আঘাত হবে।

প্রশ্নঃ মুসলিমদের কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা কি শরী’য়াহ সম্মত?

প্রশ্নঃ

মুসলিমদের কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা যে নিষিদ্ধ তা নিয়ে গবেষণা করতে গেলে কেউ একজন আমাকে বলল, তিনি কোন একজন আলেমের কাছে শুনেছেন যে, ইউসুফ (আ.) মিশরের শাসকের অধীন শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেছেন; তাঁর উদাহরণ দিয়ে তিনি একে বৈধ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অতঃপর, আবিসিনিয়ার শাসকের নাজ্জাশী একজন মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও কুফর ব্যবস্থায় শাসন করেছেন এবং রাসূল (সাঃ) তার জন্য জানাজা পড়েন। অন্যদিকে মাসলাহাও (উম্মাহর স্বার্থ) একটি শারী’আহ দলীল, যা এ অংশগ্রহণকে অনুমোদন দেয়। একজন মুসলিম, শাসন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করলে তিনি একজন সেক্যুলার ব্যক্তির চেয়ে মুসলিমদের স্বার্থ বেশি নিশ্চিত করতে পারেন।

প্রশ্ন হলো এই দলিলগুলো কতটা যুক্তিযুক্ত? এটা কি সত্য যে, এমন আলেমও আছেন যিনি এটাকে সমর্থন করেন? দয়া করে এর উত্তর দেবেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তমরূপে পুরস্কৃত করুন।

উত্তরঃ

হ্যাঁ, সরকারপন্থী অনেক আলেম এ ধারণার পক্ষে। তারা দলিলের ওপর ভিত্তি করে কথা বলেন না। কেননা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার মাধ্যমে শাসনের পক্ষে সুষ্পষ্ট প্রমাণ ও সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা শাসন করা বাধ্যতামূলক। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“আর আপনি আল্লাহ যা অবতীর্ন করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে ফায়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।” [আল মায়িদাহঃ ৪৮]

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“আর আপনি আল্লাহ্ যা অবতীর্ন করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে ফায়সালা করুন, আর তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন; যেন তারা আপনার নিকট আল্লাহর প্রেরিত কোন বিধান থেকে আপনাকে বিচ্যুত করতে না পারে।” [আল মায়িদাহঃ ৪৯]

এ রকম একই অর্থ বহন করে এমন অনেক দলিল রয়েছে।

আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করা কুফর, যদি শাসক এসবে বিশ্বাস করে। এটা জুলুম বা ফিসক (সীমালঙ্ঘন) শাসক যদি এতে বিশ্বাস না করে।

আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বক্তব্যে এটা স্পষ্ট,

“এবং যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারাই কাফির।” [সূরা আল মায়িদাহঃ ৪৮]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“এবং যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারাই যালিম।” [সূরা আল মায়িদাহঃ ৪৫]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“এবং যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারাই ফাসেক।” [সূরা আল মায়িদাহঃ ৪৭]

সরকারপন্থী ওলামারা তাদের প্রমাণ হিসেবে যা তুলে ধরেন তার কোন ভিত্তি নেই। আমাদের বক্তব্যের প্রমাণ হলোঃ

১. ইউসুফ (আ.) এর কর্মকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তি দেয়া হয় যে, তিনি মিশরের রাজার আইন অনুযায়ী শাসন করেছেন, অর্থাৎ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে। কোন প্রেক্ষাপট ছাড়াই এই যুক্তির অবতারণা। কারণ আমরা রাসূল (সাঃ) কর্তৃক আনীত ও আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত ইসলাম অনুসরণ করার জন্য আদিষ্ট। আমাদেরকে ইউসুফ (আ.) বা অন্য কোন নবীর শারী’আহ অনুসরণ করতে বলা হয়নি। কারণ আমাদের পূর্বের লোকদের আইন আমাদের জন্য নয়। ইসলাম এগুলোকে মানসূখ (রহিত) করে দিয়েছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“আমি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি (হে মুহাম্মদ!) এর পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবের সমর্থক ও অন্যগুলির ওপর মাপকাঠি। সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে শাসন করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করবেন না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট শারী’আহ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি।” [সূরা আল মায়িদাহঃ ৪৮]

‘অন্যগুলির ওপর মাপকাঠি’ মানে, এটি অন্যসব কিতাবকে মানসূখ করে দিয়েছে। ইসলাম পূর্বের সকল কিতাবকে মানসূখ করে দিয়েছে, তাই পূর্বের লোকদের আইন আমাদের জন্য আইন নয়। উসূলবিদদের অনেক আলেম আছেন যারা এই নীতিকে অন্যভাবে গ্রহণ করেছেনঃ

“আমাদের পূর্বের লোকদের আইন আমাদের জন্য আইন হিসেবে থাকবে, যতক্ষণ না তা মানসূখ হয়ে যায়।”

এই নীতি, পূর্বের নবীদের আইনকে দলিল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলাম কর্তৃক মানসূখ হয়ে যায়নি এমন বিষয়সমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে। যে সকল বিষয় ইসলাম কর্তৃক মানসূখ হয়ে গিয়েছে, সেসব পূর্বের আইন গ্রহণ নিষিদ্ধ। আমাদের শারী’আহ অনুযায়ী আমাদেরকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করা ইসলামের সুষ্পষ্ট হুকুম। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এমন পূর্বের সকল আইন রহিত। উসূলের সকল আলেম, হোক তারা প্রম নীতি “আমাদের পূর্বের লোকদের আইন আমাদের আইন নয়” অথবা দ্বিতীয় নীতি “আমাদের পূর্বের লোকদের আইন আমাদের জন্য আইন হিসেবে থাকবে, যতক্ষণ না তা মানসূখ হয়ে যায়” গ্রহন করুক, তারা সকলেই আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা দিয়ে শাসন করা বাধ্যতামূলক হিসেবেই দেখেন। কেননা এগুলো ইসলামে সুষ্পষ্টভাবেই রয়েছে, যার বক্তব্য সুষ্পষ্ট ও প্রমাণ অকাট্য। ইসলাম পূর্বের আইনসমূহ রহিত করে, যদি তা শারী’আহ দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক হয়।

ইউসুফ (আ.) কিছু বিষয়ে মিশরের শাসনকর্তার আইন অনুযায়ী শাসন করেছেন, সরকারপন্থী ওলামাদের এই অনুমান মেনে নিয়েই আমরা পূর্বের কথাগুলো বলেছি। তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন নবী এবং নিষ্পাপ, সুতরাং তিনি আল্লাহ যা তাঁর প্রতি নাযিল করেছেন, তা দিয়েই শাসন করেছেন। যেমনি আল্লাহ জেলের মধ্যে তাঁর (আ.) দু’সহচরের সাথে কথোপকথোন বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি (আ.) বলেছেনঃ আল্লাহ ছাড়া আর কারো আইন গ্রহণযোগ্য নয়।”

“হে কারা সংগীদ্বয়! ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাঁকে ছেড়ে তোমরা কেবল কতকগুলি নামের ইবাদত করছ, যেই নামগুলি তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ, এইগুলির কোন প্রমাণ আল্লাহ পাঠাননি। বিধান দেবার অধিকার কেবল আল্লাহই। তিনি আদেশ দিয়েছেন অন্য কারো ইবাদত না করতে, কেবল তাঁর ব্যতীত, ইহাই শ্বাশত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা অবগত নয়।” [সূরা ইউসুফঃ ৩৯-৪০]

ষ্পষ্টতঃ ইউসুফ (আ.) বললেনঃ “বিধান দেবার অধিকার কেবল আল্লাহরই।”

এজন্য শাসন কেবল বিশ্ব জাহানের মালিক আল্লাহরই জন্য, যাকে মুসলিমরা ইবাদত করে এবং যার শারী’আহ গ্রহণ করেছে এবং যার সাথে অন্য কারো শরীক করেনা।

ইউসুফ (আ.) এর কর্ম তাঁর কথার সাথে সাংঘর্ষিক নয়, এর কোন মানে নেই যে, তিনি বলবেন আল্লাহ ছাড়া কোন বিধান দাতা নেই এবং নিজে কুফর শাসনে পরিচালিত হবেন। এই যুক্তি হলো আল্লাহর অন্যতম নবীর নিষ্পাপতার প্রতি এক ধরণের আক্রমণ এবং আল্লাহর অবমাননা করা; যা একটি ভয়াবহ বিষয়। এ থেকে বলা যায়, ইউসুফ (আ.) কুফর দ্বারা শাসন করেননি, আল্লাহ তার প্রতি যা নাযিল করেছেন, তিনি তা দ্বারা শাসন করেছেন, তিনি আল্লাহর কাছে সত্যবাদী এবং নিষ্ঠাবান। তারপরও আমরা যদি আলোচনার স্বার্থে ধরেও নেই যে, আল্লাহ ইউসুফকে (আ.) তাঁর শারী’আহ-তে মিশরের শাসকের কিছু বিধান প্রয়োগ করার ব্যাপারে অনুমতি দিয়েছেন, এক্ষেত্রে আমরা উল্লেখ করেছি যে, ইসলাম পূর্বের আইন বাতিল করে দিয়েছে, রাসূল (সাঃ) এর বার্তা পাবার পর অর্থাৎ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করোনা, আমাদের জন্য শুধু রাসূল (সাঃ) প্রদর্শিত ইসলাম বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, অন্য কিছু নয়।

২. নাজ্জাশীর ঘটনা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারও প্রেক্ষাপটের বাইরে। কেউ যদি এ বিষয়ে সঠিকভাবে গবেষণা করে, তাহলে দেখতে পাবে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাজা ছিলেন। তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন ও অল্প কিছুদিন পরেই মারা যান। তিনি ইসলাম বাস্তবায়নের সুযোগ পাননি এবং তার ইসলাম গ্রহণ প্রকাশ্যে ঘোষণা দেবার সাহস পাননি কেননা তার জনগণ ছিল কাফির। এই ঘটনা এমন কোন মুসলিমের ক্ষেত্রে করা প্রয়োগ যায় না যেখানে সে সকলের কাছে মুসলিম বলে পরিচিত। বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে তুল ধরা হলোঃ

ক. আবিসিনিয়ার শাসকের নাম নাজ্জাশী নয়, আবিসিনিয়ার শাসকদের উপাধি নাজ্জাশী ছিল। তাকে নাজ্জাশী বলা হতো, যেমনি পারস্যের শাসকদের কিসরা এবং রোমানদের বলা হতো কায়সার। যে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করে ও রাসূল (সাঃ) যার জন্যে দু’আ করেন, তার ইসলাম গ্রহণের সময়কাল খুব বেশি দিন ছিলনা, যেমনি উল্লেখিত প্রশ্নে অনুমান করা হয়েছে। ইসলাম গ্রহণ করার পর তার বেঁচে থাকার সময়কাল ছিল খুবই কম Ñ দিন কয়েক বা এক-দু’ মাস। তিনি সেই নাজ্জাশী নন যার কাছে মুসলিমরা মক্কা থেকে হিযরত করে গিয়েছিল, তিনি সেই নাজ্জাশীও নন যার কাছে রাসূল (সাঃ) হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আমর বিন উমাইয়া আয-যামিরিকে দূত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অন্য এক নাজ্জাশী, যার কাছে রাসূল (সাঃ) দূত পাঠিয়েছিলেন, তার পরে এই নাজ্জাশী ক্ষমতায় এসেছিলেন।

এই বিষয়ে বর্ণনা বুখারী ও মুসলিম শরিফে পাওয়া যায়। যারা মনে করেন মক্কা থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করে নাজ্জাশীর দরবারে গিয়েছিল, তিনি সেই নাজ্জাশী যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তারা ভুল করছেন। অথবা যারা মনে করেন রাসূল (সাঃ) যার কাছে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর চিঠি পাঠিয়েছিলেন তিনি সেই নাজ্জাশী, তারাও ভুল করছেন কেননা এগুলো বুখারী ও মুসলিম শরিফের বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক। তার প্রমাণ হলোঃ

মুসলিম বর্ণনা করেন কাতাদা থেকে, যিনি বর্ণনা করেন আনাস (রা.) থেকেঃ “রাসূল (সাঃ) কায়সার, কিসরা, নাজ্জাশী এবং সকল অত্যাচারী শাসকের কাছে চিঠি লিখেছিলেন আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দেবার জন্য এবং সেই নাজ্জাশী নয়, যার জন্য রাসূল (সাঃ) দু’আ করেছিলেন।”

তিরমিযি বর্ণনা করেন কাতাদা থেকে, যিনি বর্ণনা করেন আনাস (রা.) থেকেঃ “রাসূল (সাঃ) তাঁর ইন্তিকালের পূর্বে কিসরা, কায়সার, নাজ্জাশী এবং সকল অত্যাচারী শাসককে আল্লাহর আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন এবং সেই নাজ্জাশী নয়, যার জন্য তিনি দু’আ করেছিলেন।”

মুসলিম ও তিরমিযির হাদিস থেকে স্পষ্ট রাসূল (সাঃ) যে নাজ্জাশীর জন্য দু’আ করেছিলেন ও যার কাছে চিঠি লিখে দূত পাঠিয়েছিলেন, এরা এক নাজ্জাশী নয়।

খ. রাসূল (সাঃ) হুদাইবিয়াহ থেকে ফিরে এসে শাসকদের কাছে চিঠি লিখেছিলেন, যা ছিল হিযরতের ৬ষ্ঠ বছরের জিলক্বদের পরে। যে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, সে নাজ্জাশীর কাছে তিনি (সাঃ) চিঠি পাঠাননি। তিনি সেই নাজ্জাশী, যিনি হিযরতের ৭ম বছরের দিকে ক্ষমতায় এসেছিলেন।

গ. আবু হুরায়রা (রা.) রাসূল (সাঃ) এর সাথে ছিলেন যখন তিনি নাজ্জাশীর জন্য দু’আ করছিলেন, যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, হাদিসের বর্ণনা মোতাবেক। আবু হুরাইরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং দাওস থেকে ৭০-৮০ জনের প্রতিনিধি নিয়ে মদীনায় এসছিলেন যখন রাসূল (সাঃ) খাইবারে ছিলেন। তাই তিনি সেখানে গিয়ে তাঁর (সাঃ) সাথে দেখা করলেন। রাসূল (সাঃ) খাইবারের গণিমতের মালের কিছু অংশ তাদের দিলেন। খাইবারের যুদ্ধ হিজরী ৭ম সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার মানে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেন ও শাসক হন হিজরী ৭ম সালের মধ্যেই এবং সে বছরই মারা যান। তিনি বেশি দিন বেঁচে থাকেননি।

ঘ. আবিসিনিয়া ছিল কুফর খৃষ্টানদের আবাসভূমি। তাদের শাসক ইসলাম গ্রহণ করেছিল সকলের অজান্তে, এমনকি নবী (সাঃ) এর অজান্তে, তিনি নাজ্জাশীর মৃত্যুর খবর ওহীর মাধ্যমে জেনেছিলেন। তার জন্য দু’আ করার বিষয়ে যে হাদিস এসেছে, তা এর দলিল।

বুখারী আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণনা করেনঃ “আল্লাহর রাসূল (সাঃ) নাজ্জাশীর মৃত্যুর খবর ঐদিনই সাথে সাথে জানিয়ে দিলেন। তিনি (সাঃ) মুসাল্লায় (নামাজের জায়গা) গেলেন এবং সকলে তাঁর পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তিনি ৪ তাকবির পাঠ করলেন (জানাজার নামাজ)।”

অন্য বর্ণনায়ঃ “আল্লাহর রাসূল (সাঃ) নাজ্জাশীর মৃত্যুর পর ঐদিনই আমাদের জানালেন। তিনি বললেনঃ তোমাদের ভাইয়ের গুণাহ মাফের জন্য দু’আ কর।”

বুখারী জাবির বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ “‘আজ এক সৎকর্মশীল লোক মারা গেছে, তাই তার জন্য দু’আর উদ্দেশ্যে জড়ো হও।’ তিনি বলেনঃ আমরা রাসূল (সাঃ) এর পেছনে লাইনে দাঁড়ালাম এবং জানাজা পড়লাম’”; জাবির থেকে আবু আয-যুবাইর বলেনঃ “আমি ছিলাম দ্বিতীয় সারিতে।” জাবির এর অন্য এক বর্ণনায়ঃ যখন নাজ্জাশী মারা গেল তখন রাসূল (সাঃ) বলেনঃ আজ এক সৎ লোক মারা গেছে, তাই আসামার (নাজ্জাশীর নাম) জন্যে জড়ো হও’”

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) নাজ্জাশীর মৃত্যুর খবর ঐদিনই সাথে সাথে জানিয়ে দিলেন। তিনি বললেনঃ “তোমাদের ভাইয়ের গুণাহ মাফের জন্য দু’আ কর। আজ এক সৎকর্মশীল লোক মারা গেছে, তাই তার জন্য দু’আর উদ্দেশ্যে জড়ো হও।” অর্থাৎ নাজ্জাশী যেদিন মারা গেলেন, তার মৃত্যুর ঘোষণা হল কিন্তু তিনি ছিলেন আবিসিনিয়ায় এবং রাসূল (সাঃ) ছিলেন মদিনায়, যার মানে তিনি ওহীর মাধ্যমে জানলেন এবং রাসূল (সাঃ) এর বক্তব্যঃ “তোমার ভাইয়ের গুণাহ মাফের জন্য দু’আ কর আজ এক সৎকর্মশীল লোক মারা গেছে” এর মানে তাদের কাছে নাজ্জাশীর মৃত্যু ও ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে সংবাদ জানা ছিলনা। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাধারণত যখন কোন সাহাবী (রা.) মারা যেতেন তখন তাদের জানাযার নামাজের জন্য এভাবে আহ্বান করতেন না।

ঙ. এজন্য নাজ্জাশীর ঘটনা এই বাস্তবতার সাথে মিল নেই। নাজ্জাশী গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তার জনগণ ছিল কাফির, তিনি কিছুদিনের মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন, ওহী ছাড়া কেউ তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে জানত না। এই ঘটনা, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ভিন্ন অন্য কিছু দিয়ে একজন মুসলিমের কুফর শাসনে অংশ্রহণের সাথে মিল নেই। যারা একে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে থাকেন, তাদের কোন প্রমাণ নেই, এমনকি কোন সন্দেহযুক্ত প্রমাণও।

৩. মাসলাহাকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার প্রেক্ষাপটের বাইরে, আমরা যেভাবে বিষয়টি দেখি Ñ কিছু উসূলের আলেম যারা মাসলাহাকে (উম্মাহর স্বার্থ) প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন, তারা এর সাথে এক শর্ত যুক্ত করেন তা হলো, মাসলাহা গ্রহণ করা যাবে যদি শারী’আহ এ ব্যাপারে আদেশ বা নিষেধ না করে থাকে। যদি এ ব্যাপারে শারী’আহ-এর আদেশ অথবা নিষেধ বিদ্যমান থাকে তাহলে মাসলাহার নিয়ম কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সেক্ষেত্রে শারী’আহতে উল্লেখিত বিধানই গ্রহণযোগ্য। উসূলের কোন বিখ্যাত আলেমই আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত আয়াত বা বিধান রহিত করে উম্মাহর স্বার্থ গ্রহণ করার পক্ষে যুক্তি দেননি।

সুদ হারাম, যা শারী’আহ-এর দলিল দ্বারা প্রমাণিত। উম্মাহর স্বার্থের কারণে যদি সুদ দরকার হয়, এটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ কেননা শারী’আহ একে হারাম ও পরিত্যাগ করেছে। এমনকি যদি কোন তথাকথিত আলেম সুদ গ্রহণযোগ্য বলে ফাতওয়া দেয়, তাদের ফাতওয়া অগ্রহণযোগ্য, কেননা এটা আল্লাহ কর্তৃক নাযিলকৃত আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক।

আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ভিন্ন অন্য কিছু দিয়ে শাসন করা সুষ্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ, ঠিক হারাম হওয়া সুদের মতই, কেননা এটা ওহীর মাধ্যমে এসেছে। সুতরাং এখানে উম্মাহর স্বার্থের কোন স্থান নেই, বরং শারী’আহ যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে তাই উম্মাহর জন্য স্বার্থ, এর উল্টোটা নয়।

এমনকি উসূলের আলেমরা, যারা ভুলবশত মাসালিহ মুরসালাকে গ্রহণ করেছেন, তাদের মাযহাবে একে কোথাও উৎস হিসেবে পেশ করেননি। বাস্তবে মাসালিহ মুরসালা বলতে কিছু নেই। কেউ কেউ বলে থাকেন শারী’আহ কিছু বিষয়ের আইন দেয়নি এবং এসব ক্ষেত্রেই তারা মাসলাহা ব্যবহার করে থাকেন। বাস্তবে ইসলাম কোন বিষয়কে ব্যাখ্যা করা ছাড়া ছেড়ে দেয়নি, সব বিষয়ের ওপরই ইসলামের নিয়ম রয়েছেঃ

“এবং আমি এই কিতাব সকল কিছুর ব্যাখ্যা হিসেবেই পাঠিয়েছি।” [সূরা আন নাহলঃ ৮৯]

“আমরা এ কিতাবে কোন কিছুই অব্যক্ত রাখিনি।” [সূরা আল আনআমঃ ৩৮]

“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।” [সূরা আল মায়িদাহঃ ৩]

৪. উপসংহারে বলা যায়, কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ এবং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করা কুফর, যদি শাসক এসব কুফর বিধানে বিশ্বাস করে। শাসক যদি কুফর বিধানে বিশ্বাস না করে, তা দিয়ে শাসন করে, তাহলে তা হবে অন্যায়-অবিচার ও সীমালঙ্ঘন।

“এবং যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারাই কাফির।” [সূরা আল মায়িদাহঃ ৪৮]

“এবং যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারাই জালিম।” [সূরা আল মায়িদাহঃ ৪৫]

“এবং যারা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না, তারাই ফাসেক।” [সূরা আল মায়িদাহঃ ৪৭]

যারা বলে যে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ব্যতীত অন্য শাসনব্যবস্থায় মুসলিমদের অংশগ্রহণ বৈধ, তাদের কোন দলীল নেই। এমনকি কোন সন্দেহযুক্ত দলিলও। কেননা যে দলিল এ বিষয়টিকে নিষিদ্ধ করে তা প্রমাণ ও বক্তব্যের দিকে থেকে সন্দেহাতীত।

আশা করি এই উত্তর সম্পূর্ণ, পরিষ্কার এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সন্তোষজনক।


৪ রজব, ১৪৩৫ হিজরী
৩ মে, ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ