3.6.14

সূচনা

সকল প্রশংসা জগতসমূহের অধিপতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি এবং সালাম পেশ করছি রাহমাতাল্লীল আলামীন সর্বশেষ নবী রাসূল মুহম্মদ (সাঃ), তাঁর রিবার তাঁর সাহাবীদের প্রতি এবং যারা বিচার দিবসের আগ পর্যন্ত তাঁকে ইহসানের সাথে অনুসরণ করবেন তাদের প্রতি তঃপর-

*    ইসলামের দাওয়াতশীর্ষক এই বইয়ে আমরা ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব এই বিষয়টি ব্যাপক, অনেক শাখা প্রশাখায় বিস্তৃত চিন্তাগ্রাহ্য এটা এমন এক পথ যা কুসুমাস্তীর্ণ নয় বরং বন্ধুর আমাদের পূর্ববর্তী আলেম মুজতাহিদগন (রঃ) ইবাদত, মুয়ামালাত, বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদির মত এত ব্যাপকভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেননিইসলামের প্রতি আহবানএর যে দিকটি নিয়ে আলোচনা বেশী আবর্তিত হয়েছে তা হল, ‘আমর বিল মারুফ নাহি আানিল  মুনকারঅর্থাৎসৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ ব্যক্তিপর্যায়ের দাওয়াত কারণ তাদের বাস্তবতা এই রকম ছিল না যে, খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা সমূলে উৎপাটিত হয়েছে, ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, শরীয়াহ পরিত্যাক্ত হয়েছে এবং দারুল ইসলাম দারুল কুফর দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব না হলে তারা গবেষণা করতে পারেন না, কেননা মুজতাহিদগন কেবলমাত্র বাস্তবে উদ্ভুত সমস্যাই বিবেচনা করেন, কোন আপাত বা কাল্পনিক বিষয় নিয়ে নয়

অতএব, এই বইয়ে আমরা উক্ত বিষয়ে আলোকপাত করব আমরা বলতে চাচ্ছি না এটা পূর্ণাঙ্গ ব্যাপক তবে এটা অবশ্যই বিষয়টিকে প্রবৃত্তির অনুসরণ, যথেচ্ছাচার, অতিরঞ্জিত চিন্তাচেতনা, কুফরের অন্ধ অনুকরণ ইত্যাদি থেকে ইসলামী শরীয়াহ- মূল ভিত্তির দিকে ফিরিয়ে নেয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

*    দাওয়াতের ফরযিয়াত মানদুব (সুন্নাহ) বিষয়সমূহ আলোচনার চেয়ে এই বইয়ে দাওয়াতী কাজ করবার পদ্ধতি নিয়ে বরং বেশী গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কারণ বর্তমানে অন্য যে কোন বিষয়ের চেয়ে দাওয়াতী কাজ করবার পদ্ধতিগত জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ

বইটিতে মূলতখিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাওয়াতের পদ্ধতিনিয়েই আলোচনা করা হবে কারণ আজকের দিনে দাওয়াত বহন করবার ক্ষেত্রে এটাই দাওয়াতের মেরুদন্ড হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন আর অস্তিত্বশীল নয়- এই বাস্তবতায় আজকের দিনে যখন কোন ইসলামী আহ্বানের শীর্ষে খিলাফত রাষ্ট্র পুণঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান না থাকে অথবা এটিকে মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত না করা হয়, তখন বুঝতে হবে সে আহ্বান আংশিক অথবা বিচ্যুত

*    বইটি ইসলামের দাওয়াতনিয়েই মূলত আলোকপাত করবে এবংদাওয়াতের কাজ করবার পদ্ধতিবিশেষ করেইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাওয়াতের কাজ করবার পদ্ধতি উপর আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করবে -যা ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহ থেকে উৎসারিত সেসব মৌলিক বিষয়গুলোও সংক্ষেপে উল্লেখ করা হবে, যদিও এসব মৌলিক বিষয় এই বইয়ের প্রধান প্রতিপাদ্য নয় যেমনঃ

. ইসলামী আক্বীদার স্পষ্টতা বিশুদ্ধতা -যা ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
. ইসলামিক আক্বীদার মধ্যে যন্ন (অনুমাননির্ভরতা) বা ন্যূনতম যন্ন এর সুযোগ নেই বরং তা হতে হবে ক্বাতীঈ (সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তগ্রহণকারী) এক্ষেত্রে ত্বাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণের সুযোগ নেই যদি তা না করা হয় তাহলে মুসলিমগন কুসংস্কারকে গ্রহণ করবে প্রবঞ্চণার মধ্যে পতিত হবে
. আক্বীদার সাথে সর্ম্পকযুক্ত চিন্তার (ভিত্তিসমূহের শাখা) ক্ষেত্রে যৎসামান্য পরিমাণে যন্ন বা অনুমাননির্ভরতা এবং ত্বাকলীদ বা অনুকরণ অনুমোদনযোগ্য শরীয়াহ এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য
. শরীয়াহ- আইন-কানুনসমূহ সরাসরি শরীয়াহ- দলিল এর উপর ভিত্তি করে গ্রহন করতে হবে অর্থাৎ কুআন, সুন্নাহ, সাহাবাগনের ইজমা (ঐকমত্য), শরীয়াহ- বর্ণণা থেকে আসা শর ইল্লাত (ঐশী কারন) এর উপর ভিত্তি করে ক্বিয়াস। শরীয়ার দলিল থেকে কেবলমাত্র মুজতাহিদ হুকুম বের করে নিয়ে আসেন আর মুক্বাল্লিদকে (অনুসরণকারী) সুনিশ্চিত করতে হবে যে, তিনি যে মুজতাহিদের অনুসরণ করেন, তার বক্তব্য তিনি বুঝতে পারছেন
. যদি বাধ্যবাধকতার সংখ্যা অনেক বেশী হয়ে যায় এবং সবগুলো পালন করা মুসলমানের জন্য কঠিন হয়ে যায় বা তিনি অপারগ হন, তাহলে তাকে অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বাধ্যবাধকতাটিকে প্রাধান্য দিতে হবে (এটাও শরীয়া দলিলের ভিত্তিতে হতে হবে, ব্যক্তিগত খেয়ালখুশী বা পছন্দের ভিত্তিতে নয়)

*    যখন মুসলিমগন স্বাভাবিক অবস্থায় আছে, অর্থাৎ যখন ইসলামী খিলাফত রয়েছে তখনআমর বিন মারুফ নাহি আনিল মুনকারকরা এবং রাষ্ট্রের ভেতরকার অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বানের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণভাবে দাওয়াতী কাজ করা হবে আর রাষ্ট্রের বাইরের অমুসলিমদের প্রামাণ্য দলিল সহকারে ইসলামের দিকে আহ্বান করা হবে এবং এটা করা হবে খলিফার বিবেচনা অনুসারে জিহাদের মাধ্যমে

আর যখন মুসলিমগন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে থাকবে, অর্থাৎ খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই, তখন খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা পুণঃপ্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে ইসলামী দাওয়াতের কাজ করতে হবে মুসলিমদের সংস্কার সাধনের জন্য তখন মারুফের আদেশ-মুনকারের নিষেধে এবং অন্যদিকে ইসলাম গ্রহণের জন্য অমুসলিমদের আহ্বানের কাজটি তখন ঙ্কীর্ণ পরিসরে  চলবে কারণ যখন ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নের জন্য মুসলিম ভূমিসমূহতে কোন রাষ্ট্র বা কর্তৃত্ব না থাকে তখন সেটি দারুল কুফর হয়ে যায় তখন মুনকার সংঘটনের বিষয়টি একটি রীতিতে পরিণত হয় এবং সেকারণে সংস্কার সাধনের আংশিক কাজটি অকার্যকর অপর্যাপ্ত হয়ে যায় আমূল পরিবর্তনের কর্মকান্ড তখন শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা হয়ে যায় -যা কুফর ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ইসলামী ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করবে [খিলাফত অনুপস্থিত থাকা অবস্থায়] মুসলিম ভূমির বাইরে অমুসলিমদের দাওয়া করাকে বুঝায় তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেয়া অনৈসলামী চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং মুসলিম ভূমির বাইরে অবস্থানরত মুসলিমদের প্রচেষ্টাসমূহকে একীভূতকরণের দ্বারা মুসলিম ভূমিতে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার মাধ্যমে এর হিঃপ্রকাশ ঘটে

*    ইসলামের দাওয়াতের সাথে সম্পৃক্ত যে কোন বইয়ে দাওয়াতের মৌলিক নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা থাকা উচিত। এগুলো নিম্নরূপঃ

. খিলাফতের জন্য কাজ করা এখন ফরযে আইন (প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয) এর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ  কর্মতৎপরতা সৃষ্টি করা একান্ত কর্তব্য
. কাজটি দলগতভাবে হতে হবে এবং ব্যক্তিগতভাবে করবার কোন সুযোগ নেই।
. এই দলের একজন আমীর থাকবেন যিনি শরীয়া প্রদত্ত ক্ষমতায় বলীয়ান - যার আওতার মধ্যে তাকে মান্য করা হবে
. এই দলে পুরুষ এবং নারী উভয়ই থাকবে, কেননা দাওয়াত বহন করার ব্যাপারে উভয়ই দায়িত্বশীল
. এই দলের সদস্যদের বন্ধনের ভিত্তি হবে ইসলামী আক্বীদা চিন্তা
. দলটিকে তার কর্মকান্ডের জন্য অবশ্যই ইসলামী চিন্তা, নিয়ম কানুন মতামতকে গ্রহণ করবে এবং তাদের আনুগত্য থাকবে আদর্শের প্রতি, কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়
. দলটি অবশ্যই রাজনৈতিক হবে, কারণ এর কাজ হল রাজনৈতিক -যা খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতায় যাবে
. দলটির কাজ হবে বুদ্ধিবৃত্তিক; সহিংস (violent) কোন কর্মকান্ডের সাথে এর সম্পৃক্ততা থাকবে না কারণ ইসলামের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জনমত তৈরি করে জনগনের সহায়তায় ক্ষমতায় আসাই দলের কাজ
. বর্তমান কুফর শাসনব্যবস্থার সাথে কোনরকম ক্ষমতার অংশীদার হওয়া দলের জন্য নিষিদ্ধ
১০. বর্তমান কুফর শাসনব্যবস্থার উপর যে কোন ধরনের নির্ভরশীলতা দলের জন্য নিষিদ্ধ কুফর ব্যবস্থা থেকে কোন ধরনের অর্থনৈতিক সাহায্য বা নির্ভরশীলতা অবশ্যই বর্জনীয়

*    একইভাবে, ইসলামের দাওয়াত বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এমন একটি বইতে দাওয়াত বহন করার পদ্ধতি বিষয়ে আহকাম শরীয়াহ আলোচিত হওয়া উচিত, যেমনঃ

. বাস্তব মূলনীতির (practical principle) অনুসরণ -দাওয়াতের কাজ অন্তঃসারশূন্য হবে না, বরং সুচিন্তিত হবে আর এই চিন্তাও কেবলমাত্র অনুমাননির্ভর হবে না, বরং তা আসবে বাস্তব উপলদ্ধি থেকে এই চিন্তার সাথে কাজ যুক্ত করে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে অগ্রসর হতে হবে এই লক্ষ্য, কর্মকান্ড চিন্তা সবই ইসলাম থেকে উৎসারিত হতে হবে আর চূড়ান্ত লক্ষ্য হল ইসলামিক আক্বীদাহ- ভিত্তিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এটা দাওয়াত বহনকারীকে ঈমানের পরিবেশে রাখে, তাকে উদ্দীপনা দেয় এবং নিয়ন্ত্রনে রাখে
. পদ্ধতি উপকরণের পার্থক্য সুস্পষ্ট হতে হবে ত্বরিকা বা পদ্ধতি হল শরীয়াহ- আহকাম -যা ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট ঊসলুব বা উপকরণ হল মুবাহ -যা পরিবেশ পরিস্থিতি অনুসারে দাওয়াত বহনকারী গ্রহণ করতে পারে
. আহকাম শরীয়াহ- মতই রাজনৈতিক বাস্তবতার জ্ঞান অপরিহার্য এর কারণ হল হুকুম শরীয়াহ প্রয়োগ করতে হলে হুকুম শরীয়াহ এর বাস্তবতা বা মানাত (যে বাস্তবতার জন্য হুকুমটি এসেছে) সর্ম্পকে জ্ঞান থাকা দরকার কেউ যদি শরীয়াহ- হুকুম জানে কিন্তু মানাত না জানে, তাহলে সে তা প্রয়োগে ব্যর্থ হবে এবং আমরা যদি তা বাস্তবায়ন করতে যাই, তবে আমরা ভুল করে ফেলব কারণ আমরা হুকুমের বাস্তবতা হতে কোনো পৃথক বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন করে ফেলব যারা বর্তমান ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ক্ষমতা গ্রহণ করতে চায় তাদেরকে অবশ্যই কেবলমাত্র আভ্যন্তরীণ নয়, আঞ্চলিক আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ জ্ঞান রাখতে হবে
. কেউ কেউ ভাবতে পারেন, খিলাফত প্রতিষ্ঠা ক্ষমতা গ্রহণের জন্য কেবলমাত্র ক্ষমতাধর কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালালেই হবে কিন্তু ধারণা সঠিক নয় বরং প্রথমে সাধারণ জনগনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে দাওয়াত যখন চিন্তা বিকাশের স্তর থেকে গনসংযোগের পর্যায়ে যাবে এবং সফলভাবে জনগনের সাথে সংযোগ স্থাপনে সমর্থ হবে সাধারণ সচেতনতা থেকে ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরি হবে তখন দলটি ক্ষমতাধর কর্তৃত্বশীল লোকদের কাছে নুসরাহ চাইবে
. শরীয়াহ একাধিক কুতলাহ বা দল অনুমোদন করে তবে শর্ত হল তারা অবশ্যই ইসলামী আক্বীদা শরীয়াহ- ভিত্তিতে গঠিত হবে
. যদি একের অধিক রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থেকে থাকে, তবে তাদের প্রত্যেককেই শরীয়াহ হুকুমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, যেন তাদের মধ্যকার মতপার্থক্যগুলো আদাব আল ইখতিলাফ বা মতপার্থক্যের নিয়মানুযায়ীই হয়ে থাকে কোন বিষয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হলেই একজন মুসলিম অপর মুসলিমকে কুফর বা সীমালঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করবে - বিষয়টি অনুমোদিত নয় কোন মতামতের পক্ষে দূর্বল বা শক্তিশালী দলিল বা দলিলের সাথে সাদৃশ্যতা (সুবহাত আদ দলিল) থাকলে এটি একটি আইনসঙ্গত মতামত ধরনের মতামত অবলম্বনকারীদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করা যাবে না দূর্বল দলিল বা দলিলের সাদৃশ্যতার ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে, আপনার মতামত ভুল বা দূর্বল এবং তার সাথে উত্তম নসীহত সহকারে প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে আলোচনা করতে পারি যদি কোন মতামতের শরীয়াহ ভিত্তিক দলিল না থাকে অথবা সাদৃশ্য না থাকে তাহলে সে মতামতটি অনৈসলামিক (কুফরী মতামত) হবে সেক্ষেত্রে এই মতামতের বিরুদ্ধাচরণ করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকবে না এবং মতাবলম্বীদের ব্যাপারে সাবধান করে দেয়া উচিত (যদিও সবসময় কুফরী মতামত অবলম্বনকারীরা কাফের নয়)
. যেসব শাসক ইসলামী শরীয়াকে পরিত্যাগ করে এবং চাপ প্রয়োগ না করা সত্ত্বেও অন্য আইন দিয়ে শাসন করে, তাদের অধিকাংশই কাফির -যদিও তারা সালাত আদায় করে, রোজা পালন করে, হজ্জব্রত পালন করে এবং মুসলিম বলে দাবি করে এর কারণ হচ্ছে তারা ইসলামী আইন না নিয়ে কুফরী আইনকে গ্রহণ করেছে যদি তারা বিশ্বাস করে যে ইসলামী শরীয়াহ হল সর্বশ্রেষ্ঠ আইন এবং তারা সাময়িকভাবে খেয়ালের বশবর্তী হয়ে তা পরিত্যাগ করে তবে সে জালিম হবে, কিন্তু কাফের হবে না সে কারণে একজন দাওয়াত বহনকারী কখনো ধরনের শাসককে মেনে নেয়ার ঘোষণা দিতে পারেন না, সমর্থন ব্যক্ত করতে পারবেন না, এমনকি তার ব্যাপারে নীরবতা পালনও করতে পারবে না কারণ ব্যাপারে যে প্রসিদ্ধ হাদীসটি রয়েছে, তা লঃ

তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে তার এই সামর্থ্যও না থাকলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (ঘৃণার মাধ্যমে), আর এটা হলো দূর্বলতম ঈমান (মুসলিম, তিরমিযী)

*    ইসলামের দাওয়াত বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এমন কোন বই দাওয়াতী কাজে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর অনুসরণ করার ব্যাখ্যায় নিম্নলিখিত কিছু ইস্যু তুলে ধরবেঃ

. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কাফেরদেরকে ইসলামে প্রবেশ করবার জন্য আহ্বান জানাতেন আর আমরা এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাই
. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এমন এক সময়ে দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন যখন পুরো শরীয়াহ অবতীর্ণ হয়নি এখন আমাদের সামনে সম্পূর্ণ শরীয়াহ রয়েছে তার মানে রাসূল (সাঃ) মক্কায় অনেক হুকুম অবতীর্ণ না হওয়ার কারণে পালন করতে পারেননি, কিন্তু আমাদেরকে এগুলো মেনে চলতে হবে আবার কিছু আইন তিনি মেনে চলেছেন যেগুলো পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে সে কারণে সেই রহিত আইনসমূহ আমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয় যেমনঃ মক্কায় জিহাদ আইনসিদ্ধ ছিল না, কিন্তু এটা এখন বৈধ (রক্ষণাত্ন জিহাদ আজকে আমাদের উপর ফরয এবং এটা রাষ্ট্র না থাকলেও করা যাবে কেননা এই ধরনের জিহাদের সাথে রাষ্ট্র বা খিলাফত থাকার বিষয়টি বিজড়িত নয়) মক্কায় কেবলমাত্র রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর দাওয়াতের কাজ করা ফরয ছিল, কিন্তু সাহাবাদের জন্য এটা মানদুব ছিল, যেহেতু তখন তারা তাঁর প্রতি কেবল নারীদের বাইয়াতের অনুরূপ বাইয়াতে আবদ্ধ ছিলেন অবস্থা চলতে থাকে যতদিন না দ্বিতীয় আকাবার শপথে আওস খাযরায গোত্র বাই’য়াত প্রদান করে এরপর থেকে শুধুমাত্র রাসূলই (সাঃ) নয়, বরং সাহাবীদের উপরও দাওয়াতের কাজ করা ফরয হয়ে যায় আর যা রহিত হয়েছে তা হল মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করবার ফরযিয়াত
. কাজের প্রকারভেদের দিক থেকে মক্কার হুকুমসমূহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তির সাথে সর্ম্পকযুক্ত ছিল এবং মদীনার হুকুমসমূহ শাসকের (খলিফা) দায়িত্বের সাথে সর্ম্পকযুক্ত ছিল কিছু কিছু নির্দেশ আছে যা কেবলমাত্র শাসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তির বা দলের ক্ষেত্রে নয়; যেমনঃ হুদুদ বাস্তবায়ন, জিহাদ ঘোষণা করা এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদন করা আবার কিছু কাজ আছে যা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তি দারুল ইসলাম বা দারুল কুফর যেখানেই থাকুক, যেমনঃ ইবাদত (উপাসনা), আখলাক (নৈতিকতা), মুতুয়ামাত (খাবার), মালবুসাত (পোশাক পরিচ্ছদ) এবং মুআমালাত (লেনদেন) আবার কিছু হুকুম রয়েছে যা ব্যক্তি শাসক উভ সম্পাদন করে থাকে, যেমনঃ মসজিদ নির্মাণ করা, সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা, অসৎ কাজে নিষেধ করা দলিলের ভিত্তিতে দাওয়াতী কাজ করা

*    খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবার মত কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে যখন কোন দাওয়াত বহনকারী অগ্রসর হয় তখন একটি ইস্যুর সম্মুখীন হয়, তা লঃ এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আছে কি (দশ, বিশ বা ত্রিশ বছর)? নাকি নেই? এটা থেকে আবার দুটি ইস্যুর জন্ম হয় প্রথমতঃ এই কাজের প্রকৃতি অনুসারে (শরীয়াহ আক্বীদাহ- ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা) এক, দুই বা তিন দশকের মধ্যে কি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব? কারণ কুতলাহ বা দল যথেচ্ছভাবে কাজ করতে পারে না, বরং কাজের প্রকৃতি অনুসারে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একটি পূর্বনির্ধারিত সময়কালের মধ্যে প্রচেষ্টা চালাতে হবে অন্যথায়, বুঝতে হবে কুতলাহ আন্তরিক নয় এবং কোন নির্দেশনা ছাড়াই চলছে দ্বিতীয়তঃ যদি দলটি ব্যর্থ হয় এবং সঙ্গত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তাহলে এটা থেকে কি তার পরিকল্পনা ভুল সিদ্ধান্তে আসবে এবং তার গৃহীত নীতি কি সংশোধনের উদ্দেশ্যে পর্যালোচনা করবে? অথবা তারা কি সিদ্ধান্তে পৌছবে যে, দলটি আল্লাহর প্রতি আন্তরিক নয় এবং একারণে আল্লাহ তাদের মাধ্যমে ইসলামকে বিজয়ী করতে চাচ্ছেন না? এই বই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করবে

*    ইসলামের দাওয়াতবইটি কিছু প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করবে, কিছু সন্দেহ দূর করবে এবং কিছু বিষয়ে সঠিক ধারণা তুলে ধরবে যেমনঃ

. অনেকে নিম্নের আয়াতটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকেঃ

হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা কর তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই তোমাদের সবাইকে আল্লাহ কাছে ফিরে যেতে হবে তখন তিনি তোমাদেরকে বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে (সূরা আল-মায়িদাহঃ ১০৫)

সুতরাং এই আয়াত থেকে অনেকে সিদ্ধান্তে পৌছে যে, মুসলিমগন কেবলমাত্র তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল তাকে অন্য মুসলিমদের কাছে দাওয়াত বহন না করলেও চলবে
. নিম্নের হাদীসটিকেও অনেকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেঃ

এটা ঠিক নয় যে, একজন মুমিন নিজেকে অপমানিত হওয়ার মত পরিস্থিতিতে ফেলে দেয় এবং এমন দূর্ভোগের মধ্যে নিজেকে ঠেলে দেয় -যা বহনে সে অক্ষম

হাদীস থেকে অনেকে সিদ্ধান্তে পৌছে যে, এমন কোন কাজ করা যাবে না যা তাকে কারাভোগ, কর্মস্থল থেকে পদচ্যুতি এবং অত্যাচারী শাসকের রোষানলে পড়তে হয় সেক্ষেত্রে যদি তাকে দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত থেকে অত্যাচারী শাসককে মেনে নিতে হয় তারপরেও
. অনেকে হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রাঃ) বর্ণিত রাসূল (সাঃ) হাদীসকে ভুল বুঝে থাকে-

আমি বললামঃ যদি মুসলিমদের কোন জামায়াত বা ইমাম না থাকে তাহলে কী হবে? তখন তিনি (সাঃ) বললেনঃ ‘অতঃপর তুমি এসমস্ত দলগুলিকে পরিত্যাগ করবে, যদিও বা তোমাকে কোন গাছের গুড়ি কামড়ে থাকতে হয় যতক্ষন না তোমার মৃত্যু এসে যায়

লোকেরা এটা থেকে ধারণা করে যে, যখন মুসলিমদের খলিফা থাকবে না তখন মুসলিমদের জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ফরয নয় বরং অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে
. আবার কেউ কেউ নিচের বিখ্যাত হাদীসকে ভুল বুঝে থাকেঃ

তোমাদের কাছে এমন একটি দিন বা বছর আসবে না, যা তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাতের পূর্ব পর্যন্ত আরও বেশী মন্দ হতে থাকবে না সুতরাং, এটা সেইসব লোকদের নিরাশ, হতাশ কর্মবিমুখ করে
. আবার অনেকে বলেন যে, পরিবর্তনের দায়িত্ব ইমাম মাহদীর এবং এর জন্য আমরা দায়িত্বশীল নই ফলে তারা গুরুত্বপূর্ণ দাযিত্ব থেকে নিষ্ক্রিয় থাকে

*    এই বইটি এর ভূমিকাতে যেসব ইস্যু তুলে ধরেছে এইরকমের সব বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে আলোকপাত করেছে যদি এতে কোন ঘাটতি থাকে তবে মনে রাখতে হবে, কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই নিখুঁত হতে পারেন সম্ভবতঃ দ্বিতীয় মুদ্রণে আমরা আল্লাহর কৃপায় আরও সামগ্রিক নিঁখুত করবার প্রয়াস নেব আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করছি যে, তিনি বই থেকে মুসলিমদের উপকৃত করবেন এবং এর লেখককে অনেক উত্তম প্রতিদান দিবেন।


সালাম দরুদ পেশ করছি নবী মুহম্মদ (সাঃ), তাঁর পরিবারবর্গ, শেষ দিবসের পূর্ব পর্যন্ত আগত তাঁর অনুসারীদের প্রতি এবং সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার

2.6.14

শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় মে দিবসের ব্যর্থতা এবং সমাধান

১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকার মেহনতী শ্রমিকশ্রেণী দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবীসহ আরো কয়েকটি ন্যায্য দাবী ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল। মালিকরা তাদের ইচ্ছামত শ্রমিকদের কাজ করতেও বাধ্য করত। এমনকি দৈনিক ১৮-২০ ঘন্টা পর্যন্ত। এ অন্যায়, বঞ্চনা ও জুলুমের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা পর্যায়ক্রমে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এ আন্দোলনের অংশ হিসাবে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার -এর ১৮৮৫ সালের সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবীতে ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকা ও কানাডার প্রায় তিন লক্ষাধিক শ্রমিক শিকাগোর হে মার্কেটেঢালাই শ্রমিক তরুণ নেতা এইচ সিলভিসের নেতৃত্বে এক বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সর্বাত্মক শ্রমিক ধর্মঘট পালন করে। এতে ১১ জন শ্রমিক নেতা ও কর্মী নিহত হয় এবং আহত ও বন্দী হয় অসংখ্য শ্রমিক নেতা ও কর্মী শ্রমিক নেতা ও কর্মী হত্যার এ দিবসটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে প্রতিবছর ১লা মে শ্রমিক হত্যা দিবসআন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবসহিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মে দিবস শ্রমিক হত্যাযজ্ঞের পিছনে দায়ী ছিল পুজিবাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাষ্ট্র শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী উপেক্ষা করে অবস্থান নিয়েছিল পুজিপতিদের পক্ষে, কারণ পুজিবাদী ব্যবস্থায় যেই ক্ষমতায় থাকুকনা কেন ব্যবস্থার নাটাই থাকে পুজিপতিদের হাতে।

মে দিবসের অর্জন কতটুকু?

১২ বছর আগে ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডের স্মরণে সারা বিশ্বে আনন্দ উৎসবের মধ্যে মে দিবস পালিত হলেও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা আজও হয়নি। আজও শ্রমিকদের অমানুষিক পরিশ্রম করিয়ে মালিকগন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক, বিলাবহুল তাদের জীবন ব্যবস্হা। তাদেরই কর্মচারী, খেটে খাওয়া মানুষগুলো নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্হা, রুণ তাদের জীবন ইতিহাস। অধিক সময় কাজ, অস্বাস্থ্যকর পরিবে, শ্রমিক-মালিক তিক্ত সম্পর্ক, শ্রম চুরি করে বিত্ত বৈভব তৈরির প্রচেষ্টা অব্যহত। অবশ্য এটা পুঁজিবাদের স্বভাব এবং তার ফসলএ ধরণের অর্থব্যবস্থার মধ্যে থেকে এর থেকে ভাল কিছু আশা করা যায় না। শ্রম উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, শ্রমিক তার শ্রম বিক্রি করলেও সে একজন মানুষ। তার ভালভাবে বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু পুঁজিবাদ শ্রমিককে শুধুমাত্র পণ্যে রুপান্তর মাধ্যম হিসাবে দেখে এবং হরণ করে মানুষ হিসাবে সৃষ্টিকর্তা মহান রব্বুল আলামিন কর্তৃক প্রদত্ত অধিকার। যার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি মালিকদের অতি মুনাফালোভী আচরণ, যেনতেনভাবে মুনাফা অর্জনের জন্য অনিয়ম ও দূর্ণীতির মাধ্যমে করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন সময়ে ঘটে দূর্ঘটনা ও ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। অসংখ্য শ্রমিক হতাহত হয় ও মৃত্যুবরন করে। ফিনিক্স, স্পেকট্রাম, তাজরীন, রানা প্লাজার মত বাংলাদেশের এই পোশাক তৈরীর কারখানা-ভবনগুলো কত না শ্রমিকের মৃত্যুর সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী কোন ব্যক্তির শাস্তি আজ পর্যন্ত হয়নি। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় এসব মালিকরা পার পেয়ে গেছে আইনের ফাক-ফোকরে; দূর্বিষহ জীবনের কালো ছায়া ছেয়ে গেছে হতাহতদের ও মৃত্যুবরনকারীদের পরিবারের উপর। লক্ষনীয় বিষয় শ্রমিক দিবসের সূচনা ধর্মনিরপক্ষ গণতান্ত্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং আমাদের দেশে আজ যে শ্রমিক বিক্ষোভ হচ্ছে তা পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ফল। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্ভব নয়, কারণ এই ব্যবস্থা মানুষের তৈরী এবং এর নাটাই থাকে গুটি কয়েক পুজিপতিদের হাতে, যারা আইন তৈরী করে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য। যেমটি আমরা দেখতে পাই খোদ মার্কিনমূলুকে শতবছর পরেও শ্রমিক বিক্ষোভ হয় ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য।

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারঃ

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের কথা বিধৃত হয়েছে। শ্রমিকদের প্রতি সুবিচারের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম শ্রমের প্রতি যেমন মানুষকে উৎসাহিত করেছে [আল্লাহ (সুবঃ) বলেনঃ সালাত সমাপ্ত হইলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করিবে। (সূরা আল-জুমুআহঃ ১০)], তেমনি শ্রমিকের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পূর্ণ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। মুহাম্মাদ (সাঃ) শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষকে অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন।

শ্রমের মর্যাদা বুঝাতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেনঃ

‘কারো জন্য স্বহস্তের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য আর নেই। আর আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ) স্বহস্তে জীবিকা নির্বাহ করতেন।’ (বুখারী, মিশকাত)

শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম বদ্ধপরিকর। আর একজন শ্রমিকের সবচেয়ে বড় অধিকার বা দাবী হ, তার শ্রমের যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভ করা। এজন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেনঃ

তোমরা শ্রমিককে তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও (ইবন মাজাহ, মিশকাত)

পৃথিবীর সভ্যতার বিকাশে শ্রমিকদের কৃতিত্বই অগ্রগণ্য। কিন্তু আক্ষেপ! সভ্যতার কারিগর এ শ্রেণীটি সর্বদাই উপেক্ষিত, অবহেলিত ও সুবিধা বঞ্চিত। উদয়াস্ত উষ্ণ ঘামের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নিয়ে খেটে যে শ্রমিক পুজিবাদের অর্থযন্ত্রটি সচল রাখে, সেই পুজিঁবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই তাদের জীবনকে করে রেখেছে দুর্বিষহ। এই ব্যবস্থার কারনেই শ্রমিকরা হচ্ছে নানা নির্যাতন, জুলুম ও শোষণের শিকার, পুজিপতি ও সাম্রাজ্যবাদীরা সুযোগ পাচ্ছে তাদের ওপর নির্যাতন-জুলুম চাপিয়ে দেয়ার।

সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার মালিক-শ্রমিকের বৈরিতাপূর্ণ সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে ইসলামী অর্থব্যবস্থা ও সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। আর এজন্য দরকার ইসলাম প্রদর্শিত নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ ও বাস্তবায়ন। আর এটি বাস্তবায়ন করতে হলে লাগবে খিলাফত ব্যবস্থা। কারন একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থায় খলীফাই পারে ইসলামকে পৃথিবীর বুকে সুউচ্চে তুলে ধরতে, ইসলামের সমস্ত হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করতে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা খিলাফত রাষ্ট্রের উপর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণকে ফরয বা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। রাসূল (সাঃ) বলেনঃ বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য এক টুকরা কাপড়, আর খাওয়ার জন্য এক টুকরা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না। (তিরমিযী)

যদি খলীফা এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে অথবা ব্যর্থ হয়, তবে তার জন্য রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারী। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে। ইমাম (খলীফা) যিনি সর্বসাধারণের উপর শাসক হিসেবে নিয়োজিত তিনিও দায়িত্বশীল, তাকেও তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবেমাকিল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না। (মুসলিম)

অতএব, এই পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে হবে; মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল হাসিনা সরকার ও তার মদদপুষ্ট দূর্ণীতিবাজদের জুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার এছাড়া কোন বিকল্প নাই। এই ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে আমাদের প্রয়োজন সেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যার ভিত্তি হবে ইসলাম এবং যা নিশ্চিত করবে মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই পুঁজিবাদী গনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থাকে পরিহার করে আল্লাহর মনোনীত শাসন ব্যবস্থা খিলাফত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এর পক্ষে জনমত গড়ে তোলাই এখন আমাদের মূল দায়িত্ব। আমাদের খিলাফাহর বাণী পৌঁছে দিতে হবে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে প্রান্তে, বিশেষ করে নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের নিকট যারা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পালন করবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা। একমাত্র রাষ্ট্রের নিষ্ঠাবান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নুসরাহর (ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা) মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে দিয়েই মানুষের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে।


আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমীন।।।

অধ্যায় ২ ~ কুর’আন তিলাওয়াত বজায় রাখা

পবিত্র কুর’আন হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বাণী যা তিনি তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর উপর জীবরাইল (আঃ)-এর মাধ্যমে শাব্দিক ও অর্থপূর্ণভাবে নাযিল করেছেন। এর তিলাওয়াত এক ধরনের ইবাদত এবং এটি এমন একটি মু’জিযা যা আমাদের কাছে মুতাওয়াতির বর্ণনা হিসেবে এসেছেঃ

“কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না- অগ্র হতেও নয়, পশ্চাৎ হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” [সূরা আল-ফুস্‌সিলাতঃ ৪২]; কুর’আন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক সংরক্ষিতঃ

“নিশ্চয়ই আমিই এই কুর’আন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমিই তা সংরক্ষন করবো।” [সূরা আল-হিজরঃ ৯]

ইহা হতে আত্না খুঁজে পায় জীবন আর হৃদয় খুঁজে পায় প্রশান্তি। ইহা এমন একটি কিতাব যা মানুষকে সর্বশক্তিমান, সমস্ত প্রশংসার যোগ্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছায় অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে এসেছে। যে ব্যক্তি এই গ্রন্থ অনুসারে কথা বলে সে সত্য বলে, যে এটি অনুসারে কাজ করে সে সফল, যে ব্যক্তিকে এর মাধ্যমে বিচার করে সে ন্যায়বিচারক এবং যে ব্যক্তি এর দিকে আহ্বান করে সে সরলপথ প্রাপ্ত।

এটি বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ এক অনুগ্রহ এবং কী চমৎকার এই অনুগ্রহ। দাওয়াহ বহনকারীর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য যে, এর দ্বারা তাদের হৃদয় পূর্ণ থাকবে এবং এর মধ্য হতে তারা তাদের সমস্ত শক্তি খুঁজে পাবে। যে এই কুর’আনকে ধারণ করবে সে সুউচ্চ পর্বতের ন্যায় ব্যক্তিত্বে পরিণত হবে, তখন তার কাছে সমস্ত দুনিয়াকে আল্লাহর তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ মনে হবে। সে সত্যবাদী হবে এবং আল্লাহর রাহে কাউকে ভয় পাবে না। বাতাসের তোড়ে ভেসে যাওয়ার ন্যায় শারীরিকভাবে হালকা এমন ব্যক্তিও কুর’আন তিলাওয়াতকারী হওয়ায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট ওহুদ পাহাড়ের চেয়ে ভারী হবে। তার জিহ্বা এর উচ্চারণে ভেজা থাকবে এবং তার আঙ্গুলগুলো এটি অধ্যয়নের স্বাক্ষী দিবে। এভাবেই সাহাবীগণ দুনিয়াতে তাদের জীবন-যাপন করতেন, মনে হতো যেন তারা জীবন্ত কুর’আন, তারা এর আয়াতসমূহের প্রতিবিম্ব ছিলেন এবং এটিকে সেভাবেই তিলাওয়াত করতেন যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত, এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়েছেন এবং এর দিকেই সবাইকে আহ্বান করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে প্রাপ্ত শাস্তির আয়াতসমূহ পাঠ করে তাঁরা প্রকম্পিত হতেন কিন্তু ক্ষমা ও অনুকম্পার আয়াত শুনে আনন্দিতও হতেন এবং আল্লাহর ক্ষমা, মহত্ত্ব, জ্ঞান ও হুকুমের কাছে সমর্পণের কারণে তাঁদের চোখ অশ্রুতে ভিজে উঠতো। এ আয়াতসমূহ তাঁদের হৃদয়ের গভীরে স্থায়ীভাবে আসন করে নিয়েছিল। একারণে তাঁরা ছিলেন শক্তিশালী এবং নেতৃত্বের স্থান অর্জন করতে পেরেছিলেন, তাঁদের সুখ ও সফলতা প্রদান করা হয়েছিল। যখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এ পৃথিবী ছেড়ে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে চলে যান, তখনও সাহাবী (রা.), রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নির্দেশ অনুসারে কুর’আনকে অনুসরণ করেছেন। সুতরাং, কুর’আন মুখস্তকারীগণ সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ প্রদানে সবচেয়ে অগ্রগামী এবং পূর্বেও কুর’আন বহনকারীগণ সৎকাজ সম্পাদনে আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগ স্বীকারে অগ্রগামীদের কাতারে ছিলেন।

সাধারণভাবে মুসলিমদের এবং বিশেষতঃ দাওয়াহ বহনকারীদের জন্য কুর’আন হতে হবে সকল আনন্দের উপকরণ- যা তাদেরকে সত্যপথের উপর দৃঢ় রাখবে এবং কেবলমাত্র কল্যাণের দিকে পরিচালিত করবে, একটি উচ্চতা থেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তারা দিনে ও রাতে কুর’আন তিলাওয়াত করবে এবং তিলাওয়াত, মুখস্ত করা এবং পালনের মাধ্যমে যা শিখেছে তা এমনভাবে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে যেন মনে হয় তারা শ্রেষ্ঠ পূর্বসুরীর শ্রেষ্ঠ উত্তরাসূরী।

কুর’আন নাযিল, মুখস্ত করা, এর নির্দেশনা, তিলাওয়াতের ফযিলত এবং এর অন্তর্নিহিত অপরিসীম কল্যান সম্পর্কিত অসংখ্য পবিত্র আয়াতের পাশাপাশি অসংখ্য পবিত্র হাদীসও বর্ণিত হয়েছে।

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“বিশ্বস্ত ফেরেশতা (জিবরীল) একে নিয়ে অবতরণ করেছেন; আপনার অন্তরে (হে মুহাম্মদ!) যাতে আপনি সতর্ককারীদের একজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।” [সূরা আশ-শু’আরাঃ ১৯৩-১৯৪]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“নিশ্চয়ই আমিই এই কুর’আন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমিই তা সংরক্ষন করবো।” [সূরা আল-হিজরঃ ৯]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করবে না- অগ্র হতেও নয়, পশ্চাৎ হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” [সূরা আল-ফুস্‌সিলাতঃ ৪২]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“এই কুর’আন সর্বশ্রেষ্ঠ পথ নির্দেশ করে এবং সৎকর্মপরায়ন বিশ্বাসীদের সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরষ্কার (জান্নাত)।” [সূরা বনী ইসরাইলঃ ৯]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“হে আহলে কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমার রাসূল আগমন করেছেন! কিতাবের যেসব বিষয় তোমরা গোপন করতে, তিনি তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক বিষয় মার্জনা করেন। তোমাদের কাছে আল্লাহর নিকট হতে একটি উজ্জল আলোকময় জ্যোতি এবং একটি সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে। এর দ্বারা আল্লাহ এরূপ লোকদেরকে শান্তি ও নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং তিনি তাদেরকে স্বীয় তাওফীক ও করুণায় (কুফরীর) অন্ধকার থেকে বের করে (ঈমানের) আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং তাদেরকে সরল (সঠিক) পথে পরিচালিত করেন।” [সূরা আল-মায়িদাহঃ ১৫-১৬]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“আলিফ-লাম-রা; এই কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানবজাতিকে তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, তাঁর পথে, যিনি পরাক্রমশালী, সর্বপ্রসংশিত।” [সুরা ইবরাহীমঃ ১]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর জিকিরে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তর প্রশান্ত হয়।” [সূরা আর-রা’দঃ ২৮]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“তারা কি লক্ষ্য করে না কুর’আনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে অবশ্যই তারা এতে বহু বৈপরিত্য প্রত্যক্ষ করতো।” [সূরা আন-নিসাঃ ৮২]

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ

“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে কুর’আন শিখে এবং অন্যকেও শিক্ষা দেয়।” উসমান বিন আফ্ফান (রা.) বরাত দিয়ে আল বুখারী এটি বর্ণনা করেন।

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“যে কুর’আনের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে সওয়াব লাভ করবে এবং এই সওয়াবকে ১০গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে। আমি বলছি না, ‘আলিফ-লাফ-মিম’ একটি অক্ষর, বরং বলছি আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর, মিম একটি অক্ষর।’ আবদুল্লাহ বিন মাসুদ (রা.) থেকে আত-তিরমিযী হাদিসটি বর্ণনা করেন এবং এটি একটি সহীহ হাদীস।

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“অবশ্যই যে ব্যক্তি কুর’আন সুন্দর, সাবলীল এবং সঠিকভাবে তিলাওয়াত করবে সে মর্যাদাবান, অনুগত ফেরেশতাদের সহচর্যে থাকবে এবং যে ব্যক্তি কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও বারবার তিলাওয়াত করবে, অর্থাৎ তিলাওয়াত করার সময় তোতলাবে বা হোঁচট খাবে, তার পুরষ্কার দ্বিগুন হবে।’ উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে এটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন।

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“যার মধ্যে কুর’আন নেই সে অনেকটা বিরান ঘরের মত।” এটি তিরমিযী বর্ণনা করেন এবং তিনি একে সহীহ বলে ঘোষণা করেছেন।

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“কুর’আন তিলাওয়াত করো, কেননা কিয়ামতের দিন এটি এর তিলাওয়াতকারীর জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আর্বিভূত হবে।” উমামা বিন বাহিলি (রা.) থেকে ইমাম মুসলিম তার সহীহ্‌তে ইহা উল্লেখ করেন।

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“কুর’আন হচ্ছে একটি উত্তম মধ্যস্থতাকারী এবং সে মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা পালন করবে এবং ইহা যুক্তি-তর্কে শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত। যে ব্যক্তি কুর’আনকে তার সম্মুখে রাখবে, তা তাকে জান্নাতে দিকে ধাবিত করবে; আর যে ব্যক্তি কুর’আনকে তার পশ্চাৎ রাখবে, তা তাকে জাহান্নামে ঠেলে দিবে।” এটি জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে ইবনে হিব্বান তার সহীহ্‌তে উল্লেখ করেন। এটি আল বায়হাকী শুয়া’ব আল ঈমানে জাবির ও ইবনে মাসুদ (রা.) এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন এবং এটি একটি সহীহ হাদীস।

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“অবশ্যই আল্লাহ এ কিতাবের মাধ্যমে কিছু লোকের উত্থান ঘটাবেন এবং কিছু লোকের পতন ঘটাবেন।” এটি মুসলিম বর্ণনা করেন।

আবু দাউদ ও আত তিরমিযী সহীহ বর্ণনাতে উল্লেখ করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেনঃ

“কুর’আন তিলাওয়াতকারীদের বলা হবেঃ তিলাওয়াত কর এবং (জান্নাতের স্তরসমূহের মধ্যদিয়ে) উন্নীত হতে থাক এবং তোমার কণ্ঠকে সেইভাবে সুশোভিত করতে থাক, যেইভাবে দুনিয়াতে করতে! নিশ্চয়ই, আজ আমি জান্নাতে তোমার অবস্থান ততক্ষন পর্যন্ত উন্নীত করতে থাকবো যতক্ষন না দুনিয়াতে তোমার কণ্ঠে তিলাওয়াতকৃত শেষ আয়াতটির তিলাওয়াত সম্পন্ন হয়!”

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“কুর’আন অধ্যয়ন কর, একে চর্চায় রাখ, কখনও পরিত্যাগ কর না, কখনও এর সাথে প্রতারণা কর না এবং কখনও এর মাধ্যমে আহার ও সম্পদ অন্বেষণ করো না।” এটি আব্দুর রহমান বিন সাবাল (রা.) এর বরাত দিয়ে আহমদ, তাবারানী ও অন্যান্যরা এ হাদীসটি উল্লেখ করেন এবং এটি একটি সহীহ হাদিস।

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“যে মু’মিন কুর’আন তিলাওয়াত করে এবং তদানুসারে আমল করে, তার উদাহরণ সে লেবুর ন্যায়, যা খেতে সুস্বাদু এবং তার ঘ্রাণও মন মাতানো সুগন্ধযুক্ত। পক্ষান্তরে যে মু’মিন কুর’আন তিলাওয়াত করে না, কিন্তু কুর’আনের অনুসরণে আমল করে, তার উদাহরণ হচ্ছে ঐ খেজুরের, যা খেতে সুস্বাদু কিন্তু কোন সুগন্ধ নেই। আর সে সব মুনাফিক, যারা কুর’আন তিলাওয়াত করে কিন্তু আমল করে না, তাদের উদাহরণ হচ্ছে ঐ রায়হান ফুলের ন্যায়, যার মনমাতানো সুগন্ধ আছে, কিন্তু খেতে একেবারেই তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুর’আন তিলাওয়াতও করে না এবং তদানুসারে আমলও করে না, তার উদাহরণ হাঞ্জালা (মাকাল ফলের) ন্যায়, যা খেতেও তিক্ত এবং দুর্গন্ধযুক্ত।” এটি আবু মুসা আল-আশ’আরী (রা.) থেকে আল-বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন।

তিনি (সাঃ) বলেনঃ

“কুর’আন তিলাওয়াত বজায় রাখ। কারণ অবশ্যই যে সত্ত্বার হাতে মুহম্মাদের প্রাণ তাঁর কসম! একটি উট তার লাগাম থেকে যেভাবে ছুটে যায় তার চেয়ে দ্রুতগতিতে স্মৃতি থেকে কুর’আন হারিয়ে যায়।” এটি আবু মুসা আল-আশ’আরী (রা.) থেকে আল বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন।

উপরোক্ত পবিত্র আয়াত এবং হাদীসগুলো থেকে পবিত্র কুর’আনের মর্যাদা ও সম্মানজনক অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এগুলো থেকে কুর’আন বহনকারীদের মর্যাদার ব্যাপারেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা বহনকারী ব্যক্তি জীবনে প্রতিফলন ঘটাতে ও বাস্তবায়ন করতে বহন করে থাকে। কেবলমাত্র তাকের মধ্যে রেখে ধুলোর আস্তরণ ফেলা বা আদর করে তাকের মধ্যে রেখে ভুলে না গিয়ে, সে এমনভাবে এটি তিলাওয়াত করবে যাতে এটি হক্ব পথে তাকে অফুরন্ত প্রাণশক্তি প্রদান করে। আল্লাহ যাতে আমাদেরকে হতভাগ্যদের অন্তর্ভুক্ত না করেন। হে ভাইয়েরা! কুর’আন পড়ুন। এর তিলাওয়াতের জন্য ত্বরিত গতিতে এগিয়ে যান এবং এটি এমনভাবে পাঠ করুন যেভাবে তা পাঠ করা উচিত। এর প্রতিফলন এমনভাবে ঘটান যেভাবে প্রতিফলন ঘটানো উচিত এবং একে বাস্তবায়ন করুন এবং গ্রহণ করুন ঠিক যেইভাবে এর বাস্তবায়ন এবং গ্রহণ করা উচিত, যাতে আপনি একটি মিষ্টি স্বাদ এবং উত্তম সুগন্ধে পরিণত হতে পারেন। তাহলে আপনি এ পৃথিবীর সর্বোচ্চ আসনের অধিকারী দাওয়াহ বহনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। একইভাবে আপনি জান্নাতে সর্বোচ্চ আসনের অধিকারী হবেন, যখন আহ্বান করা হবেঃ তিলাওয়াত কর এবং উন্নীত হও। আর আপনি যদি তা করতে পারেন তাহলে আপনি মহান বিজয় ও সাফল্যের দাবীদার হতে পারবেন এবং সুমহান সত্ত্বার সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হবেনঃ


“মু’মিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন।” [সূরা আস-সাফঃ ১৩]

অধ্যায় ১ ~ শরী’আহ-র আনুগত্যে দ্রুত অগ্রসর হওয়া

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেনঃ

“এবং তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুতবেগে ধাবিত হও- যার প্রসারতা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সদৃশ, যা নির্মিত হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।” [সূরা আল-ইমরানঃ ১৩৩]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলেঃ আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। তারাই সফলকাম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে তারাই কৃতকার্য।” [সূরা আন-নূরঃ ৫১-৫২]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।” [সূরা আল-আহযাবঃ ৩৬]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“কিন্তু না, আপনার রবের শপথ, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মু’মিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের যাবতীয় মতবিরোধের ফয়সালায় আপনাকে বিচারক হিসাবে মেনে নেয় এবং কোনরূপ সর্ঙ্কীর্ণতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সন্তুষ্ট চিত্তে আপনার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।” [সূরা আন-নিসাঃ ৬৫]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব সম্পন্ন ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।” [সূরা আত-তাহরীমঃ ৬]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেনঃ

“এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হিদায়েত আসে, তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে ন এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবঃ হে আমার পালনকর্তা আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুমান ছিলাম। আল্লাহ বলবেনঃ এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।” [সূরা ত্বাহাঃ ১২৩-১২৬]

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ

“ফিৎনা-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার পূর্বেই তোমরা সৎকাজে আত্ননিয়োগ করো। এ বিপর্যয় তোমাদেরকে অন্ধকার রাতের মতো গ্রাস করে নেবে। কোন ব্যক্তির ভোর হবে মু’মিন অবস্থায় আর সন্ধ্যা হবে কাফির অবস্থায়। আর তার সন্ধ্যা হবে মু’মিন অবস্থায় সকাল হবে কাফির অবস্থায়। মানুষ দুনিয়ার সামান্যতম স্বার্থের বিনিময়ে নিজের দ্বীনকে বিকিয়ে দিবে”। [সহীহ মুসলিমঃ কিতাবুল ঈমান, ২১৩]

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সময় ও তৎপরবর্তী সময়ের মুসলিমগণ আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে প্রচন্ড গতিতে ছুটে যেতেন। উম্মাহর মধ্যে এখনও এমন লোক রয়েছে যারা আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন।

জাবির বর্নিত মুত্তাফিকুন আলাইহি-এর একটি হাদীসে এসেছে যেঃ

ওহুদের দিন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলোঃ “আজ যদি আমি নিহত হই, তাহলে আমার অবস্থান কোথায় হবে?” উত্তরে তিনি (সাঃ) বললেনঃ “জান্নাত। অতঃপর ঐ ব্যক্তি তাঁর হাতের সমস্ত খেজুর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গেলো যতক্ষণ না তিনি শহীদ হন।’’ [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

মুসলিম উল্লেখিত হাদীসে আনাস (রা.) বর্ণনা করেন যেঃ

“রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং সাহাবীগণ, মুশরিকদের আগমনের পূর্বেই বদর প্রান্তরে পৌঁছান। যখন মুশরিকরা উপস্থিত হলো তখন তিনি (সাঃ) সাহাবীদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ চলো এমন এক জান্নাতের দিকে ছুটে যাই যার প্রশস্ততা আসমান ও জমীন পর্যন্ত বিস্তৃত। ‘উমায়ের বিন আল হাম্মাম আল আনসারী অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, এমন এক জান্নাত যার প্রশস্ততা আসমান ও জমীন পর্যন্ত বিস্তৃত? তিনি (সাঃ) বললেনঃ হ্যাঁ। উমায়ের প্রতিক্রিয়া জানালোঃ আহ, কী চমৎকার! রাসূল (সাঃ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ কোন জিনিস তোমাকে এরূপ মন্তব্যে উদ্ধুদ্ধ করলো? জবাবে সে বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম, আমি ঐ অধিবাসীদের একজন হবো, এই প্রত্যাশা ছাড়া অন্যকোনো প্রত্যাশা থেকে আমি এ মন্তব্য করিনি। অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেনঃ নিশ্চয়ই তুমি সেই বাসিন্দাদের একজন। তখন উমায়ের তার থলে হতে কিছু খেজুর বের করে সেগুলো খাওয়া শুরু করলো এবং মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো যে, যদি আমি এই খেজুরগুলো শেষ করার অপেক্ষায় থাকি তাহলে তা হবে সময়কে দীর্ঘায়িত করা। অতঃপর তিনি তার হাতের অবশিষ্ট খেজুরগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং শহীদ হওয়া পর্যন্ত কাফিরদের সাথে যুদ্ধে করতে থাকেন।”

আনাস (রা.) বর্ণিত মুত্তাফিকুন আলাইহির আরেকটি হাদীসে এসেছেঃ

“আমার চাচা আনাস বিন আন নদর বদরের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! মুশরিকদের বিরুদ্ধে আপনার প্রথম যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত ছিলাম। যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধে অংশগ্রহনের সুযোগ প্রদান করতেন, তবে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) প্রত্যক্ষ করতেন, কত সাহসীকতার সহিত আমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হই।” অতঃপর যখন ওহুদের ময়দান হতে মুসলিমগণ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলো এবং পালাচ্ছিল, তখন তিনি (রা.) বললেনঃ “হে আল্লাহ, এরা (সাহাবীগণ) আজ যা করছে, তা হতে আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং এই মুশরিকরা যা করছে তাকে আমি তীব্র ভাষায় ধিক্কার জানাই।” অতঃপর তিনি যখন ওহুদের ময়দানের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন, তখন তাঁর সাথে সাদ বিন মু’য়াজ (রা.) সাক্ষাৎ হলো। তিনি (নদর) তাকে আহ্বান করে বললেনঃ “হে সাদ বিন মু’য়াজ! জান্নাত। আন-নদরের রবের কসম! ওহুদের ময়দান হতে আমি তার সুভাস পাচ্ছি।” অতঃপর সা’দ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আনাস সেই দিন যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে আমি তা পারিনি। আমরা তার সমস্ত শরীরে তলোয়ারী, বর্শা ও তীরের আঘাতজনিত আশিটিরও অধিক ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাই। আমরা তাকে মৃত অবস্থায় পাই। মুশরিকরা তার সমস্ত শরীরকে এমন নৃশংসভাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করেছিল যে, শেষ পর্যন্ত তার বোন আঙুল দেখে তাঁকে সনাক্ত করতে সমর্থ্য হয়।” আনাস (রা.) বলেনঃ “আমরা সবাই ভাবতাম নিম্নোক্ত আয়াতটি হয়তো তাকে (আন-নদর) বা তার মত কাউকে উদ্দেশ্য করে নাযিল হয়েছেঃ ‘মু’মিনদের মধ্যে কতক ব্যক্তি রয়েছেন যারা আল্লাহর নিকট তাদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন।’ [সূরা আল-আহযাবঃ ২৩]”

আবু সারু’আহ (রা.)-এর বরাত দিয়ে আল-বুখারী বর্ণনা করেন যেঃ

“আমি মদীনাতে নবী (সাঃ)-এর ইমামতির পেছনে সালাতুল আছর আদায় করেছিলাম। তিনি (সাঃ) সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করা মাত্রই দ্রুততার সাথে উঠে দাড়ালেন এবং সকলের মাঝখান দিয়ে তাঁর কোন এক স্ত্রীর বাসস্থান অভিমূখে ছুটে গেলেন। তাঁর গতি সবাইকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুললো। অতঃপর রাসূল (সাঃ) ফিরে আসলেন এবং তাঁর তৎপরতায় সবাইকে বিস্মিত পেয়ে বললেনঃ “আমার মনে পড়লো একটি স্বর্ণের টুকরা বাড়িতে রয়ে গেছে এবং আমি চাই না এটি আল্লাহর ইবাদতের সময় আমার মনোযোগ সেদিকে নিয়ে যাক, সেকারণে সেটিকে দান করার নির্দেশ দিয়ে এলাম”।”

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যেঃ

“সাদাকাহ-র এক টুকরো স্বর্ণ বাড়িতে রয়ে গেছে, আমি তা ফেলে রাখাকে অপছন্দ করি।” এ থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের উপর যা বাধ্যতামূলক করেছেন তা বাস্তবায়ন করার জন্য কতটা তৎপর হওয়া উচিত।

আল-বুখারী আল-বার্‌রা’ এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন যেঃ

“রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন মদীনাতে আসলেন তখন তিনি ষোল বা সতের মাস বায়তুল মাকদিসের দিকে ফিরে নামায আদায় করেন। তিনি (সাঃ) কাবা ঘরকে কিবলা বানাতে চাচ্ছিলেন। অতঃপর, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেনঃ ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন।’ [সূরা আল-বাক্বারাহঃ ১৪৪]। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন কাবার দিকে মুখ করে আছরের নামায আদায় করছিলেন তখন এক ব্যক্তি তাঁর সাথে নামায আদায় করেন। নামায শেষে ঐ ব্যক্তি যখন বের হন তখন তিনি আনসারদের কিছু লোককে অতিক্রম করার বললেন যে, আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে নামায আদায় করেছি এবং তাঁকে (সাঃ) কাবা’র দিকে মুখ করে নামায পড়তে দেখেছি। এই কথা শ্রবণ করা মাত্র তাঁরা সবাই আসরের নামাযে রুকুরত অবস্থায় কাবার দিকে ঘুরে গেল।”

ইবনে আবি আওফা’র বরাত দিয়ে আল-বুখারী উল্লেখ করেন যেঃ

“খায়বারের রাতগুলোতে আমরা প্রচন্ড ক্ষুধা-যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেলাম এবং সেগুলোকে জবাই করলাম। পাত্রের ভেতর মাংস যখন সিদ্ধ হওয়া শুরু হলো, তখন রাসূল (সাঃ)-এর একজন বার্তাবাহক আমাদের নিকট আসলো এবং বললোঃ তোমাদের পাত্রসমূহ উপুড় করে দাও এবং এর মাংস গ্রহণ করো না। আবদুল্লাহ বলেনঃ আমরা বলি যে যেহেতু এগুলো থেকে খুমুস বা গণীমতের মালের এক পঞ্চমাংশ নেয়া হয়নি তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এগুলো খেতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেনঃ অন্যদের বক্তব্য হলো তিনি (সাঃ) এ মাংস পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সা’ইদ বিন জুবায়েরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যিনি বলেনঃ তিনি (সাঃ) এটিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছেন।”

আনাস বিন মালিক (রা.) বরাত দিয়ে বুখারী উল্লেখ করেন যে, তিনি বলেনঃ

“আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল জাররাহ ও উবাই বিন কাবকে কাঁচা খেজুর ও তাঁজা খেজুর থেকে প্রস্তুত করা মদ পরিবেশন করছিলাম। তখন একজন আগন্তুক আসলো এবং বললোঃ নিশ্চয়ই মদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। অতঃপর আবু তালহা বলে উঠলোঃ হে আনাস! দাঁড়াও এবং কলসটি ভেঁঙ্গে ফেলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং একটি সূচালো পাথর দিয়ে কলসটিকে ততক্ষণ আঘাত করলাম, যতক্ষণ না এটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।”

আল-বুখারী আয়েশা (রা.)-এর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন যেঃ

“আমাদেরকে আরও বলা হয় যে, যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হুকুম নাযিল করলেন যে, ইসলাম গ্রহনের পর হিজরতকারী স্ত্রীগণের প্রতি মুশরিকদের ব্যয়িত অর্থ তোমরা ফিরিয়ে দাও এবং মুসলিমদের জন্য মুশরিক স্ত্রী বৈধ নয়, উমর তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।”

আয়েশা (রা.)-এর বরাত দিয়ে আল-বুখারী বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ

“মুজাহির নারীদের প্রতি আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুক। যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুর’আনে আয়াত নাযিল করলেনঃ “এবং তারা যেন তাদের ঘাড় এবং বক্ষদেশ মাথার কাপড় (ওড়না বা চাদর) দ্বারা আবৃত করে রাখে” [সূরা আন-নূরঃ ৩১], তখন তারা তাদের বস্ত্রখন্ড ছিড়ে ফেললো এবং নিজেদেরকে আবৃত করলো।”

আয়েশা (রা.)-এর বরাত দিয়ে সা’ফিয়া বিনতে সা’য়বা এবং তার বরাত দিয়ে আবু দাউদ বর্ণনা করেনঃ

“আয়েশা (রা.) আনসার মহিলাদের নাম উল্লেখ করে তাদের প্রশংসা করেন এবং তাদেরকে নিয়ে উত্তম মন্তব্য করেন। অতঃপর তিনি (রা.) বলেনঃ “যখন সূরা নূর নাযিল হয়, তৎক্ষনাৎ তারা পর্দার কাপড় ছিঁড়ে তা দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করলেন।”

ইবনে ইসহাক বলেনঃ

“... কিনদাহ হতে আগত প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল আশ’আদ বিন কায়েস রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট আগমন করলেন। আয-যুহুরী আমাকে জানান যে, তিনি কিন্দা থেকে আশিজন আরোহীসহ আসেন। তারা মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন। তাদের লম্বা চুল ও চোখ সজ্জিত ছিল। তারা রেশমের আচল যুক্ত জুব্বা পরিহিত ছিল। যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে পৌঁছলেন, তখন তিনি (সাঃ) বললেনঃ তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করোনি? তারা বললঃ করেছি। নবী (সা) বললেনঃ ‘তাহলে কেন রেশমী কাপড় কাঁধে জড়িয়ে রেখেছো?’ অতঃপর তারা রেশমী কাপড় ছিড়ে ফেলে দিল।”

ইবনে জারীর, আবু বুরাইদাহ থেকে এবং আবু বুরাইদাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যেঃ

“আমরা তিন চারজন লোক বালির উপর বসে একটি জগে নিয়ে খামার (মদ) পান করছিলাম যা তখন হালাল ছিল। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে সালাম দেয়ার জন্য তাঁর কাছে গেলাম। ততক্ষণে খামার নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কিত কুর’আনের আয়াত নাযিল হচ্ছিল (হে ঈমানদারগণ! মদ ও জুয়া...) থেকে দুই আয়াতের শেষ পর্যন্ত (তারপরেও কি তোমরা বিরত হবে না?)। তখনও কিছু লোকের হতে মদ ছিল অর্থাৎ কিছু অংশ খেয়েছে এবং কিছু এখনও পেয়ালাতে বাকী রয়ে গেছে। সে আরেক চুমুক দেয়ার জন্য উপরের ঠোটের নীচের অংশের সাথে পেয়ালাটি উঁচু করে ধরেছে। অতঃপর তাঁদের পাত্রগুলোতে যা ছিল তা ফেলে দিল এবং বললঃ হে আল্লাহ! আমরা বিরত হলাম।”

হানজালা বিন আবি আমির (রা.)-কে ফেরেশতাগণ গোসল দিয়েছিলেন। তিনি উহুদের যুদ্ধের কথা শুনামাত্র তাড়াহুড়ো করে সে আহ্বানে সাড়া দেন। তিনি ওহুদের ময়দানে শহীদ হন। ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ

‘তোমাদের সাথীকে ফেরেশতাগণ গোসল দিচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞেস করো তার কী হয়েছিল?’ তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলো। সে (স্ত্রী) সেই রাতে নববধূ ছিল এবং হানজালা যখন যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে ওহুদ প্রান্তরের দিকে রওয়ানা হলেন তখন তিনি অপবিত্র ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ ‘একারণে ফেরেশতাগণ তাঁকে গোসল দিচ্ছে।’”

রাফি বিন খাদিজ (রা.) এর বরাত দিয়ে ইমাম আহমদ বর্ণনা করেনঃ


“রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সময় আমরা জমি চাষ করতাম। এক তৃতীয়াংশ, এক চতুর্থাংশ বা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারের বিনিময়ে সে জমি বন্দোবস্ত দিতাম। একদা আমার বাবার দিকের আত্নীয়ের মধ্য থেকে একজন আসলেন এবং বললেনঃ ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এমন কিছুকে নিষিদ্ধ করেছেন যা আমাদের জন্য লাভজনক ছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁর রাসূলের আনুগত্য তার চেয়েও বেশী লাভজনক। তিনি (সাঃ) আমাদেরকে এক তৃতীয়াংশ, এক চতুর্থাংশ বা অন্য কোন পরিমাণ খাবারের বিনিময়ে জমি বন্দোবস্ত দিয়ে চাষ করতে নিষেধ করেছেন; তিনি জমির মালিককে হয় জমি চাষ করতে বলেছেন, অন্যথায় চাষ করতে পারবে এমন কাউকে সে জমি দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জমি বন্দোবস্ত দেয়া বা এধরনের কিছু করাকে তিনি অপছন্দ করেছেন।”

1.6.14

ভূমিকা

মানুষের চরিত্র (shakhsiyyah) তার চিন্তা (‘aqliyyah) ও কর্মের (nafsiyyah) সমন্বয়ে গঠিত। তার শারিরিক বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য দিকের এতে কোন ভূমিকা নেই - বরং এগুলো নিতান্তই বাহ্যিক বিষয়। সুতরাং মানব চরিত্র গঠনে এই দিকগুলোর কোন প্রাসঙ্গিকতা কিংবা প্রভাব রয়েছে এরূপ চিন্তা করা অর্থহীন।

কোন বিষয়বস্তুকে বুঝতে ব্যবহৃত প্রক্রিয়ার নাম চিন্তা (‘aqliyyah); অর্থাৎ মানুষের মৌলিক বিশ্বাস এবং আস্থা হতে উৎসারিত মানদন্ডের আলোকে কোন একটি বিষয়বস্তু কিংবা বাস্তবতা সম্পর্কে মতামত বা রায় প্রদানের প্রক্রিয়া। যদি তার মতামত বা রায় প্রদানের প্রক্রিয়াটি ইসলামী আক্বীদার ভিত্তিতে পরিচালিত হয় তবে সে ইসলামী চিন্তার অধিকারী, অন্যথায় সে ইসলামী চিন্তা ব্যতীত অন্য কোন চিন্তার অধিকারী মানুষ।

মানুষের প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য ব্যবহৃত পদ্ধতিটিই হচ্ছে তার কর্মের বা চরিত্রের ধরণ (nafsiyyah); অর্থাৎ তার মৌলিক বিশ্বাস এবং আস্থা হতে উৎসারিত মানদন্ডের আলোকে এই চাহিদাগুলোকে পূরণ করার পন্থা। যদি কেউ এই চাহিদাগুলোকে ইসলামী আক্বীদার ভিত্তিতে পূরণ করে তবে সে ইসলামী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি অন্যথায় সে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

যদি কারও চিন্তা এবং কর্ম একই মানদন্ডের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তার চরিত্রটি হবে স্বাতন্ত্র্য এবং সুনিয়ন্ত্রিত। সুতরাং যখন কারও চিন্তা এবং কর্ম উভয়ের ভিত্তি হয় ইসলামী আক্বীদা তখন সে ইসলামী চরিত্রের অধিকারী। অন্যথায় তার চরিত্রটি হবে ইসলাম ব্যতীত অন্যকিছু।

সুতরাং কেবল এটাই যথেষ্ট নয় যে, একজন ব্যক্তি ইসলামী চিন্তার অধিকারী, যেকোন বিষয়কে বা কর্মকান্ডকে শরী’আহ-র আলোকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম, শরী’আহ প্রদত্ত হুকুম নিরূপণে সক্ষম, হালাল এবং হারাম সম্পর্কে জ্ঞানী এবং চিন্তা ও সচেতনতা দিক দিয়ে পরিণত ব্যক্তিত্ব। সুতরাং হয়তো সে শক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম এবং বিভিন্ন ঘটনাবলীর ব্যাপারে বিচক্ষণ বিশ্লেষণ প্রদানেও সক্ষম। কিন্তু এতটুকুই যথেষ্ট নয়, তার কর্ম বা আচরণের ধরণ অবশ্যই ইসলামী হতে হবে, অর্থাৎ সে তার প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদা পূরণে ইসলামকে অনুসরণ করে। সে নামায আদায় করে, রোযা রাখে, নিজেকে পরিশুদ্ধ করে এবং হজ্জ্ব পালন করে, হালালের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ও হারাম থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছানুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলতে প্রাণান্তকর চেষ্টায় নিয়োজিত থাকে, অর্থাৎ সে অর্পিত ফরয দায়িত্বসমূহ পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার চেষ্টা করে এবং এমনকি আরও নৈকট্য অর্জনের তীব্র আকাঙ্খায় নফল কাজসমূহ পালনে মনোযোগী হয়। বিভিন্ন ঘটনাবলীতে সে সঠিক এবং সত্যনিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করে, আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালবাসে এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই কাউকে ঘৃণা করে এবং মুগ্ধ ও ন্যায়পরায়ণ চরিত্রের দ্বারা মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে।

ঠিক একইভাবে ইসলামী চিন্তার অধিকারী না হয়ে শুধুমাত্র কর্ম বা আচরণের ধরণ ইসলামী হওয়াটাও যথেষ্ট নয়। অজ্ঞানতবশতঃ আল্লাহর ইবাদত মানুষকে সঠিক রাস্তা থেকে বিচ্যুত করতে পারে। কারণ অজ্ঞানতার কারণে সে হয়তো এমন দিনে রোযা রাখতে পারে যেদিন রোযা রাখা হারাম, এমন ওয়াক্তে নামায আদায় করতে পারে যখন তা মাকরুহ্। তার সামনে সংঘটিত কোন মুনকার দেখে জবাবদিহী এবং বাঁধা প্রদানের পরিবর্তে সে হয়তো বলে উঠতে পারে ‘লা হাওলা ওয়া’লা কু’ওয়াতা ইল্লা বিল্লা’। সুদের লেনদেন হতে উপার্জিত অর্থ দান-খয়রাতের মাধ্যমে আকণ্ঠ গুণাহ-তে নিমজ্জিত থেকে সে হয়তো দাবি করতে পারে আমি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করছি। অন্যকথায়, খারাপ কাজ করে সে ভাববে আমি ভাল কাজ করছি। সুতরাং, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূল (সাঃ) কর্তৃক নির্দেশিত পথ ব্যতিরেকে অন্যপথে প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে পারে।

চরিত্র পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে না যতক্ষণ না চিন্তা ইসলামী হয়। সুতরাং বাধ্যতামূলক বা ফরয হুকুমসমূহের ব্যাপারে সে জ্ঞান অর্জন করবে এবং শরী’আহ প্রদত্ত নিয়ম-শৃঙ্খলার ব্যাপারে যতবেশী সম্ভব জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব, তাতে আত্মনিয়োগ করবে। একই সময়ে, সে শুধু শরী’আহ-র নিয়ম-কানুন জানার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবে না বরং তাকে শরী’আহ-র নিয়ম-কানুনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল ইসলামী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। এসব হুকুমসমূহকে সে জীবনের সবক্ষেত্রে অর্থাৎ স্রষ্টার সাথে, নিজের সাথে ও সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করবে এবং এমন পন্থায় যাতে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন ও তার আমলকে স্বীকৃতি প্রদান করেন।

যখন কারও চিন্তা ও কর্ম ইসলাম অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয় তখনই কেবল তাকে ইসলামী চরিত্রের অধিকারী বলা যায়, যা তাকে একমাত্র আল্লাহর ভয়ে ভীত সৎকর্মশীলদের কাতারে ধাবিত করে।

তবে তার মানে এটা নয় যে কোন বিচ্যুতি ঘটবে না। তবে এই বিচ্যুতিগুলো যদি স্বাভাবিক রীতি বা অভ্যাস না হয়ে শুধু হঠাৎ ব্যতিক্রম হয় তবে তা ইসলামী চরিত্রের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না। কারণ মানুষ ফেরেশতা নয়। সে ভুল করতে পারে, ক্ষমা চাইতে পারে, অনুতপ্ত হতে পারে এবং যা শুধুমাত্র সঠিক তাই করতে পারে এবং করুণা, দয়া ও হেদায়েতের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রশংসাও করতে পারে।

একজন মুসলিম যতই তার ইসলামী জ্ঞানের পরিধিকে বৃদ্ধি করবে ততই তার চিন্তা উন্নত থেকে উন্নততর হবে এবং তার চরিত্রকে উন্নত করার লক্ষ্যে যতবেশী সে মুস্তাহাব হুকুমসমূহ পালন করবে ততবেশী সে সর্বোচ্চ চারিত্রিক আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার দিকে ধাবিত হবে। এমনকি এই উন্নত হওয়ার এই প্রক্রিয়ায় সে এক বিন্দুতে স্থির থাকবে না বরং আরও উপরে উঠার নিরন্তর চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। এটা তখনই সম্ভব যখন সে তার জীবনকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন করবে এবং একজন বিশ্বাসী হিসেবে আখিরাত প্রাপ্তির আশায় সর্বশক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করবে। সে একদিকে যেমন মসজিদের মিহরাবের সাথে সংযুক্ত থাকবে ঠিক একইসময়ে সর্বশক্তিমান, সৃষ্টিকর্তা এবং সর্বপ্রণেতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার গোলাম হিসেবে শ্রেষ্ঠ গুণাবলী সম্বলিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জিহাদের ময়দানের বীরযোদ্ধা হবে।

এ বইয়ে আমরা মুসলিমদের জন্য বিশেষতঃ দাওয়াহ বহনকারীদের জন্য ইসলামী চরিত্রের অপরিহার্য উপাদানসমূহকে উপস্থাপন করবো যাতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত দাওয়াহ বহনকারীগণের জিহ্বা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জিকিরে সিক্ত থাকে, অন্তর আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো সৎকাজের দিকে দ্রুতবেগে ধাবিত হয়। সে কুর’আন তিলাওয়াত করে, সে অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) কে ভালবাসে, আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালবাসে ও আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ঘৃণা করে, আল্লাহর করুণার আশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে, সে ধৈর্য্যশীল, আখেরাতে আল্লাহর পুরষ্কারের আশা করে, আন্তরিকভাবে ও আল্লাহর উপর ভরসা রাখে। সে সত্যের উপর সুউচ্চ পর্বতের ন্যায় অটল, মু’মিনদের প্রতি সদয়, বিনম্র এবং দয়ালু কিন্তু কাফেরদের বিরুদ্ধে দৃঢ় ও কঠোর এবং আল্লার সন্তুষ্টি প্রাপ্তির রাস্তায় চলতে গিয়ে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারও ভয়ে ভীত নয়। সে উন্নত চরিত্রের অধিকারী, মিষ্টভাষী কিন্তু যুক্তি প্রদানের ক্ষেত্রে বিচক্ষণ, সে সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ প্রদান করে, সে দুনিয়ার জীবনে বসবাস ও কাজ করে কিন্তু তার চোখ সর্বদা জান্নাতের আকাঙ্খাতে ব্যাকুল থাকে, যার প্রশস্ততা জমীন থেকে আসমান পর্যন্ত ব্যাপ্তি এবং যা শুধুমাত্র মু’মিনদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

আমরা দাওয়াহ বহনকারীদেরকে বিশেষতঃ নবুয়্যতের আদলে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী জীবনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরকে তাদের বর্তমান বাস্তবতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না। তারা আল্লাহর শত্রুদের দ্বারা সৃষ্ট প্রতিকূল পরিবেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত। সুতরাং, যদি তারা দিনে এবং রাতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর সান্নিধ্যে না থাকে, তাহলে কীভাবে তারা জীবনের কঠিনতর বিভিন্ন পথ পাড়ি দিবে? কীভাবে অভিষ্ট্য লক্ষ্যে পৌঁছবে? কীভাবে উন্নত থেকে উন্নততর স্থানে পৌঁছাবে? কীভাবে? কীভাবে?

পরিশেষে, দাওয়াহ বহনকারীদের জীবনে দু’টি আলোকিত হাদীসের প্রতিফলন ঘটাতে হবে, যা তাদের লক্ষ্য অর্জনে ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের পথকে উদ্ভাসিত করবেঃ

প্রথমতঃ

“তোমাদের দ্বীনের শুরু নবুয়্যত এবং করুণা দিয়ে এবং অতঃপর নবুয়্যতের আদলে খিলাফত দিয়ে... অতঃপর আবার আসবে খিলাফত নুবয়্যতের আদলে।” এ হাদীসে আল্লাহর ইচ্ছায় খিলাফত ফিরে আসার সুখবর রয়েছে। এটি প্রথম খিলাফতের মতোই ফিরে আসবে, খোলাফায়ে রাশেদীন অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাহাবীদেরটির মতো। যে ব্যক্তি তা ফিরে আসাকে দেখতে ব্যাকুল এবং তা দেখার তামান্না অন্তরে পোষণ করে, তাকে অবশ্যই এর জন্য একজন মু’মিন হিসেবে কাজ করতে হবে, নবী (সাঃ)-এর সাহাবীদের (রা.) মতো হওয়ার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ

“আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেনঃ যে আমার ওয়ালীকে (তাক্ব’ওয়াবান বান্দা) অপমান করলো, সে আমার প্রতি শত্রুতা প্রদর্শন করলো। হে আদম সন্তান! আমার নির্দেশ পালনকারীর জন্য যা কিছু সংরক্ষণ করে রেখেছি তা কখনওই তুমি পাবে না। আমার বান্দা নফল ইবাদত সম্পাদন করার মাধ্যমে নৈকট্য হাসিল করার চেষ্টা করবে যতক্ষণ না আমি তাকে ভালবাসি। অতঃপর আমি তার হৃদয় হয়ে যাব, যা দিয়ে সে চিন্তা করবে, জিহ্বা হয়ে যাব যা দিয়ে সে কথা বলবে, চোখ হয়ে যাব যা দিয়ে সে দেখবে। সুতরাং সে যখন ডাকবে তখন আমি সে ডাকে সাড়া দেব, যখন সে কোন কিছু চাইবে তখন আমি তাকে তা প্রদান করব, যখন সাহায্য চাইবে তখন আমি সাহায্য করব এবং বান্দার কাজসমূহের মধ্যে আমার সবচেয়ে পছন্দীয় হল সৎ উপদেশ (নসীহা)।”

আল-তাবারানী কর্তৃক আল-কাবীর এ বর্ণিত।

এই হাদীসটি আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তাঁর সাহায্য অন্বষণের মাধ্যমে কিভাবে তাঁর পক্ষ থেকে বিজয়, তাঁর সান্নিধ্য ও তাঁর সাহায্য পাওয়া যায় সেই পথ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বক্ষমতাবান; তিনি যাকে সহায়তা করেন কেউ তাকে অপমানিত করতে পারবে না, আর তিনি যাকে অপমানিত করেন কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না। যখন বান্দা তাকে ডাকেন তখন তিনি বান্দার খুব নিকটে পৌঁছে যান, যখন বান্দা তাঁর আনুগত্য করে তখন তিনি সাড়া দেন; তিনি অপ্রতিরোধ্য এবং বান্দার উপর সর্বাধিক দয়ালু এবং সব দিক দিয়ে অভাবমুক্ত।

সুতরাং, হে ভাইয়েরা! আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর মাগফেরাত, জান্নাত, বিজয় ও উভয় জগতের সাফল্যের দিকে দ্রুতবেগে অগ্রসর হোন।

“এবং এই বিষয়ে প্রতিযোগীগণ প্রতিযোগীতা করুক।” [সূরা আল মুতাফ্ফীফীনঃ ২৬]


২১ জুলহজ্ব, ১৪২৪ হিজরী

১২-০২-২০০৪ ইং