29.11.14

উমার ইবন খাত্তাব (রা.)

উমার ইবন খাত্তাব (রা.)

নাম উমার, লকব ফারুক এবং কুনিয়াত আবু হাফস। পিতা খাত্তাব ও মাতা হানতামা। কুরাইশ বংশের আ’দী গোত্রের লোক। উমারের অষ্টম উর্ধ্ব পুরুষ কা’ব নামক ব্যক্তির মাধ্যমে রাসূলুল্লা (সাঃ) এর নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে। পিতা খাত্তাব কুরাইশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। মাতা হানতামা কুরাইশ বংশের বিখ্যাত সেনাপতি হিশা ইবনে মুগীরার কন্যা। ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ এই মুগীরার পৌত্র। মক্কার জাবালে আকিব এর পাদদেশে ছিল জাহিলী যুগে বনী আ’দী ইবনে কা’বের বসতি। এখানেই ছিল হযরত উমারের বাসস্থান। ইসলামী যুগে উমারের নাম অনুসারে পাহাড়টির নাম হয় জাবালে উমার- উমারের পাহাড়। (তাবাকাতে ইবনে সা’দঃ ৩/৬৬) উমারের চাচাত ভাই, যায়িদ বিন নুফাইল। রাসূলুল্লা (সাঃ) এর আবির্ভাবের পূর্বে নিজের বিচার-বুদ্ধি সাহায্যে মুর্তিপূজা ত্যাগ করে জাহিলী আরবে যাঁরা তাওহীদবাদী হয়েছিলেন, যায়িদ তাঁদেরই একজন।

রাসূলুল্লা (সাঃ) এর ন্মের তেরো বছর পর তাঁর জন্ম। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল রাসূলুল্লা (সাঃ) এর বয়সের সমান অর্থাৎ ৬৩ বছর। তবে তাঁর জন্ম ও ইসলাম গ্রহণের সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

গায়ে রং উজ্জল গৌরবর্ণ, টাক মাথা, গন্ডদেশ মাংসহীন, ঘন দাড়ি, মোঁচের দু’পাশ লম্বা ও পুরু এবং শরীর দীর্ঘাকৃতির। হাজার মানুষের মধ্যেও তাঁকেই সবার থেকে লম্বা দেখা যেত।

তাঁর জন্ম ও বাল্যকাল সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। ইবনে আসাকির তাঁর তারিখে আমরবন আস (রা.) হতে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তাতে জানা যায়, একদিন আমর ইবন আ’স বন্ধু-বান্ধবসহ বসে আছেন, এমন সময় হৈ-চৈ শুনতে পেলেন। সংবাদ নিয়ে জানতে পেলেন, খাত্তাবের একটি ছেলে হয়েছে। এ বর্ণনার ভিত্তিতে মনে হয়, হযরত উমারের জন্মের সময় বেশ আনন্দোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

তাঁর যৌবনের অবস্থাও প্রায় অনেকটা অজ্ঞাত। কে জানত যে এই সাধারন একরোখা ধরনের যুবকটি একদিন ‘ফারুকে আযমে’ পরিণত হবেন। কৈশোরে উমারের পিতা তাঁকে উটের রাখালী কাজে লাগিয়ে দেন। তিনি মক্কার নিকটবর্তী ‘দাজনান’ নামক স্থানে উট চড়াতেন। তিনি তাঁর খিলাফতকালে একবার এ মাঠ অতিক্রমকালে সঙ্গীদের কাছে বাল্যের স্মৃতিচারন করেছিলেন এভাবেঃ এমন এক সময় ছিল যখন আমি পশমী জামা পরে এই মাঠে প্রখর রোদ্রে খাত্তাবের উট চড়াতাম। খাত্তাব ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নিরস ব্যক্তি। ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিলে পিতার হাতে প্রহৃত হতাম। কিন্ত আজ আমার এমন দিন এসেছে যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আমার উপর কর্তৃত্ব করার আর কেউ নেই।’ (তাবাকাতঃ ৩/২৬৬-৬৭)

যৌবনের প্রারম্ভেই তিনি তৎকালীন অভিজাত আরবদের অবশ্য শিক্ষণীয় বিষযগুলি, যথাঃ যুদ্ধবিদ্যা, কুস্তি, বক্তৃতা, ও বংশ তালিকা শিক্ষা প্রভৃতি আয়ত্ব করেন। বংশ তালিকা বা নসবনামা বিদ্যা তিনি লাভ করেন উত্তরাধিকার সুত্রে। তাঁর পিতা ও পিতামহ ছিলেন এ বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী। তিনি ছিলেন তার যুগের একজন শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর। আরবের ‘উকায’ মেলায় তিনি কুস্তি লড়তেন। আল্লামা যুবইয়ানী বলেছেনঃ উমার (রা.) ছিলেন এক মস্তবড় পালোয়ান।’ তিনি ছিলেন জাহেলী আরবের একজন বিখ্যাত ঘোড় সওয়ার। আল্লামা জাহিয বলেছেনঃ উমার (রা.) ঘোড়ায় চড়লে মনে হত ঘোড়ার চামড়ার সাথে তাঁর শরীর মিশে গেছে।’ (আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন) তাঁর মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল। তৎকালীন খ্যাতনামা কবিদের প্রায় সব কবিতাই তাঁর মুখস্থ ছিল। আরবী কাব্য সমালোচনার বিজ্ঞানভিত্তিক ধারার প্রতিষ্ঠাতা প্রকৃতপক্ষে তিনিই। ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কিত তাঁর মতামতগুলো পাঠ করলে এ বিষয়ে তাঁর যে কতখানি দখল ছিল তা উপলদ্ধি করা যায়। বাগ্মিতা ছিল তাঁর সহজাত গুন। যৌবনে তিনি কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। বালাজুরী লিখেছেনঃ রাসুলে কারীম (সাঃ) এর নবুয়্যত প্রাপ্তির সময় গোটা কুরাইশ বংশে মাত্র সতেরজন লেখাপড়া জানতেন। তাঁদের মধ্যে উমার (রা.) একজন।’

ব্যবসা বাণিজ্য ছিল জাহেলী যুগে আরবদের সম্মানজনক পেশা। উমারও ব্যবসা শুরু করেন এবং তাতে যথেষ্ট উন্নতিও করেন। ব্যবসা উপলক্ষে অনেক দুরদেশে গমণ ও বহু জ্ঞানী-গুনী সমাজের সাথে মেলা-মেশার সুযোগ লাভ করেন। মাসউদী বলেনঃ উমার (রা.) জাহেলী যুগে সিরিয়া ও ইরাকে ব্যবসা উপলক্ষে ভ্রমনে যেতেন। ফলে আরব ও আযমের অনেক রাজা-বাদশাহ’র সাথে মেলা-মেশার সুযোগ লাভ করেন।’ শিবলী নুমানী বলেনঃ জাহেলী যুগেই উমারের সুনাম সমগ্র আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ কারণে কুরাইশরা সর্বদা তাঁকেই দৌত্যগিরিতে নিয়োগ করতো। অন্যান্যা গোত্রের সাথে কোন বিরোধ সৃষ্টি হলে নিষ্পত্তির জন্য তাঁকেই দূত হিসেবে পাঠানো হতো। (আল-ফারুকঃ ১৪)

উমারের ইসলাম গ্রহণ এক চিত্তাকর্ষক ঘটনা। তাঁর চাচাতো ভাই যায়িদের কল্যানে তাঁর বংশে তৌহিদের বাণী একেবারে নতুন ছিল না। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম যায়িদের পুত্র সাঈদ ইসলাম গ্রহণ করেন। সাঈদ আবার উমারের বোন ফাতিমাকে বিয়ে করেন। স্বামীর সাথে ফাতিমাও ইসলাম গ্রহণ করেন। উমারের বংশের আরো এক বিশিষ্ট ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহও ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্ত তখনও পর্যন্ত উমার (রা.) ইসলাম সম্পর্কে কোন খবরই রাখতেন না। সর্বপ্রথম যখন ইসলামের কথা শুনলেন, ক্রোধে জ্বলতে থাকলেন। তাঁর বংশে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের তিনি পরম শত্রু হয়ে দাড়ালেন। এর মধ্যে জানতে পারলে, ‘লাবীনা নামক তাঁর এক দাসী ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যাদের উপর তাঁর ক্ষমতা চলতো, নির্মম অত্যাচার চালালেন। এক পর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ইসলামের মুল প্রচারক মুহাম্মদ (সাঃ)-কেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। যে কথা সেই কাজ।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিতঃ তরবারী কাঁধে ঝুলিয়ে উমার চলেছেন পথে বনী যুহরার এক ব্যক্তির (মতান্তরে নাঈম ইবন আবদুল্লাহ’র) সাথে দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কোন দিকে উমার? বললেনঃ মুহাম্মদের একটা দফারফা করতে।’ লোকটি বললেনঃ মুহাম্মদ (সাঃ) এর দফারফা করে বনী হাশিম ও বনী যুহরার হাত থেকে বাঁচবে কিভাবে? এ কথা শুনে উমার বলে উঠলেনঃ মনে হচ্ছে তুমিও পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করে বিধর্মী হয়েছো।’ লোকটি বললেনঃ উমার একটি বিস্ময়কর খবর শোন, তোমার বোন ও ভগ্নীপতি বিধর্মী হয়ে গেছে। তাঁরা তোমার ধর্ম ত্যাগ করেছে।’” (আসলে লোকটির লক্ষ্য ছিল উমার (রা.)-কে তার লক্ষ থেকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়া।) এ কথা শুনে উমার রাগে উন্মত্ত হয়ে ছুটলেন তাঁর বোন-ভগ্নীপতির বাড়ীর উদ্দেশ্যে। বাড়ীর দরজায় উমারের করাঘাত পলো। তারা দু’জন তখন খাব্বাব ইবন আল-আরাত এর কাছে কুআন শিখছিলেন। উমারের আভাষ পেয়ে খাব্বাব তখন বাড়ীর আরেকটি কক্ষে আত্মগোপন করলেন। উমার বোন-ভগ্নীপতিকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের এখানে গুগুন আওয়াজ শুনছিলাম, তা কিসের? তারা তখন কুআনের সূরা ত্বাহা পাঠ করছিলেন। তাঁরা উত্তর দিলেনঃ আমরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলাম।’ উমার বললেনঃ সম্ভবত তোমরা দু’জন ধর্মত্যাগী হয়েছো।’ ভগ্নীপতি বললেনঃ তোমার ধর্ম ছাড়া অন্য কোথাও যদি সত্য থাকে তুমি কি করবে উমার? উমার তাঁর ভগ্নীপতির উপর ঝাপিয়ে পলেন এবং দু’পায়ে ভীষভাবে তাঁকে মাড়াতে লাগলেন। বোন তাঁর স্বামীকে বাচাতে এগিয়ে এলে উমার তাকে ধরে এমন মার দিলেন যে, তাঁর মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেল। বোন রাগে উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেনঃ সত্য যদি তোমার দ্বীনের বাইরে অন্য কোথাও থেকে থাকে, তাহলে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসুল।’

এ ঘটনার কিছুদিন আগ থেকে উমারের মধ্যে একটা ভাবান্তর সৃষ্টি হয়েছিল। কুরাইশরা মক্কায় মুসলিমদের ওপর নির্মম অত্যাচার-উৎপীড়ন চালিয়ে একজনকেও ফেরাতে পারেনি। মুসলিমরা নীরবে সবকিছু মাথা পেতে নিয়েছে। প্রয়োজনে বাড়ী-ঘর ছেড়েছে, ইসলাম ত্যাগ করেনি। এতে উমারের মনে একটা ধাক্কা লেগেছিল। তিনি একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আবর্তে দোল খাচ্ছিলেন। আজ তার প্রিয় সহোদরার চোখ-মুখের রক্ত, তার সত্যের সাক্ষ্য তাঁকে এমন একটি ধাক্কা দিল যে, তাঁর সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কর্পূরের মত উড়ে গেল। মুহূর্তে হৃদয় তাঁর সত্যে জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। তিনি পাক-সাফ হয়ে বোনের হাত থেকে সূরা ত্বাহার অংশটুকু নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। পড়া শেষ করে বললেনঃ আমাকে তোমরা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কাছে নিয়ে চল।’ উমারের একথা শুনে এতক্ষণে খাব্বাব ঘরের গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেনঃ সুসংবাদ উমার! বৃহঃস্পতিবার রাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমার জন্য দু’আ করেছিলেন। আমি আশা করি তা কবুল হয়েছে। তিনি বলেছিলেনঃ আল্লাহ, উমার ইবনুল খাত্তাব বা আমর ইবন হিশামের দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী কর।’ খাব্বার আরো বললেনঃ রাসুল (সাঃ) এখন সাফার পাদদেশে ‘দারুল আরকামে

উমার (রা.) চললেন দারুল আরকামের দিকে। হামজা এবং তালহার সাথে আরো কিছু সাহাবী তখন আরকামের বাড়ীর দরজায় পাহারারত। উমারকে দেখে তাঁরা সন্ত্রস্ত হয়ে পরলেন। তবে হামজা সান্তনা দিয়ে বললেনঃআল্লাহ উমারের কল্যান চাইলে সে ইসলাম গ্রহণ করে রাসুল (সাঃ) এর অনুসারী হবে। অন্যথায় তাকে হত্যা করা আমাদের জন্য খুবই সহজ হবে।’ রাসুল (সাঃ) তখন বাড়ীর ভিতরে তাঁর উপর তখন ওহী নাজিল হচ্ছিল। একটু পরে তিনি বেরিয়ে উমারের কাছে এলেন। উমারের কাপড় ও তরবারীর হাতল তিনি মুঠো করে ধরে বললেনঃ উমার তুমি কি বিরত হবে না?………তারপর তিনি দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ, উমার আমার সামনে, হে আল্লাহ উমারের দ্বারা দ্বীনকে শক্তিশালী কর।’ উমার (রা.) বলে উঠলেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসুল। ইসলাম গ্রহণ করেই তিনি আহবান জানালেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়ুন। (তাবাকাতুল কুবরা/ ইবন সা’দঃ ৩/২৬৭-৬৯) এটা নবুওয়্যাতের ষষ্ঠ বছরের ঘটনা।

ইমাম যুহরী বর্ণনা করেনঃ রাসুলাল্লাহ (সাঃ) দারুল আরকামে প্রবেশের পর উমার ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পুর্বে নারী-পুরুষ সর্বমোট চল্লিশ বা চল্লিশের কিছু বেশী লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উমারের ইসলাম গ্রহণের পর জিবরাঈল (আ.) এসে বললেনঃ মুহাম্মদ, উমারের ইসলাম গ্রহণে আসমানের অধিবাসীরা উৎফুল্ল হয়েছে।’” (তাবাকাতঃ ৩/২৬৯)

উমারের ইসলাম গ্রহণে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যদিও তখন পর্যন্ত ৪০/৫০ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে হযরত হামজাও ছিলেন, তথাপি মুসলিমদের পক্ষে কা’বায় গিয়ে নামাজ পড়াতো দূরে কথা নিজেদেরকে মুসলিম বলে প্রকাশ করাও নিরাপদ ছিল না। হযরত উমারের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে এ অবস্থার পরিবর্তন হলো। তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষনা দিলেন এবং অন্যদের সঙ্গে নিয়ে কা’বা ঘরে নামাজ আদায় করা শুরু করলেন।

উমার (রা.) বলেনঃ আমি ইসলাম গ্রহনের পর সে রাতেই চিন্তা করলাম, মক্কাবাসীদের মধ্যে রাসুলাল্লাহ (সাঃ) এর সবচেয়ে বড় কট্টর দুশমণ কে আছে। আমি নিজে গিয়ে তাকে আমার ইসলাম গ্রহণের কথা জানাব। আমি মনে করলাম, আবু জাহেলই সবচেয়ে বড় দুশমন। সকাল হতেই আমি তার দরজায় করাঘাত করলাম। আবু জাহেল বেড়িয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলঃ কি মনে করে? আমি বললামঃ আপনাকে এ কথা জানাতে এসেছি যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল মুহাম্মদ (সাঃ)র প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁর আনীত বিধান ও বাণীকে মেনে নিয়েছি।’ এ কথা শোনা মাত্র সে আমার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিল এবং বললঃ আল্লাহ তোকে কলংকিত করুক এবং যে খবর নিয়ে তুই এসেছিস তাকেও কলংকিত করুক।’ (সীরাতে ইবন হিশাম)

এভাবে এই প্রথমবারের মত মক্কার পৌত্তলিক শক্তি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলো। সাদ ইবন মুসায়্যিব বলেনঃ তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম মক্কায় প্রকাশ্য রুপ নেয়।’ আবদুল্লাহ ইব মাসউদ (রা.) বলেনঃ উমার (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেই কুরাইশদের সাথে বিবাদ আরম্ভ করে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কা’বায় নামাজ পড়ে ছাড়লেন। আমরাও সকলে তাঁর সাথে নামাজ পড়েছিলাম।’ সুহায়িব ইন সিনান বলেনঃ তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর আমরা কা’বার পাশে জটলা করে বসতাম, কা’বা ঘর তাওয়াফ করতাম, আমাদের সাথে কেউ রুঢ় ব্যবহার করলে তার প্রতিশোধ নিতাম এবং আমাদের উপর যে কোন আক্রমণ আসলে তা প্রতিহত করতাম।’ (তাবাকাতঃ ৩/২৬৯) তাই রাসুল (সাঃ) তাঁকে ‘আল-ফারুক উপাধীতে ভূষিত করেছিলেন। কারণ তারই কারনে ইসলাম ও কুফরের মধ্যে প্রকাশ্য বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ উমারের জিহ্বা ও অন্তঃকরনে আল্লাহ তাআলা সত্যকে স্থায়ী করে দিয়েছেন। তাই সে ‘ফারুক’, আল্লাহ তাঁর দ্বারা সত্য ও মিথ্যার মধ্যের পার্থক্য করে দিয়েছেন।’ (তাবাকাতঃ ৩/২৭০)

মক্কায় যারা মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন, রাসুল (সাঃ) তাদেরকে মদীনায় হিজরত করতে নির্দেশ দিলেন। আবু সালামা, আবদুল্লাহ বিন আশহাল, বিলাল ও আম্মার বিন ইয়াসিরের মদীনায় হিজরাতের পর বিশজন আত্মীয়-বন্ধুসহ উমার (রা.) মদীনার পথে পা বাড়ালেন। এ বিশজনের মধ্যে তাঁর ভাই যায়িদ, ভাইয়ের ছেল সাঈদ, জামাই খুনাইসও ছিলেন। মদীনার উপকন্ঠে কুবা পল্লীতে তিনি রিফায়া ইবন আবদিল মুনজিরের বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন।

উমারের হিজরাত অন্যান্যদের হিজরাতের মধ্যে একটা বিশেষ পার্থক্য ছিল। অন্যদের হিজরাত ছিল চুপে চুপে। সকলের অগোচরে। আর উমারের হিজরাত ছিল প্রকাশ্যে। তার মধ্যে ছিল কুরাইশদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ও বিদ্রোহের সুর। মক্কা থেকে মদীনায় যাত্রার পূর্বে তিনি প্রথমে কা’বা তাওয়াফ করলেন। তারপর কুরাইশদের আড্ডায় গিয়ে তিনি ঘোষনা করলেন, আমি মদীনা চলছি। কেউ যদি তার মাকে পুত্রশোক দিতে চায়, সে যেন এ উপত্যকার অপর প্রান্তে আমার মুখোমুখি হয়। এমন একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে তিনি মদীনার পথ ধরলেন। কিন্ত কেউ এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণের দুঃসাহস করল না। (তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহঃ খিদরী বেক, ১/১৯৮)

বিভিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায়, রাসুল (সাঃ) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনের সাথে উমারের দ্বীনি ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। আবু বকর সিদ্দিক, উয়াইস ইবন সায়িদা, ইতবান ইবন মালিক ও মুয়াজ ইবন আফরা (রা.) ছিলেন উমারের দ্বীনি ভাই। তবে এটা নিশ্চিত যে, মদীনায় হিজরাতের পর বনী সালেমের সর্দার ইতবান ইবন মালিকের সাথে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। (তাবাকাতঃ ৩/২৭২)

হিজরী প্রথম সাল হতে রাসুলে কারীম (সাঃ) এর ইন্তিকাল পর্যন্ত উমারের কর্মজীবন প্রকৃতপক্ষে রাসুল (সাঃ) এর কর্মময় জীবনের একটা অংশ বিশেষ। রাসুল (সাঃ)-কে যত যুদ্ধ করতে হয়েছিল, যত চুক্তি করতে হয়েছিল, কিংবা সময় সময় যত বিধিবিধান প্রবর্তন করতে হয়েছিল এবং ইসলাম প্রচারের জন্য যত পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল তার এমন একটি ঘটনাও নেই, যা উমারের সক্রিয় অংশ গ্রহণ ছাড়া সম্পাদিত হয়েছে। এইজন্য এই সব ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ লিখতে গেলে তা উমারের (রা.) জীবনী না হয়ে রাসুল (সাঃ) এর জীবনীতে পরিণত হয়ে যায়। তাঁর কর্মবহুল জীবন ছিল রাসুল (সাঃ) এর জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

হযরত উমার (রা.) বদর, ওহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধেই রাসুল (সাঃ) এর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া আরো বেশ কিছু সারিয়্যা (যে সব ছোট অভিযানে রাসুল (সাঃ) নিজে উপস্থিত হননি)-তে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বদর যুদ্ধের পরামর্শ দান ও সৈন্য চালনা হতে আরম্ভ করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রাসুল (সাঃ) এর সাথে দৃঢ়ভাবে কাজ করেন। বদর যুদ্ধের বন্দীদের সম্পর্কে তাঁর পরামর্শই আল্লাহ পাকের পছন্দ হয়েছিল। এ যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা নিম্নরুপঃ

১. এ যুদ্ধে কুরাইশ বংশের প্রত্যেক শাখা হতে লোক যোগদান করে; কিন্ত বনী আ’দী অর্থাৎ উমারের খান্দান হতে একটি লোকও যোগদান করেনি। উমারের প্রভাবেই এমনটি হয়েছিল।
২. এ যুদ্ধে ইসলামের বিপক্ষে ‘উমারের সাথে তাঁর গোত্র ও চুক্তিবদ্ধ লোকদের থেকে মোট বারোজন লোক যোগদান করেছিল।
৩. এ যুদ্ধে হযরত উমার (রা.) তাঁর আপন মামা আ’সী ইবন হিশামকে নিজ হাতে হত্যা করেন। এ হত্যার মাধ্যম তিনিই সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন, সত্যের পথে আত্মীয় ও প্রিয়জনের প্রভাব প্রাধান্য লাভ করতে পারে না।

উহুদ যুদ্ধেও হযরত উমার (রা.) ছিলেন একজন অগ্রসৈনিক। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম সৈন্যরা যখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেন এবং রাসুল (সাঃ) আহত হয়ে মুষ্টিময় কিছু সঙ্গী-সাথী সহ পাহাড়ের এক নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেন, তখন কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান নিকটবর্তী হয়ে উচ্চস্বরে মুহাম্মদ (সাঃ), আবু বকর (রা.), উমার (রা.) নাম ধরে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা বেচে আছ কি? রাসুল (সাঃ) এর ইঙ্গিতে কেউই আবু সুফিয়ানের জবাব দিল না। কোন সাড়া না পেয়ে আবু সুফিয়ান ঘোষনা করলঃ নিশ্চয় তারা সকলে নিহত হয়েছে।’ এ কথায় উমারের পৌরুষে আঘাত লাগল তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। বলে উঠলেনঃ ওরে আল্লাহর দুশমন! আমরা সবাই জীবিত।’ আবু সুফিয়ান বললোঃ উ’লু হুবল - হুবলের জয় হোক। রাসুল (সাঃ) এর ইঙ্গিতে উমার (রা.) জবাব দিলেনঃ ‘আল্লাহু আ’লা ওয়া আজাল্লু -আল্লাহ মহান ও সম্মানী

খন্দকের যুদ্ধেও উমার (রা.) সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। খন্দকের একটি বিশেষ স্থান রক্ষা করার ভার পড়েছিল উমারের উপর। আজও সেখানে তাঁর নামে একটি মসজিদ বিদ্যমান থেকে তাঁর সেই স্মৃতির ঘোষনা করছে। এ যুদ্ধে একদিন তিনি প্রতিরক্ষায় এত ব্যস্ত ছিলেন যে তাঁর আসরের নামাজ ক্বাজা হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। রাসুল (সাঃ) তাঁকে সান্তনা দিয়ে বলেছিলেনঃ ব্যস্ততার কারণে আমিও এখন পর্যন্ত নামাজ আদায় করতে পারিনি।’ (আল-ফারুকঃ শিবলী নু’মানী-২৫)

হুদাইবিয়ার শপথের পুর্বেই হযরত উমার (রা.) যুদ্ধের প্রস্ততি আরম্ভ করে দিলেন। পুত্র আবদুল্লাহকে পাঠালেন কোন এক আনসারীর নিকট থেকে ঘোড়া আনার জন্য। তিনি এসে খবর দিলেন যে, লোকেরা রাসুল (সাঃ) এর হাতে বাই’আত করছেন। উমার (রা.) তখর রণসজ্জায় সজ্জিত। এ অবস্থায় তিনি দৌড়ে গিয়ে রাসুল (সাঃ) এর হাতে বাই’আত করেন।

হুদাইবিয়ার সন্ধির শর্তগুলো বাহ্য দৃষ্টিতে মুসলিমদের জন্য অপমানজনক মনে হলো। উমার (রা.) উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। প্রথমে আবু বকর পরে রাসুল (সাঃ) এর নিকট এ সন্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন। রাসুল (সাঃ) বললেনঃ আমি আল্লাহর রাসুল। আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত কোন কাজ আমি করিনে।’ উমার (রা.) শান্ত ও অনুতপ্ত হলেন। নফল রোযা রেখে, নামাজ পড়ে, গোলাম আযাদ করে এবং দান খয়রাত করে এ গোস্তাখীর কাফফারা আদায় করলেন।

খাইবারে ইয়াহুদীদের অনেকগুলি সুরক্ষিত দূর্গ ছিল। কয়েকটি সহজেই জয় হলো। কিন্তু দু’টি কিছুতেই জয় করা গেল না। রাসুল (সাঃ) প্রথম দিন আবু বকর, দ্বিতীয় দিন উমারকে পাঠালেন দূর্গ দু’টি জয় করার জন্য। তাঁরা দু’জনেই ফেরত আসলেন অকৃতকার্য হয়ে। তৃতীয়দিন রাসুল (সাঃ) ঘোষনা করলেনঃ আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে ইসলামের পতকা দিব, যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন।’ পরদিন সাহাবায়ে কিরাম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাসুল (সাঃ) এর দরবারে উপস্থিত হলেন। প্রত্যেকেরই অন্তরে এ গৌরব অর্জনের বাসনা। উমার (রা.) বললেনঃ আমি খাইবারের এ ঘটনা ব্যতিত কোনদিনই সেনাপতিত্ব বা সরদারীর জন্য লালায়িত হইনি। সে দিনের সেই গৌরব ছিনিয়ে নিয়েছিলেন শেরে-খোদা আলী (রা.)।’

খাইবারের বিজিত ভূমি মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হলো। হযরত উমার (রা.) তাঁর ভাগের অংশটুকু আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিলেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই প্রথম ওয়াকফ। (আল-ফারুকঃ ৩০)

মক্কা বিজয়ের সময় হযরত উমার (রা.) ছায়ার মত রাসুল (সাঃ)-কে সঙ্গ দেন। ইসলামের মহাশত্রু আবু সুফিয়ান আত্মসমর্পন করতে এলে উমার (রা.) রাসুল (সাঃ)-কে অনুরোধ করেন, অনুমতি দিন এখনই ওর দফা করে দেই। এদিন মক্কার পুরুষরা রাসুল (সাঃ) এর হাতে এবং মহিলারা রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশে হযরত উমারের হাতে বাই’আত গ্রহণ করেছিলেন।

হুনাইন অভিযানেও হযরত উমার (রা.) অংশগ্রহণ করে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছিলেন। এ যুদ্ধে কাফেরদের তীব্র আক্রমণে বারো হাজার মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল। ইবন ইসহাক বলেনঃ মুহাজির ও আনসারদের মাত্র কয়েকজন বীরই এই বিপদকালে রাসুল (সাঃ) এর সাথে দৃঢ়পদ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আবু বকর, উমার (রা.), আব্বাসের (রা.) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তাবুক অভিযানের সময় রাসুল (সাঃ) এর আবেদনে সাড়া দিয়ে হযরত উমার (রা.) তাঁর মোট সম্পদের অর্ধেক রাসুল (সাঃ) এর হাতে তুলে দেন।

রাসুল (সাঃ) এর ইন্তিকালের খবর শুনে হযরত উমার (রা.) কিছুক্ষন স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকেন। তারপর মসজিদে নববীর সামনে গিয়ে তরবারী কোষমুক্ত করে ঘোষনা দেন, যে বলবে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) ইন্তেকাল করেছেন, আমি তার মাথা দ্বিখন্ডিত করে ফেলবো।’ এ ঘটনা থেকে রাসুল (সাঃ) এর প্রতি উমারের ভক্তি ও ভালবাসার পরিমাণ সহজেই অনুমান করা যায়।

রাসুল (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর ‘সাকীফা বনী সায়েদায়’ দীর্ঘ আলোচনার পর উমার (রা.) খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে হযরত আবু বকরের হাতে খিলাফতের বাই’আত গ্রহণ করেন। ফলে খলিফা নির্বাচনের মহা সংকট সহজেই কেটে যায়।

খলিফা হযরত আবু বকর যখন বুঝতে পারলেন তাঁর অন্তিম সময় ঘনিয়ে এসেছে, মৃত্যুর পুর্বেই তিনি পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে যাওয়াকে তিনি কল্যাণকর মনে করলেন। তাঁর দৃষ্টিতে উমার (রা.) ছিলেন খিলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তি। তা সত্বেও উচু পর্যায়ের সাহাবীদের সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করা সমীচীন মনে করেন। তিনি আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা.)-কে ডেকে বললেনঃ উমার সম্পর্কে আপনার মতামত আমাকে জানান।’ তিনি বললেনঃ তিনিতো যে কোন ব্যক্তি হতে উত্তম; কিন্ত তাঁর চরিত্রে কিছু কঠোরতা আছে।’ আবু বকর বললেনঃ তার কারণ; আমাকে তিনি কোমল দেখেছেন, খিলাফতের দায়িত্ব কাঁধে পরলে এ কঠোরতা অনেকটা কমে যাবে।’ তারপর আবু বকর অনুরোধ করলেন, তাঁর সাথে আলোচিত বিষয়টি কারো সাথে ফাঁস না করার জন্য। অতঃপর তিনি উসমা বিন আফফানকে ডাকলেন। বললেন, আবু আবদিল্লাহ, উমার সম্পর্কে আপনি আপনার মতামত আমাকে জানান। উসমান বললেনঃ আমার থেকে আপনিই তাঁকে বেশী জানেন।’ আবু বকর বললেনঃ তা সত্বেও আপনার মতামত আমাকে জানান।’ উসমান বললেনঃ তাঁকে আমি যতটুকু জানি তাতে তাঁর বাইরে থেকে ভিতরটা বেশী ভাল। তাঁর মত দ্বিতীয় আর কেউ আমাদের মধ্যে নেই।’ আবু বকর (রা.) তাদের দুজনের মধ্যে আলাপের বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করে তাঁকে বিদায় দিলেন।

এভাবে বিভিন্নজনের কাছ হতে মতামত নেওয়া শেষ হলে তিনি উসমান ইবন আফফানকে ডেকে ডিকটেশন দিলেনঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। এটা আবু বকর ইবন আবী কুহাফার পক্ষ থেকে মুসলিমদের প্রতি অঙ্গীকার। আম্মা বা’দ – এতটুকু বলার পর তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। তারপর উসমান ইবন আফফান নিজেই সংযোজন করেন- ‘আমি তোমাদের জন্য উমার ইবন খাত্তাবকে খলিফা মনোনীত করলাম এবং এ ব্যাপারে তোমাদের কল্যাণ চেষ্টায় কোন ত্রুটি করি নাই’ অতঃপর আবু বকর সংজ্ঞা ফিরে পান। লিখিত অংশটুকু তাঁকে পড়ে শুনানো হলো। সবটুকু শুনে তিনি ‘আল্লাহু আকবর’ বলে উঠেন এবং বলেনঃ আমার ভয় হচ্ছিল, আমি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মারা গেলে লোকেরা মতভেদ সৃষ্টি করবে। উসমানকে লক্ষ্য করে তিনি আরো বলেনঃ আল্লাহ তাআলা ইসলাম ও মুসলিমদের পক্ষ থেকে আপনাকে কল্যাণ দান করুন।’”

তাবারী বলেনঃ অতঃপর আবু বকর উপস্থিত লোকদের দিকে তাকালেন। তাঁর স্ত্রী আসমা বিনত উমাইস তখন তাঁকে ধরে রেখেছিলেন। সমবেত লোকদের তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তিকে আমি আপনাদের জন্য মনোনীত করে যাচ্ছি তাঁর প্রতি কি আপনার সন্তুষ্ট? আল্লাহর কসম, মানুষের মতামত নিতে আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি। আমি উমার ইবনুল খাত্তাবকে আপনাদের খলিফা মনোনীত করেছি। আপনারা তাঁর কথা শুনুন, তাঁর আনুগত্য করুন। এভাবে উমারের (রা.) খিলাফত শুরু হয় হিজরী ১৩ সনের ২২শে জমাদিউস সানী মুতাবেক ১৩ই আগষ্ট, ৬৩৪ খ্রীষ্টাব্দ।

হযরত উমারের রাষ্ট্র শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা সম্ভব নয়। দশ বছরের স্বল্প সময়ে গোটা বাইজান্টাইন রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। তাঁর যুগে বিভিন্ন অঞ্চলসহ মোট ১০৩৬টি শহর বিজিত হয়। ইসলামী হুকুমাতের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠা মুলতঃ তাঁর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর শাসন ও ইনসাফের কথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কিংবদন্তীর মত ছড়িয়ে আছে।

হযরত উমার (রা.) প্রথম খলিফা যিনি আমিরুল মু’মিনীন উপাধি লাভ করেন। তিনিই সর্বপ্রথম হিজরী সন প্রবর্তন করেন, তারাবীর নামাজ জামা’আতে পড়ার ব্যবস্থা করেন, জনশাসনের জন্য দুররা বা ছড়ি ব্যবহার করেন, মদ্যপানে আশিটি বেত্রাঘাত নির্ধারন করেন, বহু রাজ্য জয় করেন, নগর পত্তন করেন, সেনাবাহিনীর স্তরভেদ ও বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন নির্দিষ্ট করেন, জাতীয় রেজিষ্টার বা নাগরিক তালিকা তৈরী করেন, কাজী নিয়োগ করেন এবং রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করেন।

উমার (রা.) ছিলেন রাসুলাল্লাহ (সাঃ) এর অন্যতম কাতিব। নিজ কন্যা হযরত হাফসাকে রাসুলাল্লাহ (সাঃ) এর সাথে বিয়ে দেন। তিনি রাসুলাল্লাহ (সাঃ) ও আবু বকর (রা.) এর মন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভুমিকা পালন করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ও পরে ব্যবসা ছিল তাঁর জীবিকার উপায়। খিলাফতের গুরুদায়িত্ব কাধে পরার পরেও কয়েক বছর পর্যন্ত ব্যবসা চালিয়ে যান। কিন্ত পরে তা অসম্ভব হয়ে দাড়ালে হযরত আলী (রা.) সহ উচু পর্যায়ের সাহাবীরা পরামর্শ করে বাইতুল মাল হতে বার্ষিক ৮০০ দিরহাম ভাতা নির্ধারন করেন। হিজরী ১৫ সনে বাইতুল মাল থেকে অন্য লোকদের ভাতা নির্ধারিত হলে বিশিষ্ট সাহাবীদের ভাতার সমান তাঁরও ভাতা ধার্য করা হয় পাঁচ হাজার দিরহাম।

বাইতুল মালের অর্থের ব্যাপারে হযরত উমারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইয়াতিমের অর্থের মত। ইয়াতিমের অর্থসম্পদ যেমন ইয়াতিমের অভিভাবক রক্ষনাবেক্ষন করে। ইয়াতিমের ও নিজের জন্য প্রয়োজনমত খরচ করতে পারে কিন্ত অপচয় করতে পারে না। প্রয়োজন না হলে ইয়াতিমের সম্পদ হতে হাত গুটিয়ে নিয়ে শুধু হিফাজত করে এবং ইয়াতিম বড় হলে তাকে তার সম্পদ ফিরিয়ে দেয়। বাইতুল মালের প্রতি হযরত উমারের (রা) এ দৃষ্টিভঙ্গিই সর্বদা তার কর্ম ও আচরণে ফুটে উঠেছে।

হযরত উমার (রা.) সব সময় একটা দুররা বা ছড়ি হাতে নিয়ে চলতেন। শয়তানও তাকে দেখে পালাতো। তাই বলে তিনি অত্যাচারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন কঠোর ন্যায় বিচারক। মানুষকে তিনি হৃদয় দিয়ে ভালবাসতেন, মানুষও তাঁকে ভালবাসতো। তাঁর প্রজা পালনের বহু কাহিনী ইতিহাসে পাওয়া যায়।

হযরত ফারুকে আমের ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে কুআন ও হাদীসে এত বেশী ইঙ্গিত ও প্রকাশ্য বাণী রয়েছে যে, সংক্ষিপ্ত কোন প্রবন্ধে তা প্রকাশ করা সম্ভব না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) র নিকট তাঁর স্থান অতি উচ্চে। এ জন্যে বলা হয়েছে, উমারের সব মতের সমর্থনেই সর্বদা কুনের আয়াত নাযিল হয়েছে। হযরত আলী (রা.) বর্ণনা করেনঃ ‘খাইরুল উম্মাতি বা’দা নাবিয়্যিহা আবু বকর সুম্মা উমার’ -নবী (সাঃ) এর পর উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম আবু বকর, তারপর উমার হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেনঃ উমারের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের বিজয়। তাঁর হিজরাত আল্লাহর সাহায্য এবং তাঁর খিলাফত আল্লাহর রহমত।’ উমারের যাবতীয় গুনাবলী লক্ষ্য করেই হুজুর (সাঃ) বলেছিলেনঃ ‘লাও কানা বা’দী নাবিয়্যুন লা কানা উমার (রা.)’ -আমার পরে কেউ নবী হলে উমারই হতো। কারণ তাঁর মধ্যে ছিল নবীদের স্বভাব বৈশিষ্ট্য।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও প্রসারের ক্ষেত্রে উমারের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তিনি আরবী কবিতা –পাঠন ও সংক্ষনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। আরবী ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ; তাঁর সামনে ভাষার ব্যাপারে কেউ ভুল করলে শাসিয়ে দিতেন। বিশুদ্ধভাবে আরবী ভাষা শিক্ষা করাকে তিনি দ্বীনের অঙ্গ বলে বিশ্বাস করতেন। আল্লামা জাহাবী ‘তাজকিরাতুল হুফফাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেনঃ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে উমার (রা.) ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, একই হাদীস বিভিন্ন সনদের মাধ্যমে বর্ণনার প্রতি তিনি তাগিদ দিতেন।’

প্রখ্যাত সাহাবী মুগীরা ইবন শু’বার (রা.) অগ্নি উপাসক দাস আবু লুলু ফিরোজ ফজরের নামাযে দাড়ানো অবস্থায় এ মহান খলিফাকে ছুরিকাঘাত করে। আহত হওয়ার তৃতীয় দিনে হিজরী ২৩ সনের ২৭ শে জিলহজ্জ, বুধবার তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে আলী, উসমান, আবদুর রহমান ইবন আউফ, সা’দ, যুবাইর ও তালহা (রা.) -এ ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবীর উপর তাদের মধ্য থেকে কোন একজনকে খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পন করে যান। হযরত সুহায়িব (রা.) জানাজার নামাজ পড়ান। রওজায়ে নববীর মধ্যে হযরত সিদ্দিকে আকবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তাঁর খিলাফতকাল দশ বছর ৬ মাস ৪ দিন।

11.10.14

আলী ইবন আবী তালিব (রা.)

আলী ইবন আবী তালিব (রা.)

নাম আলী, লকব আসাদুল্লাহ, হায়দার ও মুরতাজা, কুনিয়াত আবুল হাসান ও আবু তুরাব। পিতা আবু তালিব আবদু মান্নাফ, মাতা ফাতিমা। পিতা-মাতা উভয়ে কুরাইশ বংশের হাশিমী শাখার সন্তান। আলী রাসূল (সাঃ)-এর আপন চাচাতো ভাই।

রাসূল (সাঃ)-এর নবুওয়্যাত প্রাপ্তির দশ বছর পূর্বে তাঁর জন্ম। আবু তালিব ছিলেন ছাপোষা মানুষ। চাচাকে একটু সাহায্য করার উদ্দেশ্যে রাসূল (সাঃ) নিজ দায়িত্বে নিয়ে নেন আলীকে। এভাবে নবী পরিবারের একজন সদস্য হিসাবে তিনি বেড়ে উঠেন। রাসূল (সাঃ) যখন নবুওয়্যাত লাভ করেন, আলীর বয়স তখন নয় থেকে এগার বছরের মধ্যে। একদিন ঘরের মধ্যে দেখলেন, রাসূলে কারীম (সাঃ) ও উম্মুল মূমিনীন হযরত খাদীজা (রা.) সিজদাবনত। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ কি? উত্তর পেলেন, এক আল্লাহর ইবাদত করছি। তোমাকেও এর দাওয়াত দিচ্ছি। আলী বিনা দ্বিধায় কবুল করেন এবং মুসলমান হয়ে যান। কুফর, শিরক ও জাহিলিয়্যাতের কোন অপকর্ম তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।

রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সর্বপ্রথম হযরত খাদীজা (রা.) নামায আদায় করেন। এ ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নেই। অবশ্য আবু বকর, আলী ও যায়িদ বিন হারিসা-এ তিন জনের মধ্যে কে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। (তাবাকাতঃ ৩/২১)। ইবনে আব্বাস ও সালমান ফারসীর (রা.) বর্ণনা মতে, উম্মুল মু’মিনীন খাদীজার (রা.) পর আলী (রা.) সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহন করেন। তবে এ সম্পর্কে সবাই একমত যে, মহিলাদের মধ্যে খাদীজা, বয়স্ক আযাদ পুরুষদের মধ্যে আবু বকর, দাসদের মধ্যে যায়িদ বিন হারিসা ও কিশোরদের মধ্যে আলী (রা.) প্রথম মুসলমান।

নবুওয়্যাতের তৃতীয় বছরে রাসূলে কারীম (সাঃ) হুকুম দিলেন আলীকে, কিছু লোকের আপ্যায়নের ব্যবস্থা কর। আবদুল মুত্তালিব খান্দানের সব মানুষ উপস্থিত হল। আহার পর্ব শেষ হলে রাসূল (সাঃ) তাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ “‘আমি এমন এক জিনিস নিয়ে এসেছি, যা দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্য কল্যাণকর। আপনাদের মধ্যে কে আমার সঙ্গী হবেন?’ সকলেই নিরব। হঠাৎ আলী (রা.) বলে উঠলেনঃ যদিও আমি অল্প বয়স্ক, চোখের রোগে আক্রান্ত, দুর্বল দেহ, আমি সাহায্য করবো আপনাকে।’”

হিজরতের সময় হল। অধিকাংশ মুসলমান মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে গেছেন। রাসূলে কারীম (সাঃ) আল্লাহর হুকুমের প্রতীক্ষায় আছেন। এ দিকে মক্কার ইসলাম বিরোধী শক্তি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাসূলে কারীম (সাঃ)-কে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার। আল্লাহ তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে এ খবর জানিয়ে দেন। তিনি মদীনায় হিজরাতের অনুমতি লাভ করেন। কাফিরদের সন্দেহ না হয়, এজন্য আলীকে রাসূল (সাঃ) নিজের বিছানায় ঘুমাবার নির্দেশ দেন এবং সিদ্দীকে আকবরকে সঙ্গে করে রাতের অন্ধকারে মদীনা রওয়ানা হন। আলী (রা.) রাসূল (সাঃ)-এর চাদর মুড়ি দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে অত্যন্ত আনন্দ সহকারে ঘুমালেন। তিনি জানতেন, এ অবস্থায় তার জীবন চলে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর প্রত্যয় ছিল, এভাবে জীবন গেলে তার চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কিছু হবে না। সুবহে সাদিকের সময় মক্কার পাষণ্ডরা তাদের অসৎ উদ্দেশ্যে ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পেল, রাসূল (সাঃ)-এর স্থানে তাঁরই এক ভক্ত জীবন কুরবানীর জন্য প্রস্তুত হয়ে শুয়ে আছে। তারা ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহ তায়ালা আলীকে (রা.) হিফাজত করেন।

এ হিজরত প্রসঙ্গে আলী (রা.) বলেনঃ রাসূল (সাঃ) মদীনা রওয়ানার পূর্বে আমাকে নির্দেশ দিলেন, আমি মক্কায় থেকে যাওয়ার জন্য এবং লোকদের যে সব আমানত তাঁর কাছে আছে তা ফেরত দেওয়ার জন্য। এ জন্যেই তো তাঁকে আল-আমিনবলা হতো। আমি তিনদিন মক্কায় থাকলাম। তারপর রাসূল (সাঃ)-এর পথ ধরে মদীনার দিকে বেরিয়ে পড়লাম। অবশেষে বনী আমর ইবন আওফ-এ, যেখানে রাসূল (সাঃ) অবস্থান করছিলেন, আমি উপস্থিত হলাম। কুলসুম ইবন হিদামের বাড়ীতে আমার আশ্রয় হল। অন্য একটি বর্ণনায়, আলী (রা.) রবিউল আউয়াল মাসের মাঝামাঝি কুবায় উপস্থিত হন। রাসূল (সাঃ) তখনও কুবায় ছিলেন। (তাবাকাতঃ ৩/২২)

মাদানী জীবনের সূচনাতে রাসূল (সাঃ) যখন মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে উখ্যুওয়াতবা দ্বীনি-ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক কায়েম করছিলেন, তিনি নিজের একটি হাত আলীর (রা.) কাঁধে রেখে বলেছিলেন, ‘আলী তুমি আমার ভাই। তুমি হবে আমার এবং আমি হব তোমার উত্তরাধিকারী।’ (তাবাকাতঃ ৩/২২) পরে রাসূল (সাঃ) আলী ও সাহল বিন হুনাইফের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক কায়েম করে দিয়েছিলেন। (তাবাকাতঃ ৩/২৩)

হিজরী দ্বিতীয় সনে আলী (রা.) রাসূল (সাঃ)-এর জামাই হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। রাসূল (সাঃ)-এর প্রিয়তমা কন্যা খাতুনে জান্নাত ফাতিমার (রা.) সাথে তাঁর বিয়ে হয়।

ইসলামের জন্য আলী (রা.) অবদান অবিস্বরণীয়। রাসূল (সাঃ)-এর যুগের সকল যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সাহসিকতার ও বীরত্বের পরিচয় তিনিই দেন। এ কারণে হুজুর (সাঃ) তাঁকে হায়দারউপাধিসহ যুল-ফিকারনামক একখানি তরবারি দান করেন।

একমাত্র তাবুক অভিযান ছাড়া সকল যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। বদরে তাঁর সাদা পশমী রুমালের জন্য তিনি ছিলেন চিহ্নিত। কাতাদা থেকে বর্ণিত, বদরসহ প্রতিটি যুদ্ধে আলী ছিলেন রাসূল (সাঃ)-এর পতাকাবাহী, (তাবাকাতঃ ৩/২৩)। ওহুদে যখন অন্য সব মুজাহিদ পরাজিত হয়ে পালিয়েছিলেন, তখন যে কজন মুষ্টিমেয় সৈনিক রাসূল (সাঃ)-কে কেন্দ্র করে ব্যুহ রচনা করেছিলেনআলী (রা.) ছিলেন তাঁদের একজন। অবশ্য পলায়নকারীদের প্রতি আল্লাহর ক্ষমা ষোষিত হয়েছে।

ইবন ইসহাক থেকে বর্ণিত, খন্দকের দিনে আমর ইবন আবদ-উদ্দ বর্ম পরে বের হল। সে হুঙ্কার ছেড়ে বললোঃ ‘কে আমার সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে?’ আলী উঠে দাঁড়িয়ে বললেনঃ ‘হে আল্লাহর নবী, আমি প্রস্তুত।’ রাসূল (সাঃ) বললেনঃ ‘এ হচ্ছে আমর, তুমি বস।’ ‘আমর আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলোঃ ‘আমার সাথে লড়বার মত কেউ নেই? তোমাদের সেই জান্নাত এখন কোথায়, যাতে তোমাদের নিহতরা প্রবেশ করবে বলে তোমাদের ধারণা? তোমাদের কেউ এখন আমার সাথে লড়তে সাহসী নয়?’ আলী (রা.) উঠে দাঁড়ালেন। বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রস্তুত।’ রাসূল (সাঃ) বললেনঃ ‘বস।’ তৃতীয় বারের মত আহবান জানিয়ে আমর তার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলো। আলী (রা.) আবারো উঠে দাঁড়িয়ে আরজ করলেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি প্রস্তুত।’ রাসূল (সাঃ) বললেনঃ ‘সে তো আমর।’ আলী (রা.) বললেনঃ ‘তা হোক।’ এবার আলী (রা.) অনুমতি পেলেন। আলী (রা.) তাঁর একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে আমরের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমর জিজ্ঞেস করলোঃ ‘তুমি কে?’ বললেনঃ ‘আলী।’ সে বললোঃ ‘আবদে মান্নাফের ছেলে?’ আলী (রা.) বললেনঃ ‘আমি আবু তালিবের ছেলে আলী।’ সে বললোঃ ‘ভাতিজা, তোমার রক্ত ঝরানো আমি পসন্দ করিনা।’ আলী বললেনঃ ‘আল্লাহর কসম, তোমার রক্ত ঝরানো আমি অপসন্দ করিনা।’ একথা শুনে আমর ক্ষেপে গেল। নিচে নেমে এসে তরবারী টেনে বের করে ফেললো। সে তরবারী যেন আগুনের শিখা। সে এগিয়ে আলীর ঢালে আঘাত করে ফেঁড়ে ফেলল। আলী পাল্টা এক আঘাতে তাকে ধরাশায়ী করে ফেললেন। এ দৃশ্য দেখে রাসূল (সাঃ) তাকবীর ধ্বনি দিয়ে উঠেন। তারপর আলী নিজের একটি কবিতা আবৃত্তি করতে করতে রাসূল (সাঃ)-এর কাছে ফিরে আসেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াঃ ইবনে কাসীর-৪/১০৬)

সপ্তম হিজরীতে খাইবার অভিযান চালানো হয়। সেখানে ইয়াহুদীদের কয়েকটি সুদৃঢ় কিল্লা ছিল। প্রথমে সিদ্দীকে আকবর, পরে ফারুকে আজমকে কিল্লাগুলি পদানত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কেউ সফলকাম হতে পারলেন না। নবী (সাঃ) ঘোষনা করলেনঃ কাল আমি এমন এক বীরের হাতে ঝান্ডা তুলে দেব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রিয়পাত্র। তারই হাতে কিল্লাগুলির পতন হবে।পরদিন সকালে সাহাবীদের সকলেই আশা করছিলেন এই গৌরবটি অর্জন করার। হঠাৎ আলীর ডাক পড়লো। তাঁরই হাতে খাইবারের সেই দুর্জয় কিল্লাগুলির পতন হয়।

তাবুক অভিযানে রওয়ানা হওয়ার সময় রাসূল (সাঃ) আলীকে (রা.) মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান। আলী (রা.) আরজ করলেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যাচ্ছেন, আর আমাকে নারী ও শিশুদের কাছে ছেড়ে যাচ্ছেন?’ উত্তরে রাসূল (সাঃ) বললেনঃ ‘হারুন যেমন ছিলেন মুসার, তেমনি তুমি হচ্ছো আমার প্রতিনিধি। তবে আমার পরে কোন নবী নেই।’ (তাবাকাত ৩/২৪)

নবম হিজরীতে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে প্রথম ইসলামী হজ্জ্ব অনুষ্ঠিত হয়। এ বছর সিদ্দীকে আকবর (রা.) ছিলেন আমীরুল হজ্জ্ব। তবে কাফিরদের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি বাতিল ঘোষণার জন্য রাসূল (সাঃ) আলীকে (রা.) বিশেষ দূত হিসেবে প্রেরণ করেন।

দশম হিজরীতে ইয়ামানে ইসলাম প্রচারের জন্য খালিদ সাইফুল্লাহকে পাঠানো হয়। ছমাস চেষ্টার পরও তিনি সফলকাম হতে পারলেন না। ফিরে এলেন। রাসূল (সাঃ) আলীকে (রা.) পাঠানোর কথা ঘোষণা করলেন। আলী (রা.) রাসূল (সাঃ)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ ‘আপনি আমাকে এমন লোকদের কাছে পাঠাচ্ছেন যেখানে নতুন নতুন ঘটনা ঘটবে অথচ বিচারের ক্ষেত্রে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই।’ উত্তরে রাসূল (সাঃ) বললেনঃ ‘আল্লাহ তোমাকে সঠিক রায় এবং তোমার অন্তরে শক্তিদান করবেন।’ তিনি আলীর (রা.) মুখে হাত রাখলেন। আলী (রা.) বলেনঃ অতঃপর আমি কক্ষণো কোন বিচারে দ্বিধাগ্রস্ত হইনি। যাওয়ার আগে রাসূল (সাঃ) নিজ হাতে আলীর (রা.) মাথায় পাগড়ী পরিয়ে দুআ করেন। আলী (রা.) ইয়ামানে পৌঁছে তাবলীগ শুরু করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে সকল ইয়ামানবাসী ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং হামাদান গোত্রের সকলেই মুসলমান হয়ে যায়। রাসূল (সাঃ) আলীকে (রা.) দেখার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন। তিনি দুআ করেনঃ ‘আল্লাহ, আলীকে না দেখে যেন আমার মৃত্যু না হয়।’ আলী (রা.) বিদায় হজ্জের সময় ইয়ামান থেকে হাজির হয়ে যান।

রাসূল (সাঃ)-এর ওফাতের পর তাঁর নিকট-আত্মীয়রাই কাফন দাফনের দায়িত্ব পালন করেন। আলী (রা.) গোসল দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। মুহাজির ও আনসারগণ তখন দরজার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।

আবু বকর, উমর ও উসমানের (রা.) খিলাফত মেনে নিয়ে তাঁদের হাতে বাই’আত করেন এবং তাঁদের যুগের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরীক থাকেন। অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতেও উসমানকে (রা.) পরামর্শ দিয়েছেন। যেভাবে আবু বকরকে সিদ্দীক’, উমারকে ফারুকএবং উসমানকে গনীবলা হয়, তেমনিভাবে তাঁকেও আলী মুরতাজাবলা হয়। আবু বকর ও উমারের যুগে তিনি মন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। উসমানও সব সময় তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। (মারুজুজ জাহাবঃ ২/২)। বিদ্রোহীদের দ্বারা উসমান (রা.) ঘেরাও হলে তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে আলীই (রা.) সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেন। সেই ঘেরাও অবস্থায় উসমান (রা.) বাড়ির নিরাপত্তার জন্য তিনি তাঁর দুপুত্র হাসান ও হোসাইনকে নিয়োগ করেন। (আল-ফিতনাতুল কুবরাঃ ডাঃ ত্বাহা হোসাইন)

উমার (রা.) ইনতিকালের পূর্বে ছজন বিশিষ্ট সাহাবীর নাম উল্লেখ করে তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের অসীয়াত করে যান। আলীও (রা.) ছিলেন তাদের একজন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আলীর (রা.) সম্পর্কে মন্তব্য করেনঃ ‘লোকেরা যদি আলীকে (রা.) খলিফা বানায়, তবে সে তাদেরকে ঠিক রাস্তায় পরিচালিত করতে পারবে।’ (আল-ফিতনাতুল কুবরা)। উমার (রা.) বাইতুল মাকদিস সফরের সময় আলীকে (রা.) মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান।

উসমানের (রা.) শাহাদাতের পর বিদ্রোহীরা তালহা, যুবাইর ও আলীকে (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চাপ দেয়। প্রত্যেকেই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানান। বিভিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায়, আলী (রা.) বার বার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন। অবশেষে মদীনাবাসীরা আলীর (রা.) কাছে গিয়ে বলে, খিলাফতের এ পদ এভাবে শূন্য থাকতে পারে না। বর্তমানে এ পদের জন্য আপনার চেয়ে অধিক উপযুক্ত কোন ব্যক্তি নেই। আপনিই এর হকদার। মানুষের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত তিনি খিলাফতের দাযিত্ব গ্রহণে সম্মত হন। তবে শর্তারোপ করেন যে, আমার বাই’আত গোপনে হতে পারবে না। এজন্য সর্ব শ্রেণীর মুসলমানের সম্মতি প্রয়োজন। মসজিদে নববীতে সাধারণ সভা হলো। মাত্র ষোল অথবা সতরো জন সাহাবা ছাড়া সকল মুহাজির ও আনসার আলীর (রা.) হাতে বাই’আত করেন।

অত্যন্ত জটিল এক পরিস্থিতির মধ্যে আলী (রা.) খিলাফতের সূচনা হয়। খলিফা হওয়ার পর তাঁর প্রথম কাজ ছিল উসমান (রা.) হত্যাকারীদের শাস্তির বিধান করা। কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। প্রথমতঃ হত্যাকারীদের কেউ চিনতে পারেনি। উসমানের স্ত্রী নায়িলা হত্যাকারীদের দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের কাউকে চিনতে পারেননি। মুহাম্মাদ বিন আবু বকর হত্যার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু উসমানের এক ক্ষোভ-উক্তির মুখে তিনি পিছটান দেন। মুহাম্মাদ বিন আবু বকরও হত্যাকারীদের চিনতে পারেনি। দ্বিতীয়তঃ মদীনা তখন হাজার হাজার বিদ্রোহীদের কব্জায়। তারা আলীর (রা.) সেনাবাহিনীর মধ্যেও ঢুকে পড়েছে। কিন্তু তাঁর এই অসহায় অবস্থা তৎকালীন অনেক মুসলমানই উপলদ্ধি করেননি। তারা হযরত আলীর (রা.) নিকট তক্ষুণি উসমানের কিসাসদাবী করেন। এই দাবী উত্থাপনকারীদের মধ্যে উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.)-সহ তালহা ও যুবাইরের (রা.) মত বিশিষ্ট সাহাবীরাও ছিলেন। তাঁরা আয়িশার (রা.) নেতৃত্বে সেনাবাহিনীসহ মক্কা থেকে বসরার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তাঁদের সমর্থকদের সংখ্যা ছিল বেশি। আলীও (রা.) তাঁর বাহিনীসহ সেখানে পৌঁছেন। বসরার উপকন্ঠে বিরোধী দুই শিবির মুখোমুখি হয়। আয়িশা (রা.) আলীর (রা.) কাছে তাঁর দাবী পেশ করেন। আলীও (রা.) তাঁর সমস্যাসমূহ তুলে ধরেন। যেহেতু উভয় পক্ষেই ছিল সততা ও নিষ্ঠা, তাই নিষ্পত্তি হয়ে যায়। তালহা ও যুবাইর (রা.) ফিরে চললেন। আয়িশাও (রা.) ফেরার প্রস্তুতি শুরু করলেন। কিন্তু হাঙ্গামা ও অশান্তি সৃষ্টিকারীরা উভয় বাহিনীতে ছিল। তাই আপোষ মীমাংসায় তারা ভীত হয়ে পড়ে। তারা সুপরিকল্পিতভাবে রাতে অন্ধকারে এক পক্ষ অন্য পক্ষের শিবিরে হামলা চালিয়ে দেয়। ফল এই দাড়ায়, উভয় পক্ষের মনে এই ধারনা জন্মালো যে, আপোষ মীমাংসার নামে ধোঁকা দিয়ে প্রতিপক্ষ তাঁদের উপর হামলা করে বসেছে। পরিপূর্ণ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আলীর (রা.) জয় হয়। তিনি বিষয়টি আয়েশাকে (রা.) বুঝাতে সক্ষম হন। আয়িশা (রা.) বসরা থেকে মদীনায় ফিরে যান।

যুদ্ধের সময় আয়িশা উটের উপর সওয়ার ছিলেন। ইতিহাসে তাই এ যুদ্ধ উটের যুদ্ধনামে খ্যাত। হিজরী ৩৬ সনের জামাদি-উস-সানী মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আশারায়ে মুবাশশারার সদস্য তালহা ও যুবাইর (রা.) সহ উভয় পক্ষে মোট ১৩,০০০ মুসলমান শহীদ হন। অবশ্য এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। আলী (রা.) ১৫ দিন বসরায় অবস্থানের পর কুফায় চলে যান। রাজধানী মদীনা হতে কুফায় স্থানান্তরিত হয়।

এই উটের যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের প্রথম আত্মঘাতী সংঘর্ষ। অনেক সাহাবী এ যুদ্ধে কোন পক্ষেই যোগদান করেন নি। এই আত্মঘাতী সংঘর্ষের জন্য তাঁরাও ব্যথিত হয়েছিলেন। আলীর (রা.) বাহিনী যখন মদীনা হতে রওয়ানা হয়, মদীনাবাসীরা তখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। আয়িশার (রা.) সাথে তো একটা আপোষ রফায় আসা গেল। কিন্তু সিরিয়ার গভর্ণর মুয়াবিয়ার (রা.) সঙ্গে কোন মীমাংসায় পৌঁছা গেল না। আলী (রা.) তাকে সিরিয়ার গভর্ণর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। মুয়াবিয়া (রা.) বেঁকে বসলেন। আলীর (রা.) নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, ‘উসমান হত্যার কিসাস না হওয়া পর্যন্ত তিনি আলীকে খলিফা মানবেন না।’

হিজরী ৩৭ সনের সফর মাসে সিফফীননামক স্থানে হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া (রা.) বাহিনীর মধ্যে এক সংঘর্ষ ঘটে যায়। এ সংঘর্ষ ছিল উটের যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ। উভয় পক্ষের ৯০,০০০ (নব্বই হাজার) মুসলমান শাহাদাৎ বরণ করেন। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত সাহাবী আম্মার বিন ইয়াসীর, খুযাইমা ইবন সাবিত ও আবু আম্মারা আল-মাযিনীও (রা.) ছিলেন। তাঁরা সকলেই আলীর (রা.) পক্ষে মুয়াবিয়ার (রা.) বাহিনীর হাতে শহীদ হন। উল্লেখ্য যে, আম্মার বিন ইয়াসীর সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেনঃ আফসুস, একটি বিদ্রোহী দল আম্মারকে হত্যা করবে।’ (সহীহ বুখারী) সাতাশজন প্রখ্যাত সাহাবী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুয়াবিয়াও হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী। অবশ্য মুয়াবিয়া (রা.) হাদীসটির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এতকিছুর পরও বিষয়টির ফায়সালা হলো না।

সিফফীনের সর্বশেষ সংঘর্ষে, যাকে ‘লাইলাতুল হারবলা হয়, আলীর (রা.) জয় হতে চলছিল। মুয়াবিয়া (রা.) পরাজয়ের ভাব বুঝতে পেরে পবিত্র কুর’আনের মাধ্যমে মীমাংসার আহবান জানালেন। তার সৈন্যরা বর্শার মাথায় কুর’আন ঝুলিয়ে উঁচু করে ধরে বলতে থাকে, এই কুর’আন আমাদের এ দ্বন্দ্বের ফায়সালা করবে। যুদ্ধ বিরতি ঘোষিত হলো। আলীর পক্ষে আবু মুসা আল-আশ’আরী এবং মুয়াবিয়ার পক্ষে আমর ইবনুল আস (রা.) হাকাম বা সালিশ নিযুক্ত হলেন। সিদ্ধান্ত হলো, এই দুজনের সম্মিলিত ফায়সালা বিরোধী দুপক্ষই মেনে নেবেন। দুমাতুল জান্দালনামক স্থানে মুসলমানদের বড় আকারের এক সম্মেলন হয়। কিন্তু সব ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে যে সিদ্ধান্তটি পাওয়া যায় তাহলো, ‘আমর ইবনুল আস’ ‘আবু মুসা আল-আশ’আরীর’ (রা.) সঙ্গে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা থেকে সরে আসায় এ সালিশী বোর্ড শান্তি স্থাপনে ব্যর্থ হয়। দুমাতুল জান্দাল থেকে হতাশ হয়ে মুসলিমরা ফিরে গেল। অতঃপর আলী ও মুয়াবিয়া (রা.) অনর্থক রক্তপাত বন্ধ করার লক্ষ্যে সন্ধি করলেন। এ দিন থেকে মূলতঃ মুসলিম খিলাফত দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। এ সময় খারেজীনামে নতুন একটি দলের জন্ম হয়। প্রথমে তারা ছিল আলীর সমর্থক। কিন্তু পরে তারা এ বিশ্বাস প্রচার করতে থাকে যে, দ্বীনের ব্যাপারে কোন মানুষকে হাকামবা সালিশ নিযুক্ত করা কুফরী কাজ। আলী (রা.) আবু মুসা আল-আশ’আরীকে (রা.) হাকাম মেনে নিয়ে কুর’আনের খেলাফ কাজ করেছেন। সুতরাং আলী তাঁর আনুগত্য দাবী করার বৈধতা হারিয়ে ফেলেছে। তারা আলী (রা.) থেকে পৃথক হয়ে যায়। তারা ছিল চরমপন্থী। তাদের সাথে আলীর (রা.) একটি যুদ্ধ হয় এবং তাতে বহু হতাহত হয়। এই খারেজী সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তি আবদুর রহমান ইবন মুলজিম, আল বারাক ইবন আবদিল্লাহ ও আমর ইবন বকর আত-তামীমী, নাহরওয়ানের যুদ্ধের পর এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মুসলিম উম্মার অন্তর্কলহের জন্য দায়ী মূলতঃ আলী, মুয়াবিয়া ও আমর ইবলুল আস (রা.)। সুতরাং এ তিন ব্যক্তিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। সিদ্ধান্ত মুতাবিক ইবন মুলজিম দায়িত্ব নিল আলী (রা.) এবং আল-বারাক ও আমর ইবন বকর আত-তামীমী দায়িত্ব নিল যথাক্রমে মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আসের (রা.)। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, মারবে নয়তো মরবে। হিজরী ৪০ সনের ১৭ রমজান ফজরের নামাযের সময়টি এ কাজের জন্য নির্ধারিত হয়। অতঃপর ইবন মুলজিম কুফা, আল-বারাক দিমাশক ও আমর মিসরে চলে যায়।

হিজরী ৪০ সনের ১৬ রমজান শুক্রবার দিবাগত রাতে আততায়ীরা আপন আপন স্থানে ওৎ পেতে থাকে। ফজরের সময় আলী (রা.) অভ্যাসমত আস-সালাত বলে মানুষকে নামাযের জন্য ডাকতে ডাকতে যখন মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন, পাপাত্মা ইবন মুলজিম শাণিত তরবারী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে আহত করে। আহত অবস্থায় আততয়ীকে ধরার নির্দেশ দিলেন। সন্তানদের ডেকে অসীয়াত করলেন। চার বছর নয় মাস খিলাফত পরিচালনার পর ১৭ রমজান ৪০ হিজরী শনিবার কুফায় শাহাদাত বরণ করেন।

একই দিন একই সময় মুয়াবিয়া (রা.) যখন মসজিদে যাচ্ছিলেন, তাঁরও উপর হামলা হয়। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। তিনি সামান্য আহত হন। অন্য দিকে আমর ইবনুল আস অসুস্থতার কারণে সেদিন মসজিদে যাননি। তার পরিবর্তে পুলিশ বাহিনীর প্রধান খারেজা ইবন হুজাফা ইমামতির দায়িত্ব পালনের জন্য মসজিদে যাচ্ছিলেন। তাঁকেই আমর ইবন আস মনে করে শহীদ করা হয়। এভাবে মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.) প্রাণে রক্ষা পান। (তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাঃ খিদরী বেক)

আলীর (রা.) নামাযে জানাযার ইমামতি করেন হাসান ইবন আলী (রা.)। কুফা জামে মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। তবে অন্য একটি বর্ণনা মতে নাজফে আশরাফে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

আততায়ী ইবন মুলজিমকে ধরে আনা হলে আলী (রা.) নির্দেশ দেনঃ সে কয়েদী। তার থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা কর। আমি বেঁচে গেলে তাঁকে হত্যা অথবা ক্ষমা করতে পারি। যদি আমি মারা যাই, তোমরা তাকে ঠিক ততটুকু আঘাত করবে যতটুকু সে আমাকে করেছে। তোমরা বাড়াবাড়ি করো না। যারা বাড়াবড়ি করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না।’ (তাবাকাতঃ ৩/৩৫)

আলী (রা.) প্রায় পাঁচ বছর খিলাফত পরিচালনা করেন। একমাত্র সিরিয়া ও মিসর ছাড়া মক্কা ও মদীনাসহ সব এলাকা তাঁর অধীনে ছিল। তাঁর সময়টি যেহেতু গৃহযুদ্ধে অতিবাহিত হয়েছে, এ কারণে নতুন অঞ্চল বিজিত হয়নি।

আলী (রা.) তাঁর পরে অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে যান নি। লোকেরা যখন তাঁর পুত্র হাসানকে (রা.) খলিফা নির্বাচিত করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তিনি বলেছিলেন, এ ব্যাপারে তোমাদের নির্দেশ অথবা নিষেধ কোনটাই করছি না। অন্য এক ব্যক্তি যখন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি আপনার প্রতিনিধি নির্বাচন করে যাচ্ছেন না কেন? বললেনঃ ‘আমি মুসলিম উম্মাহকে এমনভাবে ছেড়ে যেতে চাই যেমন গিয়েছিলেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)।’

আলীর (রা.) ওফাতের পর দারুল খিলাফাহ’-রাজধানী কুফার জনগণ হযরত হাসানকে (রা.) খলিফা নির্বাচন করে। তিনি মুসলিম উম্মার আন্তঃকলহ ও রক্তপাত পছন্দ করলেন না। একারণে, মুয়াবিয়া (রা.) ইরাক আক্রমণ করলে তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে মুয়াবিয়ার হাতে খিলাফতের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া সমীচীন মনে করলেন। এভাবে হাসানের (রা.) নজিরবিহীন কুরবানী মুসলিম জাতিকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে মুক্তি দেয়। খিলাফত থেকে তাঁর পদত্যাগের বছরকে ইসলামের ইতিহাসে আমুল জামায়াহ’- ঐক্য ও সংহতির বছর নামে অভিহিত করা হয়। পদত্যাগের পর হাসান কুফা ত্যাগ করে মদীনা চলে আসেন এবং নয় বছর পর হিজরী পঞ্চাশ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন। মাত্র ছয় মাস তিনি খিলাফত পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন।

উমার (রা.) আলী (রা.) সম্পর্কে বলেছিলেনঃআমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ফায়সালাকারী আলী। এমনকি রাসূল (সাঃ) বলেছিলেনঃআকদাহুম আলী’- তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিচারক আলী।তাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত লক্ষ্য করে উমার (রা.) একাধিকবার বলেছেনঃ লাওলা আলী লাহালাকা উমার’- ‘আলী না হলে উমার হালাক হয়ে যেত।

আলী (রা.) নিজেকে একজন সাধারণ মুসলমানের সমান মনে করতেন এবং যে কোন ভুলের কৈফিয়তের জন্য প্রস্তুত থাকতেন। একবার এক ইয়াহুদি তাঁর বর্ম চুরি করে নেয়। আলী বাজারে বর্মটি বিক্রি করতে দেখে চিনে ফেলেন। তিনি ইচ্ছা করলে জোর করে নিতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি। আইন অনুযায়ী ইয়াহুদির বিরুদ্ধে কাযীর আদালতে মামলা দায়ের করেন। কাজীও ছিলেন কঠোর ন্যায় বিচারক। তিনি আলী (রা.)-এর দাবীর সমর্থনে প্রমাণ চাইলেন। আলী (রা.) তা দিতে পারলেন না, তিনি তার পুত্র হাসানকে (রা.) সাক্ষী হিসাবে নিয়ে আসলে বিচারক তার (পুত্রের) সাক্ষ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। কাজী ইয়াহুদির পক্ষে মামলার রায় দিলেন। এই ফায়সালার প্রভাব ইয়াহুদির উপর এতখানি পড়েছিল যে, সে মুসলমান হয়ে যায়। সে মন্তব্য করেছিলঃএতো নবীদের ইনসাফ। আলী (রা.) আমীরুল মু’মিনীন হয়ে আমাকেও কাজীর সামনে উপস্থিত করেছেন এবং তাঁরই নিযুক্ত কাজী তার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।আলী (রা.) বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত রাসূলে কারীম (সাঃ) পরিবারের সাথেই থাকতেন। বিয়ের পর পৃথক বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। জীবিকার প্রয়োজন দেখা দিল, কিন্তু পুঁজি ও উপকরণ কোথায়? গতর খেটে এবং গণীমতের হিস্যা থেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। উমারের (রা.) যুগে ভাতা হলে তাঁর ভাতা নির্ধারিত হয় বছরে পাঁচ হাজার দিরহাম। হাসান (রা.) বলেন, মৃত্যুকালে একটি গোলাম খরীদ করার জন্য জমা করা মাত্র সাতশত দিরহাম রেখে যান। (তাবাকাতঃ ৩/৩৯)।

জীবিকার অনটন আলীর (রা.) ভাগ্য থেকে কোন দিন দূর হয়নি। একবার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সময়ে ক্ষুধার জ্বালায় পেটে পাথর বেধে থেকেছি। (হায়াতুস সাহাবাঃ ৩/৩১২) খলিফা হওয়ার পরেও ক্ষুধা ও দারিদ্রের সাথে তাকে লড়তে হয়েছে। তবে তাঁর অন্তরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত। কোন অভাবীকে তিনি ফেরাতেন না। এ জন্য তাঁকে অনেক সময় সপরিবারে অভুক্ত থাকতে হয়েছে। তিনি ছিলেন দারুন বিনয়ী। নিজের হাতেই ঘর-গৃহস্থালীর সব কাজ করতেন। সর্বদা মোটা পোশাক পরতেন। তাও ছেঁড়া, তালি লাগানো। তিনি ছিলেন জ্ঞানের দরজা। দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ জ্ঞানার্জনের জন্য তাঁর কাছে এসে দেখতে পেত তিনি উটের রাখালী করছেন, ভূমি কুপিয়ে ক্ষেত তৈরী করছেন। তিনি এতই অনাড়ম্বর ছিলেন যে, সময় সময় শুধু মাটির উপর শুয়ে যেতেন। একবার তাঁকে রাসূল (সাঃ) এ অবস্থায় দেখে সম্বোধন করেছিলেন, ‘ইয়া আবা তুরাব’- হে মাটির অধিবাসী প্রাকৃতজন। তাই তিনি পেয়েছিলেন, ‘আবু তুরাবলকবটি। খলিফা হওয়ার পরও তাঁর এ সরল জীবন অব্যাহত থাকে। উমারের (রা.) মত সব সময় একটি দুররা বা ছড়ি হাতে নিয়ে চলতেন, লোকদের উপদেশ দিতেন। (আল-ফিতনাতুল কুবরা)

হযরত আলী (রা.) ছিলেন নবী খান্দানের সদস্য, যিনি নবী (সাঃ)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্ববধানে শিক্ষা লাভ করেন। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ আনা মাদীনাতুল ইলম ওয়া আলী বাবুহা’- ‘আমি জ্ঞানের নগরী, আর আলী সে নগরীর প্রবেশদ্বার।’ (তিরমিযি) তিনি ছিলেন কুর’আনের হাফিজ এবং একজন শ্রেষ্ঠ মুফাসসির। কিছু হাদীসও সংগ্রহ করেছিলেন। তবে হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। কেউ তাঁর কাছে কোন হাদীস বর্ণনা করলে, বর্ণনাকারীর নিকট থেকে শপথ নিতেন। (তাজকিয়াতুল হুফফাজঃ ১/১০)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর থেকে বহু বিখ্যাত সাহাবী এবং তাবেঈ হাদীস বর্ণনা করেছেন। পূর্ববতী খলিফাদের যুগে মুহাজিরদের তিনজন ও আনসারদের তিনজন ফাতওয়া দিতেন। যথাঃ উমার, উসমান, আলী, উবাই বিন কা, মুয়াজ বিন জাবাল ও যায়িদ বিন সাবিত। মাসরুক থেকে অন্য একটি বর্ণনায় জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাহাবীদের মধ্যে ফাতওয়া দিতেনঃ আলী, ইবন মাসউদ, যায়িদ, উবাই বিন কা, আবু মুসা আল-আশ’আরী। (তাবাকাতঃ ৪/১৬৭, ১৭৫)

আলী ছিলেন একজন সুবক্তা ও ভালো কবি। (কিতাবুল উমদাঃ ইবন রশীক-১/২১) তাঁর কবিতার একটি দিওয়ান’ (যা দিওয়ানে আলী নামে পরিচিত) আমরা পেয়ে থাকি। তাতে অনেকগুলি কবিতায় মোট ১৪০০ শ্লোক আছে। গবেষকদের ধারণা, তাঁর নামে প্রচলিত অনেকগুলি কবিতা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। তবে তিনি যে তৎকালীন আরবী কাব্য জগতের একজন বিশিষ্ট দিকপাল, তাতে পণ্ডিতদের কোন সংশয় নেই। ‘নাহজুল বালাগানামে তাঁর বক্তৃতার একটি সঙ্কলন আছে যা তাঁর অতুলনীয় বাগ্মীতার স্বাক্ষর বহন করে চলছে। (তারীখুল আদাব আল-আরাবীঃ ডঃ উমার ফাররুখ-১/৩০৯)

খাতুনে জান্নাত নবী কন্যা ফাতিমার (রা.) সাথে তার প্রথম বিয়ে হয়। যতদিন ফাতিমা জীবিত ছিলেন, দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি। ফাতিমার মৃত্যুর পর একাধিক বিয়ে করেছেন। তাবারীর বর্ণনা মতে, তাঁর চৌদ্দটি ছেলে ও সতেরটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। ফাতিমার (রা.) গর্ভে তিন পুত্র হাসান, হুসাইন, মুহসিন এবং দুকন্যা যয়নাব ও উম্মু কুলসুম জন্ম লাভ করেন। শৈশবেই মুহসীন মারা যায়। ওয়াকিদীর বর্ননা মতে, মাত্র পাঁচ ছেলে হাসান, হুসাইন মুহাম্মদ (ইবনুল হানাফিয়্যা), আব্বাস এবং উমার থেকে তাঁর বংশ ধারা চলছে।

ইমাম আহমদ (র.) বলেনঃ ‘আলীর (রা.) মর্যাদা ও ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) থেকে যত কথা বর্ণিত হয়েছে, অন্য কোন সাহাবী সম্পর্কে তা হয় নি।’ (আল-ইসাবাঃ ২/৫০৮)। ইতিহাসে তাঁর যত গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে, এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে তার কিয়দাংশও তুলে ধরা সম্ভব নয়। রাসূল (সাঃ) অসংখ্যবার তাঁর জন্য ও তাঁর সন্তানদের জন্য দু’আ করেছেন। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ একমাত্র মুমিনরা ছাড়া তোমাকে কেউ ভালবাসবে না এবং মুনাফিকরা ছাড়া কেউ তোমাকে হিংসা করবে না।

হযরত আলীর (রা.) এক সাথী দুরার ইবন দামরা আল কিনানী একদিন মুয়াবিয়ার (রা.) কাছে এলেন। মুয়াবিয়া তাকে আলীর গুণাবলী বর্ণনা করতে অনুরোধ করেন। প্রথমে তিনি অস্বীকার করেন। কিন্তু মুয়াবিয়ার চাপাচাপিতে দীর্ঘ এক বর্ণনা দান করেন। তাতে আলী (রা.) গুণাবলী চমৎকারভাবে ফুটে উঠে। ঐতিহাসিকরা বলেছেন এ বর্ণনা শুনে মুয়াবিয়া (রা.) সহ তার সাথে বৈঠকে উপস্থিত সকলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। অতঃপর মুয়াবিয়া (রা.) মন্তব্য করেনঃ আল্লাহর কসম, আবুল হাসান এমনই ছিলেন।’ (আল-ইসতিয়াবঃ ৩/৪৪)।

যৌথ সামরিক মহড়া ও সেমিনার হল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সে তার ভু-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়

যৌথ সামরিক মহড়া ও সেমিনার হল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সে তার ভু-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়

খবরঃ

গত ১৪.০৯.১৪ তারিখে রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ মিলিটারি এবং যুক্তরাষ্ট্র আর্মির প্যাসিফিক কমান্ড যৌথভাবে ৩৮তম প্যাসিফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার (PAMS) এর আয়োজন করে। ৩২টি দেশের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা ৪ দিনের উক্ত সেমিনারে বিভিন্ন সমকালীন বিষয়ে মতবিনিময় এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদমোকাবেলার দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সকল দেশকে সহায়তার আহবান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মির প্যাসিফিক কমান্ডার জেনারেল ভিনসেন্ট ব্রুকস, যাতে সকল দেশ একমত হয়েছে।

মন্তব্যঃ

দক্ষিনে বিশাল বঙ্গোপসাগর থাকার ফলে অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ধরা হয়। আন্দামান নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে যদিওবা মার্কিনীদের বৃহৎ নৌবহরের উপস্থিতি রয়েছে, তারপরও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিজেদের ভুকৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালে ওবামা যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে তার পররাষ্ট্রনীতির ফোকাসের ঘোষণা দিল, সেই সময় থেকেই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বও আর বেড়ে গেছে। তখন থেকেই আমরা দেখেছি বাংলাদেশে বিভিন্ন মার্কিন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের আনাগোনা এবং যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন। এছাড়াও এই অঞ্চলে মার্কিনীদের উপস্থিতিকে বৈধতা দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমেরিকার কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভেতর টেনে নেয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশী আইন প্রয়োগকারী ও সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষন দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরে আমেরিকার প্রভাবকে শক্তিশালী করার জন্য গত সপ্তাহে ক্যারাট” (Cooperation Afloat Readiness and Training) নামক নৌমহড়া আমেরিকান নৌ-বাহিনীর দ্বারা বঙ্গোপসাগরে আয়োজন করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীও অংশগ্রহণ করেছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেই এসব যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষন এবং প্যামসএর মতো সামরিক ফোরামসমূহের কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করতে হবে। একমাত্র রাজনৈতিকভাবে অজ্ঞ এবং পশ্চিমাদের দালাল ছাড়া এখন এটা আর কারো কাছে অজানা নয় যে, বিভিন্ন অনুন্নত দেশে এসব মার্কিন সহায়তা কার্যক্রমের মূল কারন কি। এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয় আমেরিকা এবং তার অন্যান্য পশ্চিমা মিত্র শক্তিগুলো নিঃস্বার্থ ভাবে অন্যদের জন্য কল্যাণময়ী কোন কাজ করতে পারে। এসব রক্তচোষা সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের মূল উদ্দেশ্যই হয়ে থাকে মুসলিম ভুমিগুলোকে তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে খিলাফতের পুনরাবির্ভাব ঠেকানো।

আমরা তাই বাংলাদেশের জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চায় যে, আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের সময় থেকে এই একইভাবে পাকিস্তানও আজ পর্যন্ত আমেরিকার সকল ভু-রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়ন করে আসছে। কিন্তু আজকে এটা পরিস্ফুটিত যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডায় শামিল হতে গিয়ে পাকিস্তানি শাসকদের এই মার্কিন তাঁবেদারির খেসারত সেই দেশের সাধারণ জনগণদেরই দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের তাঁবেদার শাসকরাও বিশ্বাসঘাতকতার সেই একই পথে হাটছে যার পরিণতিও দেশ এবং দেশের জনগণের ধ্বংস বৈ অন্য কিছু হবে না।

এছাড়াও এসব যৌথ মহড়া এবং প্রশিক্ষণের আর একটি উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশের সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর তাদের কুফরি নেতৃত্ব কায়েম করা। তাদের কৌশল হল এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনীর ভেতর ধর্মনিরপেক্ষতাপাশ্চাত্য সংস্কৃতিনিয়ে মোহ তৈরি করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন বাংলাদেশের সামরিকবাহিনীকে এসব থেকে রক্ষা করেন এবং তারা যেন পুতুল হাসিনার অত্যাচারের শৃঙ্খল ভেঙে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য হিযবুত তাহরীর-কে নুসরাহ দান করতে পারে। একমাত্র খিলাফতই পারবে এই অঞ্চল থেকে কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে বিতাড়িত করতে।



হিযবুত তাহরীর-এর কেন্দ্রীয় মিডিয়া অফিসের জন্য লিখেছেন
ইমাদুল আমিন, হিযবুত তাহরীর, উলাইয়াহ বাংলাদেশের মিডিয়া অফিসের সদস্য

2.10.14

হে মুসলিমগণ! রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং পবিত্র হজ্বের বিরুদ্ধে হাসিনার মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর ধৃষ্টতাপূর্ণ এবং অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য একমাত্র খিলাফত তাকে গ্রেফতার ও শাস্তির মুখোমুখি করবে

:: নং- ১৪৩৫-১২/০১            বৃহঃস্পতিবার, ০৮ জিলহাজ্জ, ১৪৩৫ হিজরী         ০২.১০.২০১৪ইং ::

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

হে মুসলিমগণ! রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং পবিত্র হজ্বের বিরুদ্ধে হাসিনার মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর ধৃষ্টতাপূর্ণ এবং অবমাননাকর মন্তব্যের জন্য একমাত্র খিলাফত তাকে গ্রেফতার ও শাস্তির মুখোমুখি করবে

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং পবিত্র হজ্বের বিরুদ্ধে মন্তব্যের কারণে তার কোন শাস্তি হবে না জেনেই শেখ হাসিনার কুফর সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী এরূপ ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। সে শুধু জানতোই না বরং এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল; হাসিনা সরকার যে তাকে এই অপরাধের জন্য গ্রেফতার ও শাস্তি দিবে না, এ ব্যাপারে সে পূর্ণ অবগত ছিল। কারণ, ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ হচ্ছে এই সরকারের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য যা সে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকে পৃষ্ঠপোষকতা এবং লালন-পালন করে আসছে। এই সরকার যে কাউকে ইসলামকে আক্রমন করার লাগামহীন স্বাধীনতা দিয়েছে এবং একই সময়ে ইসলামের দাওয়াহ বহনকারীদেরকে দমন করেছে। হাসিনা স্বয়ং নিজে বিশ্বব্যাপী এটা বলে তার সরকারের শ্রেষ্ঠত্বের গুণ-কীর্তন গেয়ে বেড়াচ্ছে যে, একমাত্র তার সরকার হচ্ছে বাংলাদেশে ইসলামের উত্থান ঠেকানোর একমাত্র অবলম্বন, যাকে সে ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে “সন্ত্রাসবাদের উত্থান” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। যখন তার মন্ত্রী নিউইয়র্কে বসে এরূপ মন্তব্য করেছে, তখন হাসিনাও কি জাতিসংঘে বসে প্রকৃতপক্ষে একই কাজ করেনি? মুলতঃ তারা উভয়েই নব্য-ক্রুসেডারদের মোড়ল আমেরিকাতে বসে ইসলামকে আক্রমন করেছে, শুধুমাত্র তাদের ভাষা এবং অভিব্যক্তি কিছুটা ভিন্ন; সুতরাং তারপরও কিভাবে আশা করা যায় সরকার এই নীচ ব্যক্তিকে শাস্তি দিবে? আর এজন্যই লতিফ সিদ্দিকী বিবিসি বাংলায় তার রেডিও ইন্টারভিউতে বলেছে যে, যদি শেখ হাসিনা বলে তবেই কেবল সে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করবে নতুবা নয় এবং এখন পর্যন্ত সে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়নি...

হে মুসলিমগণ!

আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোন সাধারণ জনগণ যদি শেখ হাসিনা কিংবা তার পিতাকে, যাকে সে জাতির পিতা বলে ডাকে, “কটুক্তি” করে তবে তৎক্ষনাৎ হাসিনা তাকে গ্রেফতার করে এবং শাস্তি দেয়। কারণ এটা তার নিকট অত্যন্ত মূল্যবান বিষয়। অন্যদিকে সে রাসূল (সাঃ) এবং দ্বীন সম্পর্কে কটুক্তিকারী ব্লগারদের শাস্তির দাবিকারী ওলামাদের শাপলা চত্ত্বরে হত্যার নির্দেশ দেয়। কোথায় সেই শাসক যার নিকট সেটাই মূল্যবান যা আপনাদের নিকট মূল্যবান? কোথায় সেই শাসক, যার নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সাঃ) এবং দ্বীন ততটাই প্রিয় যতটা আপনাদের নিকট প্রিয়? আর এই শাসক খলিফা ছাড়া আর কেউ নন, যিনি রাসূল (সাঃ), ইসলাম এবং মুসলিমদের সম্মান রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন। সুতরাং এই বিষয়ে কালবিলম্ব না করে খিলাফত রাষ্ট্র পুণঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আপনাদের শাসক হিসেবে একজনকে খলিফা নিয়োগ দেয়া আপনাদের কর্তব্য। নতুবা, পূর্বের বহুবারের মত এবারও কিছু সময়ের জন্য আপনারা প্রতিবাদ করবেন এবং আপনাদের কর্মশক্তি স্তিমিত হতে না হতেই আরেক লতিফ তার ঘৃণ্য মাথা উচু করবে এবং এভাবেই তা চলতে থাকবে অথবা আরও খারাপ কিছু হবে।



হিযবুত তাহরীর-এর মিডিয়া কার্যালয়
উলাই’য়াহ বাংলাদেশ



Hizb ut Tahrir Bangladesh Official Website: http://www.ht-bangladesh.info/
Mobile: +8801798367640      Skype: htmedia.bd
Hizb ut Tahrir Official Website: http://www.hizb-ut-tahrir.org/
Hizb ut Tahrir Media Website: http://www.hizb-ut-tahrir.info/